নতুন আচরণবিধিতে শিক্ষকদের রাজনীতিতে জড়ানোর সুযোগ কমছে
- আপডেট সময় : ১২:০৫:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৫৩২ বার পড়া হয়েছে
শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক প্রভাব কমানো এবং শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য নতুন আচরণবিধি প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত শিক্ষকদের নতুন আচরণবিধিতে দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয়তা, রাজনৈতিক পদ-পদবি গ্রহণ এবং শিক্ষাবহির্ভূত পেশায় যুক্ত থাকার বিষয়ে স্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করা হতে পারে।
সম্প্রতি সরকারের নির্দেশনার পর এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য আচরণবিধির খসড়া তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। খসড়া পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সংশোধনের পর চূড়ান্ত বিধিমালা প্রণয়ন করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আসতে পারে বিধিনিষেধ
প্রস্তাবিত আচরণবিধিতে শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। রাজনৈতিক পদ-পদবি ধারণ, দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ কিংবা শিক্ষকতার প্রভাব ব্যবহার করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার মতো বিষয় নিয়ন্ত্রণের আওতায় আসতে পারে।
তবে এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার পর কোন কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হবে এবং কোন ক্ষেত্রে কী ধরনের বিধিনিষেধ থাকবে, তা স্পষ্ট হবে।
সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, অতীতে কিছু শিক্ষক শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের চেয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বেশি সময় দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর প্রভাব শিক্ষার পরিবেশ ও ফলাফলেও পড়েছে। তাই শিক্ষকদের পেশাগত দায়িত্বের প্রতি আরও মনোযোগী করতে আচরণবিধিতে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া নিয়েও আলোচনা
শুধু দলীয় রাজনীতি নয়, নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়টিও নতুন বিধি তৈরির আলোচনায় এসেছে। কোনো শিক্ষক দলীয় রাজনীতিতে সরাসরি যুক্ত না থেকেও স্থানীয় বা জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হলে তার পেশাগত অবস্থান কীভাবে বিবেচনা করা হবে, সেটি নিয়েও আলোচনা চলছে।
এ ছাড়া রাজনৈতিক পদ গ্রহণ বা সক্রিয় রাজনৈতিক প্রচারণায় যুক্ত হওয়ার বিষয়গুলোও আচরণবিধির আওতায় আসতে পারে।
শিক্ষাবহির্ভূত পেশাতেও সীমাবদ্ধতা
শিক্ষকদের নতুন আচরণবিধিতে রাজনীতির পাশাপাশি শিক্ষাবহির্ভূত পেশা ও কর্মকাণ্ড নিয়েও বিধিনিষেধ থাকতে পারে। শিক্ষকতার পাশাপাশি এমন ব্যবসা, পেশা বা অন্য কোনো কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকা, যা নিয়মিত পাঠদান ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করে, তা নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এর মাধ্যমে শিক্ষকদের মূল দায়িত্ব শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করার দিকে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
শ্রেণিকক্ষের পাঠদানেও বাড়ছে নজরদারি
শিক্ষকদের নতুন আচরণবিধির পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের ওপরও নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। দেশব্যাপী সময়াবদ্ধ অভিন্ন পাঠ পরিকল্পনা ও রুটিন বাস্তবায়নের নির্দেশনা রয়েছে।
একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রম মনিটরিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাউশির সহকারী পরিচালকরা ‘ডিএমএস অ্যাপ’-এর মাধ্যমে ভিডিও কলে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান পর্যবেক্ষণ করবেন বলেও কর্মপরিকল্পনায় উল্লেখ রয়েছে।
এতে শিক্ষকদের উপস্থিতি, নিয়মিত পাঠদান এবং শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রম আগের তুলনায় বেশি পর্যবেক্ষণের আওতায় আসবে।
শিক্ষার মানোন্নয়নে ১৫ দফা অনুশাসন
সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া কমানো এবং শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ওই আলোচনার পর শিক্ষার মানোন্নয়নে ১৫ দফা অনুশাসন দেওয়া হয়।
পরে ৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সভার ‘রেকর্ড অব নোটস’ ও কার্যবিবরণী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে।
অনুশাসনের মধ্যে শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক প্রভাব কমানো, শিক্ষকদের শিক্ষাবহির্ভূত কর্মকাণ্ড থেকে মুক্ত রাখা এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান বাড়ানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নেও গুরুত্ব
শিক্ষকদের নতুন আচরণবিধির পাশাপাশি তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়েও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি এসব বিষয়ে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করতে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা, চিত্রাঙ্কন ও গণিত অলিম্পিয়াডের মতো সহশিক্ষা কার্যক্রম বাড়ানোর নির্দেশনা রয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার পেছনে দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ, কোচিংনির্ভরতা, স্মার্টফোন আসক্তি এবং আনন্দময় শিক্ষার ঘাটতিসহ বিভিন্ন কারণ রয়েছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় শিক্ষকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
‘উদ্দেশ্য শিক্ষকদের অযথা নিয়ন্ত্রণ করা নয়’
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, শিক্ষকতা শুধু চাকরি নয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব।
তিনি বলেন, একটি প্রজন্মকে জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও মানবিক গুণাবলিতে সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলতে শিক্ষকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্তাবিত আচরণবিধির উদ্দেশ্য কোনো শিক্ষককে অযথা নিয়ন্ত্রণ করা নয়। বরং শিক্ষকতার মর্যাদা সমুন্নত রাখা এবং পেশাগত দায়িত্ব ও জবাবদিহিতার একটি সুস্পষ্ট কাঠামো তৈরি করা।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষকরা যেন শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদান করেন এবং শিক্ষার্থীদের মেধা ও সৃজনশীলতা বিকাশে মনোযোগী থাকেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ চলছে।
মাউশির মহাপরিচালক বলেন, দেশের প্রতিটি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা হবে। সেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক আস্থা, সম্মান ও দায়িত্ববোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে।
তিনি জানান, আচরণবিধির পাশাপাশি শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তির ব্যবহার ও পাঠদানের মানোন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ভালো কাজের জন্য শিক্ষকদের উৎসাহ ও স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
সরকারের এ উদ্যোগে পেশাগত শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষকদের সক্ষমতা ও মর্যাদা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে বলেও জানান তিনি।

























