কার স্বার্থে বারবার কার্যাদেশ?
ডেইলি ট্রেডিংয়ের ১০ লটে ৩ লাখ ৮০ হাজার টন সার অনিশ্চিত
- আপডেট সময় : ১১:৪৯:১৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৫৩৮ বার পড়া হয়েছে
রবি মৌসুমের আগেই সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার যখন বিপুল পরিমাণ সার আমদানি ও মজুত গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে, ঠিক তখনই সরকারি সংস্থার একটি পরিবহন কার্যাদেশ ঘিরে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। লে-ক্যানের (Laycan) সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও জাহাজের উপস্থিতি নিশ্চিত নয়। অথচ একই প্রতিষ্ঠানের নামে ধারাবাহিকভাবে দেওয়া হয়েছে নতুন কার্যাদেশ।
জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)-এর সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ডেইলি ট্রেডিং নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে মরক্কো ও সৌদি আরব থেকে জিটুজি ব্যবস্থায় আমদানি করা টিএসপি ও ডিএপি সার পরিবহনের জন্য মোট ১০টি লটে প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টনের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম আটটি লটের লে-ক্যানের সময়সীমা ২৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জাহাজ লোডিং পোর্টে পৌঁছানোর বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
একদিকে কার্যাদেশ রয়েছে, অন্যদিকে লে-ক্যানের সময় অতিক্রান্ত—কিন্তু জাহাজ কোথায়, কখন লোড হবে এবং কবে সার দেশে পৌঁছাবে, তার স্পষ্ট জবাব নেই।
সূত্রটি আরও জানায়, আগের লটগুলোর কার্যাদেশ বাস্তবায়নের অবস্থাই যখন স্পষ্ট নয়, তখন একই প্রতিষ্ঠানকে পরবর্তী লটের জন্য কার্যাদেশ দেওয়ার প্রক্রিয়া কীভাবে এগোল?
সার পরিবহনে লে-ক্যান শুধু একটি তারিখ নয়; এটি জাহাজের নির্ধারিত লোডিং উইন্ডো। ওই সময়ের মধ্যে জাহাজ না পৌঁছালে সার লোডিং পিছিয়ে যেতে পারে। এরপর শুরু হয় সমুদ্রযাত্রা, বন্দরে জাহাজ ভেড়ানো, খালাস, ব্যাগিং, পরিবহন ও গুদামে পৌঁছানোর ধাপ।
ফলে লে-ক্যানের শুরুতেই বিলম্ব হলে পুরো সরবরাহ-শৃঙ্খলে তার প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে রবি মৌসুম সামনে রেখে এ ধরনের বিলম্বের গুরুত্ব আরও বেশি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে দেশে টিএসপির চাহিদা ৭০ হাজার ৫২ টন, ডিএপির ১ লাখ ৫০ হাজার ৯১০ টন এবং এমওপির ৯৩ হাজার ৬৫৪ টন নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার রবি-বোরো মৌসুমের জন্য আগাম মজুত ও সরবরাহ নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছে।
বিপুল চাহিদার এই সময়ে নির্ধারিত চালান সময়মতো না এলে তা সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
১০ লটে কেন একই প্রতিষ্ঠান?
অনুসন্ধানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে কার্যাদেশের ধারাবাহিকতা।
ডেইলি ট্রেডিংয়ের নামে ১০টি লটে মোট ৩ লাখ ৮০ হাজার টন সার পরিবহনের কার্যাদেশ দেওয়া হয়ে থাকলে প্রতিটি লটের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা, আগের কাজের পারফরম্যান্স, জাহাজের ব্যবস্থা, চার্টারারের সক্ষমতা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়েছিল কি না, এখন তা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
এখন প্রশ্ন হলো, প্রথম কয়েকটি লটের বাস্তবায়ন পরিস্থিতি পর্যালোচনার পরই কি পরবর্তী কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল, নাকি কার্যাদেশগুলো ধারাবাহিকভাবে অনুমোদিত হয়েছে?
আর যদি আগের লটের লে-ক্যান অতিক্রান্ত হয়ে থাকে, তাহলে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বিএডিসি কী ব্যবস্থা নিয়েছে? প্রথম আটটি লট নিয়ে প্রশ্নের মধ্যেই সামনে এসেছে আরও দুটি লট।
সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, নবম ও দশম লটের লে-ক্যান নির্ধারিত রয়েছে ৭ থেকে ৯ অক্টোবর। প্রথম আটটি লটের জাহাজ, লোডিং এবং সরবরাহ পরিস্থিতি স্পষ্ট হওয়ার আগেই পরবর্তী দুটি লটের পরিবহন পরিকল্পনা কীভাবে এগোল?
একটি লটের বাস্তবায়ন ব্যর্থ বা বিলম্বিত হলে পরবর্তী লটের কার্যাদেশে তার প্রভাব পড়বে কি না, সেটিও চুক্তির শর্ত ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করেই স্পষ্ট হতে পারে।
একজন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “লে-ক্যান পেরিয়ে গেলে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত—জাহাজ কোথায়? দ্বিতীয় প্রশ্ন—কেন সময়মতো পৌঁছাল না? আর তৃতীয় প্রশ্ন—এই অবস্থায় আগের কাজের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন না করেই পরবর্তী কার্যাদেশ দেওয়া হলো কীভাবে?”
