ফরিদপুরের ভাঙ্গায় কুমার নদে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ
- আপডেট সময় : ০৪:১৯:১৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৫৫৩ বার পড়া হয়েছে
ফরিদপুরের ভাঙ্গায় দীর্ঘ ১৫ বছর পর আবারও কুমার নদে অনুষ্ঠিত হয়েছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ। হিন্দু সম্প্রদায়ের বিশ্বকর্মা পূজা উপলক্ষে শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ভাঙ্গা পৌরসভার কুমার নদে এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। দীর্ঘ বিরতির পর নৌকা বাইচ ফিরে আসায় স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়।
নৌকা বাইচ দেখতে নদীর দুই পাড়ে জড়ো হন হাজার হাজার মানুষ। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে সকাল থেকেই কুমার নদের আশপাশের এলাকা উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। নদীর দুই তীরে দর্শনার্থীদের ভিড় থাকায় পুরো আয়োজন পরিণত হয় বড় ধরনের লোকজ উৎসবে।
দীর্ঘ বিরতির পর ফিরল নৌকা বাইচ
একসময় গ্রাম বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় বিনোদন ও লোকজ সংস্কৃতির অংশ ছিল নৌকা বাইচ। বর্ষাকালে নদী-নালা ও খালবিলে নৌকা বাইচকে ঘিরে তৈরি হতো উৎসবের আমেজ। তবে নানা কারণে সময়ের সঙ্গে অনেক এলাকায় এই ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে।
ভাঙ্গার কুমার নদেও দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর নৌকা বাইচের আয়োজন হয়নি। ফলে এবারের আয়োজনকে ঘিরে স্থানীয়দের আগ্রহ ছিল অনেক বেশি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রিয় এই লোকজ আয়োজন ফিরে আসায় আনন্দ প্রকাশ করেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
নদীর দুই পাড়ে দর্শনার্থীদের ঢল
বিকেলে প্রতিযোগিতা শুরু হলে কুমার নদে একের পর এক রঙিন নৌকা ছুটে চলে। প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন দল অংশ নেয়। নৌকার মাঝিরা একসঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে বৈঠা চালানোর সঙ্গে সঙ্গে নদীতে তৈরি হয় দারুণ দৃশ্য।
দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শনার্থীরা করতালি, উল্লাস ও নানা স্লোগানে প্রতিযোগীদের উৎসাহ দেন। নৌকা যত সামনে এগিয়ে যায়, ততই বাড়তে থাকে দর্শকদের উত্তেজনা। শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি বয়স্করাও দীর্ঘ সময় নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে নৌকা বাইচ উপভোগ করেন।
স্থানীয়দের অনেকেই জানান, ছোটবেলায় দেখা নৌকা বাইচ আবার চোখের সামনে দেখতে পেরে তারা আনন্দিত। নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেও এটি ছিল প্রথমবারের মতো সরাসরি নৌকা বাইচ দেখার অভিজ্ঞতা।
নৌকা বাইচ ঘিরে গ্রামীণ মেলা
নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে ভাঙ্গা উপজেলা পরিষদের সামনে বসে গ্রামীণ মেলা। মেলায় বিভিন্ন ধরনের দোকানপাট, বাহারি পণ্য ও গ্রামীণ বিনোদনের ব্যবস্থা ছিল। নানা বয়সী মানুষের পদচারণায় মেলা প্রাঙ্গণও হয়ে ওঠে জমজমাট।
মেলায় শিশুদের জন্য বিভিন্ন বিনোদনের ব্যবস্থা ছিল। পাশাপাশি স্থানীয় ও আশপাশের এলাকার ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন ধরনের পণ্য নিয়ে দোকান বসান। ফলে নৌকা বাইচের পাশাপাশি মেলাও দর্শনার্থীদের বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করে।
নদীর পাড়, মেলা প্রাঙ্গণ ও আশপাশের সড়কে মানুষের উপস্থিতি পুরো ভাঙ্গা শহরে উৎসবের আবহ তৈরি করে।
লোকজ ঐতিহ্য ধরে রাখার আহ্বান
নৌকা বাইচ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। বিশেষ অতিথি ছিলেন ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুল।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শহিদুল ইসলাম বাবুল বলেন, দীর্ঘদিন পর ভাঙ্গাবাসীর প্রাণের দাবি পূরণ হয়েছে। গ্রাম বাংলার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, লোকসংস্কৃতির শেকড়ের টানে নৌকাবাইচ, জারি ও সারি গানের মতো ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে হবে। হারানো দিনের এসব সংস্কৃতি ধরে রাখতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে ছিলেন স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা
ভাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুল হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফরিদপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক আফজাল হোসেন খান পলাশ, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. শামীমুজ্জামান, ভাঙ্গা উপজেলা বিএনপির সভাপতি খন্দকার ইকবাল হোসেন সেলিম, সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব মোল্লা, জেলা কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক মুরাদ হোসেন, মহানগর কৃষক দলের সভাপতি অ্যাডভোকেট মামুনুর রশিদ মামুন এবং জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক তানজিলুর রহমান কায়েসসহ স্থানীয় বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা।
ভাঙ্গা উপজেলা বিএনপির সভাপতি খন্দকার ইকবাল হোসেনের উদ্যোগে এবং ভাঙ্গা উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় এ নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।
বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার
প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রধান ও বিশেষ অতিথিরা। পুরস্কার বিতরণীর সময়ও উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় ছিল।
আয়োজকরা বলেন, গ্রাম বাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করে তুলতে নৌকা বাইচের মতো আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে এসব আয়োজন স্থানীয় লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে মানুষের আগ্রহ বাড়াবে।
দীর্ঘ ১৫ বছর পর কুমার নদে নৌকা বাইচ ফিরে আসায় স্থানীয়দের মধ্যে যে উৎসাহ তৈরি হয়েছে, তা ভবিষ্যতেও এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত রাখার অনুপ্রেরণা জোগাবে বলে মনে করছেন আয়োজকরা।























