গ্যাস সংকটে বিপর্যস্ত প্লাস্টিক ও সিরামিক শিল্প, কমেছে উৎপাদন
- আপডেট সময় : ০৬:৩২:৫১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬
- / ১৫৫৮ বার পড়া হয়েছে
তীব্র গ্যাস সংকট ও পাইপলাইনে নিম্নচাপের কারণে জ্বালানিনির্ভর প্লাস্টিক ও সিরামিক শিল্পের কারখানা স্থাপিত সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন করছে। কোথাও কোথাও উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধও রাখতে হয়েছে। শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, আমদানি করা এলএনজির ওপর বাড়তি নির্ভরতা এবং একটি ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিটের (এফএসআরইউ) কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্যাস সরবরাহে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোর উৎপাদনে।
ইনজেকশন মোল্ডিং, ব্লো মোল্ডিং ও এক্সট্রুশনসহ প্লাস্টিক শিল্পের প্রায় সব উৎপাদন প্রক্রিয়াই নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। তবে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং গ্যাসের নিম্নচাপের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যয়বহুল ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে, এতে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে।
বাংলাদেশ প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিপিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, কাঁচামালের সংকট, দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যা এবং কার্যকর মূলধনের অভাবে ইতোমধ্যে প্রায় ৩০০টি প্লাস্টিক কারখানা উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। এসবের বেশিরভাগই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই)।
সমিতির সভাপতি শামীম আহমেদ বলেন, বর্তমানে অনেক কারখানা তাদের সক্ষমতার মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ উৎপাদন করতে পারছে। তিনি নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এদিকে সমিতির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি কে এম ইকবাল হোসেন জানান, গত কয়েক বছরে ২৫ কেজির একটি পিইটি রেজিনের বস্তার দাম প্রায় ৩ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৫ হাজার ২০০ টাকায় পৌঁছেছে। অথচ একই সময়ে উৎপাদকরা পণ্যের দাম মাত্র ৫-১০ শতাংশ বাড়াতে পেরেছেন।
সিরামিক শিল্পেও পরিস্থিতি ভয়াবহ। টাইলস, টেবিলওয়্যার ও স্যানিটারি পণ্য তৈরির চুল্লি (কিলন) নিরবচ্ছিন্ন উচ্চ তাপমাত্রায় চালাতে হয়। কিন্তু গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে পুরো উৎপাদন ব্যাচ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ সিরামিক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিসিএমইএ) সহসভাপতি রশীদ মাইমুনুল ইসলাম বলেন, অনেক কারখানা প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। এলপিজি ব্যবহার করাও বাস্তবসম্মত নয়, কারণ এতে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যায়।
আরএকে সিরামিকস (বাংলাদেশ)-এর কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম জানান, কারখানার চুল্লি সচল রাখতে অন্তত ২৫ পিএসআই গ্যাসচাপ প্রয়োজন হলেও অনেক সময় তা ৮ থেকে ১০ পিএসআই-এ নেমে আসে। এতে কাঁচামাল ও আধা-প্রস্তুত পণ্য নষ্ট হচ্ছে এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি সংকট শুধু উৎপাদনই নয়, নতুন বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণকেও নিরুৎসাহিত করছে। গ্যাস সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণ পরিকল্পনা স্থগিত করেছে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের (বিএপিএলসি) সভাপতি রিয়াদ মাহমুদ বলেন, সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ধীরে ধীরে ভিয়েতনামের দিকে ঝুঁকছেন। এতে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি রপ্তানি বাজারও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। তিনি মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস আমদানির সরকারি পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়ে দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। তাঁর মতে, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে শিল্পখাতের সংকট আরও গভীর হবে।

























