চরম আর্থিক ঝুঁকিতে ১৫ ব্যাংক
- আপডেট সময় : ১২:৪০:৩৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৫৪৬ বার পড়া হয়েছে
ব্যাংক খাতে অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের ঘটনায় তৈরি সংকট এখন বড় আর্থিক চাপে রূপ নিয়েছে। বিপুল পরিমাণ ঋণের একটি অংশ ফেরত আসছে না। ফলে দ্রুত বাড়ছে খেলাপি ঋণ। একই সঙ্গে এসব ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোর প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজনও বাড়ছে।
তবে আয় কমে যাওয়ায় অনেক ব্যাংক প্রয়োজনীয় প্রভিশন রাখতে পারছে না। ফলে চলতি বছরের জুন শেষে সরকারি ও বেসরকারি ১৫টি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৯ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা।
ব্যাংক খাতের ইতিহাসে এটি বড় ধরনের প্রভিশন ঘাটতি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ঘাটতি ব্যাংকগুলোর আর্থিক দুর্বলতার বড় সংকেত।
সরকারি পাঁচ ব্যাংকে ঘাটতি ৭৮ হাজার কোটি টাকা
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি পাঁচ ব্যাংকে মোট প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭৮ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতিতে রয়েছে জনতা ব্যাংক। ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি ৫০ হাজার ১৬০ কোটি টাকা।
অগ্রণী ব্যাংকের ঘাটতি ১২ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংকের ঘাটতি ১০ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা। বেসিক ব্যাংকের ঘাটতি ৫ হাজার ৪৭ কোটি টাকা।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি প্রায় ৩৩ কোটি টাকা।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর এই ঘাটতি ব্যাংকের মূলধন ভিত্তিকে দুর্বল করে তুলছে। একই সঙ্গে আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।
বেসরকারি ১০ ব্যাংকে ঘাটতি দেড় লাখ কোটি টাকা
বেসরকারি খাতের ১০টি ব্যাংকে প্রভিশন ঘাটতি আরও বড়। এসব ব্যাংকের সম্মিলিত ঘাটতি ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি রয়েছে। ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি ৮২ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা।
ন্যাশনাল ব্যাংকের ঘাটতি ২৩ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা। আইএফআইসি ব্যাংকের ঘাটতি ২১ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা।
এ ছাড়া প্রিমিয়ার ব্যাংকের ঘাটতি ১১ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা। ইউনিয়ন ব্যাংকের ঘাটতি ৫ হাজার ৫ কোটি টাকা। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ঘাটতি ২ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা।
মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ঘাটতি ২ হাজার ৯৫ কোটি টাকা। বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৬৪৫ কোটি টাকা। এনআরবিসি ব্যাংকের ৮২০ কোটি টাকা এবং এনআরবি ব্যাংকের ১৩০ কোটি টাকা প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে।
খেলাপি ঋণই বড় সংকট
ব্যাংক খাতের সংকটের পেছনে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধিকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, মূল সমস্যা হলো খেলাপি ঋণ। খেলাপি ঋণ না থাকলে প্রভিশন ঘাটতিও তৈরি হয় না।
তার মতে, খেলাপিদের বারবার নীতিগত ছাড় দেওয়া হয়েছে। আবার ঘাটতি থাকার পরও লভ্যাংশ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে ব্যাংক খাতে ভুল বার্তা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, এ ধরনের নীতির শেষ পরিণতি আমানতকারীদের অর্থকে ঝুঁকিতে ফেলা। তাই ক্ষতিকর নীতিমালা বাতিল করতে হবে। একই সঙ্গে ঋণ আদায় ও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খেলাপি
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা।
এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশই খেলাপি।
সহজভাবে বললে, ব্যাংকের ১০০ টাকা ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকা খেলাপি হয়ে গেছে। এর বড় অংশ আদায় নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ঋণখেলাপিদের ছাড় নিয়ে প্রশ্ন
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পিস স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ও মানারত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী ঋণ নিয়েছেন। পরে তারা দীর্ঘ সময় ধরে ঋণ পরিশোধ করেননি।
তার মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকও বিভিন্ন সময়ে খেলাপিদের সুযোগ দিয়েছে। এতে ঋণ পরিশোধ না করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, অনিয়ম ও খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণেই ব্যাংকগুলো নাজুক অবস্থায় পড়েছে। তাই বড় খেলাপিদের সুবিধা দেওয়া বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রভিশন কেন গুরুত্বপূর্ণ
আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোকে ঋণের মান অনুযায়ী প্রভিশন রাখতে হয়।
সাধারণ ঋণের ক্ষেত্রে দশমিক ৫ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রভিশন রাখতে হয়। নিম্নমানের খেলাপি ঋণের বিপরীতে ২০ শতাংশ প্রভিশন প্রয়োজন।
সন্দেহজনক ঋণের বিপরীতে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ বা লোকসানি ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন রাখতে হয়।
প্রভিশন ঘাটতি থাকলে ব্যাংকের লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে মূলধন ঘাটতির ঝুঁকিও বাড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক খাতের প্রভিশন ঘাটতি কমাতে হলে খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। একই সঙ্গে ঋণ আদায় বাড়াতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।




















