চাঁদপুরের ৩১ শহিদ: অনুদান মিলেছে, স্বজনদের অপেক্ষা বিচারের
- আপডেট সময় : ১১:৩২:১০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬
- / ১৫৫৪ বার পড়া হয়েছে
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে চাঁদপুরের ৩১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজন কুমিল্লায়, দুজন চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ ও ফরিদগঞ্জে এবং অন্যরা রাজধানী ঢাকা ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় শহিদ হন। এসব শহিদের মধ্যে মতলব উত্তর উপজেলার পারভেজ ব্যাপারী ছাড়া বাকিদের মরদেহ শনাক্ত করে দাফন করা হয়েছে। তবে এক বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁদের স্বজনদের বুকের ক্ষত শুকায়নি। সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন অনুদান পেলেও স্বজনদের একটাই দাবি—যারা গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যা করেছে, তাদের সঠিক বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
চাঁদপুরের কচুয়া, হাজীগঞ্জ, ফরিদগঞ্জ, মতলব উত্তর, মতলব দক্ষিণ ও সদর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে শহিদদের বাড়িতে সরেজমিনে গিয়ে এবং স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ থানা এলাকায় শহিদ হন বালিথুবা ইউনিয়নের শাহাদাত। একই দিন হাজীগঞ্জের অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ কুমিল্লার মোগলটলি এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। পরে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৫ আগস্ট তাঁর মৃত্যু হয়।
হাজীগঞ্জ পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের টোরাগড় এলাকার বাসিন্দা আজাদ সরকার (৬৫) ৪ আগস্ট ধারালো অস্ত্রের আঘাতে হামলার শিকার হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ৩১ শহিদের মধ্যে অন্যরা ঢাকা ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় প্রাণ হারালেও তাঁদের বাড়ি চাঁদপুরের বিভিন্ন উপজেলায়।
প্রথম দিকে সহায়তাও পাননি পরিবারগুলো
আন্দোলনের সময় বিভিন্ন দিনে শহিদ হলেও ৫ আগস্টের আগে এসব পরিবারের অধিকাংশই কোনো ধরনের সরকারি সহায়তা পাননি। ৫ আগস্টের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সামনে আসে তাঁদের মৃত্যুর নির্মম ঘটনাগুলো। একেকটি পরিবারের গল্প যেন একেকটি হৃদয়বিদারক অধ্যায়।
সেই সময় চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক ছিলেন মোহাম্মদ মোহসীন উদ্দিন। ঢাকায় শহিদ হওয়া অধিকাংশই ছিলেন দিনমজুর, শ্রমজীবী কিংবা নিম্নআয়ের পরিবারের সদস্য। তাঁদের পরিবারের খোঁজ নিতে গিয়ে উঠে আসে চরম আর্থিক অনটন ও অসহায়ত্বের চিত্র।
শহিদ পরিবারগুলোর বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাইয়ের পর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কর্মকর্তাদের এসব বাড়িতে পাঠানো হয়। সাংবাদিকদের অনুরোধের পর প্রত্যেক পরিবারকে ১০ হাজার টাকা নগদ সহায়তা এবং ফল দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগেও সহায়তা পেয়েছেন শহিদ পরিবারের সদস্যরা।
তবে স্বজনদের বক্তব্য, অর্থনৈতিক সহায়তা প্রয়োজন ছিল, এখনো আছে; কিন্তু প্রিয়জন হত্যার বিচার না হলে সেই ক্ষত কোনোদিন পূরণ হবে না।
মাথার একাংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল মানিকের
ফরিদগঞ্জ উপজেলার বালিথুবা পূর্ব ইউনিয়নের পূর্ব মানিকরাজ গ্রামের বাইনের বাড়ির মৃত নুর মোহাম্মদের ছেলে আব্দুল কাদির মানিক (৪৩)। আন্দোলনের সময় রাজধানীর উত্তরা এলাকায় গুলিতে শহিদ হন তিনি।
স্বজনদের ভাষ্য, গুলিতে মানিকের মাথার একাংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। উত্তরা থেকে স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় তাঁর মরদেহ গ্রামের বাড়িতে আনা হয়। পরে সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়।
মানিকের স্ত্রী রাহিমা বলেন, স্বামীকে হারিয়ে তাঁদের পরিবার অসহায় হয়ে পড়েছে। স্বামী হত্যার বিচার চান তিনি।