তার মতে, জাহাজের নাম, IMO নম্বর, চার্টার পার্টি, লোডিং পোর্ট, জাহাজের সর্বশেষ অবস্থান এবং লে-ক্যানের তথ্য যাচাই করলেই অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব।
চুক্তির শাস্তিমূলক ধারা কার্যকর হয়েছে কি?
অনুসন্ধানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—লে-ক্যান অতিক্রমের পর চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না।
বিষয়টি নিয়ে বিএডিসির ম্যানেজার (ক্রয়) আহমেদ হাসান আল মাহমুদের কাছে জানতে চাওয়া হয়—
- লে-ক্যানের মধ্যে জাহাজ না পৌঁছালে চুক্তি অনুযায়ী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
- সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর নাম ও বর্তমান অবস্থান কী?
- জাহাজ ও চার্টারার যাচাই করা হয়েছিল কি না?
- আগের লটগুলোর বাস্তবায়ন মূল্যায়ন করা হয়েছিল কি না?
- বিলম্বের জন্য কোনো জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না?
- আগের কার্যাদেশের বাস্তবায়ন স্পষ্ট না হওয়ার পরও একই প্রতিষ্ঠানকে পরবর্তী কার্যাদেশ দেওয়ার কারণ কী?
- সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বিএডিসি ও বিএসসির কোন কর্মকর্তারা যুক্ত ছিলেন?
- আর্থিক সুবিধা বা কমিশনসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে কোনো তদন্ত হয়েছে কি না?
জবাবে তিনি বলেন, “আমি একটু পরে কল করছি।”
এরপর তিনি ফোন কেটে দেন। পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
বিষয়টি নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিএডিসির সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলা হয়েছে। ডেইলি ট্রেডিংয়ের বিরুদ্ধে আইনানুগভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
তবে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বিস্তারিত জানা যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ডেইলি ট্রেডিংকে ধারাবাহিকভাবে কার্যাদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিএডিসি ও বিএসসির কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ এবং আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগটি সত্য কি না, তা নির্ধারণে টেন্ডার নথি, মূল্যায়ন কমিটির কার্যবিবরণী, কার্যাদেশ, অনুমোদন নোট, চুক্তি, জাহাজের তথ্য, চার্টারার নিয়োগের কাগজপত্র এবং অর্থ পরিশোধের নথি পর্যালোচনা প্রয়োজন।
বড় পরিসরে সার আমদানির উদ্যোগ
সূত্রটি আরও জানায়, সরকার ইতোমধ্যে রবি-বোরো মৌসুমের জন্য বিপুল পরিমাণ সার আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। ২৪ আগস্টের এক বৈঠকে সরকার ৩ লাখ ৬৫ হাজার টন সার আমদানির অনুমোদন দেয়। এর মধ্যে মরক্কো থেকে জিটুজি ব্যবস্থায় ডিএপি ও টিএসপির একাধিক লটও ছিল।
১৬ সেপ্টেম্বরও আরও ১০ লাখ ৭৫ হাজার টন সার আমদানির বিভিন্ন প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। এর মধ্যে মরক্কো থেকে ডিএপির একাধিক লট রয়েছে।
সরকারের সার আমদানি পরিকল্পনা বড় পরিসরে এগোচ্ছে। কিন্তু সেই আমদানি সময়মতো দেশে পৌঁছানোর জন্য পরিবহন পর্যায়ে যদি লে-ক্যান অতিক্রম, জাহাজের অনিশ্চয়তা বা কার্যাদেশ বাস্তবায়নে বিলম্ব তৈরি হয়, তাহলে কাগজে আমদানি অনুমোদন থাকলেও মাঠপর্যায়ে সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।
ডেইলি ট্রেডিংয়ের ১০ লটে ৩ লাখ ৮০ হাজার টন সার পরিবহনের ঘটনায় এখন অন্তত তিনটি প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি।
এক. লে-ক্যান অতিক্রান্ত প্রথম আটটি লটের জাহাজগুলো কোথায়?
দুই. নির্ধারিত সময়ে জাহাজ না পৌঁছালে চুক্তি অনুযায়ী বিএডিসি কী ব্যবস্থা নিয়েছে?
তিন. আগের কার্যাদেশের বাস্তবায়ন পরিস্থিতি স্পষ্ট হওয়ার আগেই একই প্রতিষ্ঠানকে পরবর্তী কার্যাদেশ দেওয়ার যৌক্তিকতা কী?
এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কার্যাদেশের হিসাব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার, সার সরবরাহ ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা এবং রবি মৌসুমে কৃষকের প্রয়োজনীয় সার সময়মতো মাঠে পৌঁছানোর বিষয়টি।
তাই এখন প্রয়োজন কার্যাদেশ থেকে জাহাজ, লে-ক্যান থেকে লোডিং, সমুদ্রযাত্রা থেকে খালাস—পুরো প্রক্রিয়ার নথিভিত্তিক যাচাই করা।
লে-ক্যান পেরিয়েও যদি জাহাজের অবস্থান অজানা থাকে এবং আগের কার্যাদেশের বাস্তবায়ন স্পষ্ট না হয়েও নতুন কার্যাদেশ চলতে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—এই ধারাবাহিকতার দায় নেবে কে?


























