স্ট্রোক পরবর্তী ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার গুরুত্ব
- আপডেট সময় : ০২:২১:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬
- / ১৬৪২ বার পড়া হয়েছে
স্ট্রোক একটি আকস্মিক ও জীবন পরিবর্তনকারী স্নায়বিক সমস্যা। মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্ত সরবরাহ বন্ধ বা কমে গেলে শরীরের নড়াচড়া, অনুভূতি, কথা বলা, ভারসাম্য, স্মৃতি ও দৈনন্দিন কাজের সক্ষমতায় নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। স্ট্রোকের পর এসব শারীরিক ও কার্যগত সমস্যা কমিয়ে রোগীকে যতটা সম্ভব স্বনির্ভর জীবনে ফিরিয়ে আনতে ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসন চিকিৎসা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
স্ট্রোকের পর যেসব সমস্যা দেখা দিতে পারে
স্ট্রোকের পর অনেক রোগীর শরীরের এক পাশ দুর্বল বা অবশ হয়ে যায়। কারও পেশি অতিরিক্ত শক্ত হয়ে যেতে পারে, আবার কারও পেশিশক্তি কমে গিয়ে নড়াচড়া ব্যাহত হয়। পাশাপাশি মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া, কথা বলায় অসুবিধা, হাঁটা ও ভারসাম্যের সমস্যা, হাত-পায়ের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা, জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া এবং ব্যথার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এ ছাড়া দীর্ঘদিনের শারীরিক অক্ষমতার কারণে রোগীর মধ্যে হতাশা, উদ্বেগ ও সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার প্রবণতাও তৈরি হতে পারে। তাই স্ট্রোক পুনর্বাসন শুধু শারীরিক চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; প্রয়োজন অনুযায়ী স্পিচ থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, মনোসামাজিক সহায়তা ও পরিবারের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ।
ফিজিওথেরাপির ভূমিকা
স্ট্রোক-পরবর্তী ফিজিওথেরাপির মূল উদ্দেশ্য হলো রোগীর অবশিষ্ট সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে নড়াচড়া ও দৈনন্দিন কার্যক্ষমতা যতটা সম্ভব ফিরিয়ে আনা। চিকিৎসা শুরুর আগে রোগীর মোটর ও সেনসরি ফাংশন, পেশিশক্তি, পেশির টোন, রিফ্লেক্স, বসা ও দাঁড়ানোর সক্ষমতা, ভারসাম্য, হাঁটা এবং দৈনন্দিন কাজের দক্ষতা মূল্যায়ন করা হয়। এরপর রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যক্তিকেন্দ্রিক পুনর্বাসন পরিকল্পনা তৈরি করা হয়।
ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে সাধারণত—
- পেশিশক্তি ও নড়াচড়া উন্নত করা;
- বসা, দাঁড়ানো ও হাঁটার সক্ষমতা বাড়ানো;
- ভারসাম্য ও সমন্বয় উন্নত করা;
- জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া ও অন্যান্য জটিলতা প্রতিরোধ;
- পেশির অস্বাভাবিক শক্তভাব বা স্পাস্টিসিটি ব্যবস্থাপনা;
- দৈনন্দিন কাজের সক্ষমতা বাড়ানো এবং
- রোগীকে ধীরে ধীরে স্বনির্ভর করে তোলার চেষ্টা করা হয়।
ভারসাম্যের সমস্যা বা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকলে উপযুক্ত ব্যালান্স ট্রেনিং এবং হাঁটার সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজন অনুযায়ী শক্তিবর্ধক ও কার্যভিত্তিক ব্যায়ামও পুনর্বাসন কর্মসূচির অংশ হতে পারে।
কখন শুরু হবে ফিজিওথেরাপি?
স্ট্রোকের পর পুনর্বাসন অযথা দীর্ঘ সময় পিছিয়ে না দিয়ে রোগীর চিকিৎসাগত অবস্থা স্থিতিশীল হলে দ্রুত শুরু করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে এর অর্থ স্ট্রোকের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অতিরিক্ত বা জোরালো ব্যায়াম শুরু করা নয়। American Heart Association/American Stroke Association-এর নির্দেশনায় রোগীর সহনশীলতা ও সম্ভাব্য উপকার অনুযায়ী পুনর্বাসনের মাত্রা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে; স্ট্রোকের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় অতিরিক্ত মাত্রার খুব দ্রুত মোবিলাইজেশন ক্ষতিকর হতে পারে।
অর্থাৎ, কখন এবং কী মাত্রায় ফিজিওথেরাপি শুরু হবে—তা রোগীর স্ট্রোকের ধরন, শারীরিক অবস্থা, অন্যান্য জটিলতা ও চিকিৎসকের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে।
স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য
প্রথম পর্যায়ে রোগীর নিরাপদ অবস্থান, নড়াচড়া, শ্বাস-প্রশ্বাস, জয়েন্টের গতিশীলতা এবং দৈনন্দিন কার্যক্রমের ভিত্তি তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী পর্যায়ে হাঁটা, হাতের ব্যবহার, ভারসাম্য, পেশিশক্তি এবং স্বাধীনভাবে দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা বাড়ানো হয়।
দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো রোগীকে যতটা সম্ভব স্বনির্ভর করা এবং তাকে পরিবার ও সমাজের স্বাভাবিক জীবনে পুনরায় যুক্ত করা। পুনর্বাসন প্রয়োজন অনুযায়ী হাসপাতাল থেকে শুরু করে আউটডোর বা বাড়িভিত্তিক চিকিৎসা পর্যন্ত চলতে পারে।
পরিবারের ভূমিকা
স্ট্রোক-পরবর্তী পুনর্বাসনে পরিবারের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী বাড়িতে নির্ধারিত ব্যায়াম করানো, রোগীকে নিরাপদে হাঁটা বা দৈনন্দিন কাজ করতে উৎসাহ দেওয়া, পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমানো এবং মানসিকভাবে পাশে থাকা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগী, পরিবার, চিকিৎসক, নার্স, ফিজিওথেরাপিস্ট, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, স্পিচ-ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট, মনোবিজ্ঞানীসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর সমন্বিত প্রচেষ্টা পুনর্বাসনের ফলাফল উন্নত করতে পারে।
স্ট্রোক প্রতিরোধেও সচেতনতা জরুরি
একবার স্ট্রোক হওয়ার পর পুনরায় স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ, রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান পরিহার, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং উপযুক্ত শারীরিক কর্মকাণ্ড গুরুত্বপূর্ণ। তবে নতুন করে ব্যায়াম শুরু করার আগে রোগীর চিকিৎসাগত অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসক বা পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
স্ট্রোক মানেই জীবনের শেষ নয়। সঠিক চিকিৎসা, সময়োপযোগী পুনর্বাসন, নিয়মিত অনুশীলন এবং পরিবারের সহযোগিতায় অনেক রোগী হারানো সক্ষমতার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পুনরুদ্ধার করে আরও স্বনির্ভর জীবনযাপন করতে পারেন। তবে প্রত্যেক রোগীর সুস্থতার গতি ও মাত্রা ভিন্ন—তাই চিকিৎসা পরিকল্পনাও হতে হবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক।
লেখক:
প্রদীপ চন্দ্র দাস
বিপিটি (এসসিএইচএস—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), এমএসএস (জেরোন্টোলজি অ্যান্ড জেরিয়াট্রিক ওয়েলফেয়ার—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), এমপিএইচ (ডিসঅ্যাবিলিটি ম্যানেজমেন্ট), ইউএনএসএ
নিউরো-ফিজিওথেরাপিস্ট, নিউরোসার্জারি বিভাগ
ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট



