রাহিমার তথ্য অনুযায়ী, মানিক শহিদ হওয়ার পর ফরিদগঞ্জের বর্তমান সংসদ সদস্য এমএ হান্নান ৫০ হাজার টাকা, দলের আরেক নেতা ১০ হাজার টাকা এবং সাবেক সংসদ সদস্য লায়ন হারুনুর রশিদ ২০ হাজার টাকা সহযোগিতা করেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকেও ১০ হাজার টাকা ও কিছু ফল দেওয়া হয়।
এ ছাড়া জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে পাঁচ লাখ টাকা, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুই লাখ টাকা এবং সর্বশেষ জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র পেয়েছে পরিবারটি।
রাহিমার আক্ষেপ, সহায়তা পাওয়ার পর এখন আর কেউ তাঁদের খোঁজ নেয় না।
বিজয় মিছিলে গিয়ে গুলিতে প্রাণ গেল আমিরের
ফরিদগঞ্জ উপজেলার সুবিদপুর ইউনিয়নের বড়গাঁও গ্রামের গোযার বাড়ির খোরশেদ আলমের ছেলে আমির হোসেন (৩২)। রাজধানীর উত্তরায় একটি ডেভেলপমেন্ট কোম্পানিতে গাড়িচালক হিসেবে চাকরি করতেন তিনি।
৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর উত্তরা মডেল টাউন এলাকায় স্থানীয়দের সঙ্গে বিজয় মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন আমির। সেখানেই বুকে ও গলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহিদ হন তিনি।
ছেলের মৃত্যুর কথা বলতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বাবা খোরশেদ আলম ও তাঁর স্ত্রী। তাঁদের দাবি, ছেলেকে যারা গুলি করে হত্যা করেছে, তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
‘ছেলেকে একবার নিজ হাতে ছুঁয়েও দেখতে পারিনি’
মতলব উত্তর উপজেলার ফতেপুর পূর্ব ইউনিয়নের বারহাতিয়া গ্রামের ব্যাপারী বাড়ির সবুজর বেপারীর ছেলে মো. পারভেজ ব্যাপারী (২৩)। ১৯ জুলাই রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নাকে ও কপালে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহিদ হন তিনি।
পারভেজের মা শামছুন্নাহার এখনো সন্তানের শোকে কাতর। তাঁর সবচেয়ে বড় কষ্ট—ছেলের মরদেহ তিনি দেখতে পারেননি, নিজ হাতে শেষবারের মতো ছুঁয়েও দেখতে পারেননি।
শামছুন্নাহার বলেন, “ছেলে আমার শহিদ হলেও একবার নিজ হাতে ছুঁয়ে দেখতে পারিনি। জন্মস্থানের মাটিও কপালে হয়নি আমার ছেলের।”
পরিবারের পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে ঢাকায় গণকবরস্থানে পারভেজের দাফন করা হয় বলে জানান স্বজনরা।
পারভেজের মরদেহ শনাক্ত করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি। ফলে অন্য শহিদদের মতো নিজ গ্রামের মাটিতে তাঁর শেষ ঠিকানা হয়নি। সন্তান হত্যার বিচার দেখে যেতে চান পারভেজের স্বজনরাও।
নামাজ পড়ে মিছিলে গিয়ে আর ফেরেননি সাব্বির
চাঁদপুর শহরের রঘুনাথপুর গ্রামের রাজা বাড়ির জসিম উদ্দিন রাজার ছেলে হাফেজ সাজ্জাদ হোসেন সাব্বির (১৯)। ১৯ জুলাই রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় মসজিদে আসরের নামাজ আদায় করে আন্দোলনের মিছিলে যোগ দেন তিনি।
স্বজনদের ভাষ্য, সেখানে পুলিশের গুলিতে শহিদ হন সাব্বির। অল্প বয়সে সন্তানকে হারিয়ে তাঁর মা শাহনাজ বেগম এখনো শোকে কাতর।
সাব্বিরের পরিবারেরও একটাই প্রত্যাশা—সন্তান হত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিচার হোক।
অনুদানের পাশাপাশি বিচারও চান স্বজনরা
চাঁদপুরের ৩১ শহিদ পরিবারের অনেকেই সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উৎস থেকে আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন। কারও পরিবার পেয়েছে নগদ অর্থ, কারও পরিবার সঞ্চয়পত্র বা অন্যান্য সহযোগিতা। এসব সহায়তা তাঁদের দুর্দশার সময়ে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে।
তবে স্বজনদের বক্তব্য, অর্থ দিয়ে প্রিয়জন হারানোর শূন্যতা পূরণ করা সম্ভব নয়। তাঁরা চান, আন্দোলনে নিহত প্রত্যেকের মৃত্যুর ঘটনা সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করা হোক। গুলি চালানো, হামলা ও হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হোক।
শহিদ পরিবারের সদস্যদের ভাষায়, “আমরা টাকা চাইনি, আমরা আমাদের মানুষটাকে চেয়েছিলাম। এখন অন্তত হত্যার বিচার চাই।”
চাঁদপুরের ৩১ শহিদের পরিবারে তাই সরকারি সহায়তা পৌঁছালেও শেষ হয়নি অপেক্ষা। তাঁদের চোখে এখনো স্বজন হারানোর শোক, আর কণ্ঠে একটাই দাবি—শহিদদের রক্তের সঠিক বিচার।























