রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ: শামা ওবায়েদ
- আপডেট সময় : ১২:৫৪:৪৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৫৫০ বার পড়া হয়েছে
রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার কারণে বাংলাদেশের পরিবেশ ও জলবায়ুর ওপর যে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায়ও আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর সিরডাপ ভবনে ‘পারস্যুইং ক্লাইমেট জাস্টিস: রোড টু ইউএনজিএ’ শীর্ষক এক আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।
রোহিঙ্গা সংকটে বাড়ছে পরিবেশগত চাপ
শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। বর্তমানে প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। তাদের দীর্ঘদিন ধরে আশ্রয় দেওয়ার ফলে দেশের ওপর মানবিক চাপের পাশাপাশি পরিবেশগত চাপও বাড়ছে।
বিশেষ করে কক্সবাজারের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান স্থানীয় পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। বন উজাড়, পানির ওপর চাপ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার নিয়ে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা জরুরি বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্ব
বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে শামা ওবায়েদ বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হতে হবে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছায়। একই সঙ্গে তাদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে আসছে। তবে এই পরিস্থিতি স্থায়ী সমাধান নয়। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ফেরানোর প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
কপ সম্মেলনে বাংলাদেশের দাবি
আসন্ন কপ সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার পাশাপাশি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও তুলে ধরবে বাংলাদেশ। শামা ওবায়েদ বলেন, আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় বাংলাদেশের স্বার্থ ও জলবায়ু ঝুঁকির বিষয়গুলো জোরালোভাবে উপস্থাপন করা হবে।
তিনি জানান, রোহিঙ্গা সংকটের কারণে বাংলাদেশের পরিবেশগত ও সামাজিক চাপ বেড়েছে। তাই এই সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রীও কপ সম্মেলনে এসব বিষয় তুলে ধরবেন বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
ঋণ নয়, অনুদানভিত্তিক জলবায়ু অর্থায়ন চায় বাংলাদেশ
জলবায়ু অর্থায়ন নিয়েও বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন শামা ওবায়েদ। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন আরও সহজলভ্য করতে হবে।
বাংলাদেশ চায় জলবায়ু অর্থায়নের বড় অংশ অনুদানভিত্তিক হোক। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ওপর নতুন করে ঋণের বোঝা চাপানো হলে সংকট আরও বাড়তে পারে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রতিশ্রুতি দেওয়ার মধ্যেই জলবায়ু অর্থায়ন সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর কাছে দ্রুত ও কার্যকরভাবে অর্থ পৌঁছানো জরুরি।
জলবায়ু ন্যায্যতায় বাংলাদেশের চার দাবি
জলবায়ু ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের চারটি প্রধান দাবি রয়েছে বলে জানান শামা ওবায়েদ। প্রথমত, লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডসহ বিভিন্ন ক্লাইমেট ফান্ডে দেওয়া প্রতিশ্রুত অর্থ বাস্তবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর কাছে পৌঁছাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, জলবায়ু অর্থায়নকে আরও সহজলভ্য ও অনুদানভিত্তিক করতে হবে। পাশাপাশি জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর ঋণের চাপ কমানোর বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
তৃতীয়ত, জ্বালানি খাতে রূপান্তরের সময় শ্রমিক ও সাধারণ জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তরের মাধ্যমে যাতে কোনো জনগোষ্ঠী নতুন করে ক্ষতির মুখে না পড়ে, সেদিকে নজর দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
চতুর্থত, জলবায়ু নীতি ও কর্মসূচিতে জেন্ডারভিত্তিক এবং নারী-সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিত করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নারী ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ায় এ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে বাংলাদেশ।
বিশ্বে পাটের পরিবেশবান্ধব গুরুত্ব তুলে ধরবে বাংলাদেশ
আলোচনায় বাংলাদেশের পাট খাতের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, পাট একটি প্রাকৃতিক ও বায়োডিগ্রেডেবল তন্তু। তাই পরিবেশ রক্ষায় পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
বিশ্ববাজারে পাট ও পাটজাত পণ্যকে আরও বেশি পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে তুলে ধরতে চায় বাংলাদেশ। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর বৈশ্বিক উদ্যোগের সঙ্গে পাটের ব্যবহারকে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি জানান।
শামা ওবায়েদ বলেন, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ শুধু ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাইছে না। বরং পরিবেশবান্ধব পণ্য, সবুজ অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রেও নিজেদের সম্ভাবনা তুলে ধরতে চায়।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অব্যাহত থাকবে উদ্যোগ
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার রয়েছে। সেই অঙ্গীকার অনুযায়ী দেশের পরিবেশ সুরক্ষা, জলবায়ু অভিযোজন এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে।
তিনি বলেন, জলবায়ু সংকট এখন শুধু পরিবেশের বিষয় নয়। এর সঙ্গে অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা, মানুষের জীবনযাত্রা, অভিবাসন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার বিষয়ও জড়িত। তাই এ সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও ন্যায়সংগত অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশ একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশা করছে বলে জানান শামা ওবায়েদ ইসলাম।

























