ভোরের ঢাকায় বেপরোয়া ছিনতাই, প্রাণ যাচ্ছে মানুষের
- আপডেট সময় : ১১:০৫:৫০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৫১৯ বার পড়া হয়েছে
রাজধানী ঢাকায় ভোরের দিকে ছিনতাইয়ের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ফাঁকা সড়ক, কম মানুষের চলাচল এবং দ্রুত পালানোর সুযোগ কাজে লাগিয়ে সক্রিয় থাকে ছিনতাইকারীরা। গত কয়েক বছরে ছিনতাইকারীদের হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন একাধিক মানুষ।
রিকশা থেকে পড়ে প্রাণ গেল প্রধান শিক্ষিকার
সর্বশেষ গত ২৯ আগস্ট ভোর সাড়ে ৬টার দিকে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজার সামনে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। বগুড়ার বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রনজিনা পারভীন রিকশায় করে হাসপাতালে যাচ্ছিলেন।
এ সময় মোটরসাইকেলে থাকা ছিনতাইকারীরা তার ব্যাগ ধরে টান দেয়। এতে চলন্ত রিকশা থেকে রাস্তায় পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভোরে একই ধরনের ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে।
২০২৬ সালের জুনেও ঈদের ছুটি শেষে ঢাকায় ফেরার পথে ছিনতাইকারীর টানে রিকশা থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন এক নারী। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
এর আগে ২০২৩ সালের ১ জুলাই ভোর সোয়া ৪টার দিকে ফার্মগেটে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন পুলিশ কনস্টেবল মনিরুজ্জামান তালুকদার।
২০২৪ সালের ২৪ অক্টোবর ভোরে কেরানীগঞ্জে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন অটোরিকশাচালক মো. নয়ন। ছিনতাইকারীরা তার অটোরিকশা নিয়ে পালিয়ে যায়।
ভোরে ছিনতাইয়ের ঝুঁকি কেন বেশি
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ভোররাত থেকে সকাল পর্যন্ত ছিনতাইয়ের ঝুঁকি বেশি হওয়ার কয়েকটি কারণ রয়েছে।
প্রথমত, মধ্যরাতের পর রাজধানীর অনেক সড়ক ফাঁকা হয়ে যায়। ২০২৩ সালে পুলিশ কনস্টেবল মনিরুজ্জামান হত্যার পরও পুলিশ জানিয়েছিল, রাত ২টার পর সড়ক ফাঁকা হওয়ায় ছিনতাইকারীরা এ সময়কে বেছে নেয়।
দ্বিতীয়ত, ভোরে বাস, ট্রেন ও লঞ্চ থেকে নামা মানুষের চলাচল অনেকটা অনুমানযোগ্য। নির্দিষ্ট রুট ধরে তারা গন্তব্যে যান। ছিনতাইকারীরা এ সুযোগ কাজে লাগায়।
তৃতীয়ত, ভোরে দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগই বন্ধ থাকে। ফলে সড়কে প্রত্যক্ষদর্শী কম থাকে।
এ ছাড়া মোটরসাইকেলে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সুযোগও ছিনতাইকারীদের জন্য বড় সুবিধা হয়ে উঠেছে।
যেসব এলাকায় ছিনতাইয়ের ঝুঁকি বেশি
রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঝুঁকি কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাইয়ের ঝুঁকিপূর্ণ স্পট রয়েছে।
এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, মগবাজার, মালিবাগ রেলগেট, কাকরাইল, মতিঝিল, গুলিস্তান, ফুলবাড়িয়া, কমলাপুর ও বাবুবাজার।
এ ছাড়া রাজারবাগ, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, ওয়ারী, গেন্ডারিয়া, জুরাইন রেলগেট, মিরপুর, কালশী, বাড্ডা, ভাটারা, বসিলা ও জাতীয় সংসদ ভবনের সামনের সড়কও পুলিশের নজরে রয়েছে।
হাতিরঝিল ও বিমানবন্দর-সংলগ্ন সড়কেও ছিনতাইয়ের ঝুঁকি রয়েছে।
তবে এসব এলাকার সবগুলোকে ভোরের ছিনতাইয়ের হটস্পট বলা যায় না। ভোরে যেসব এলাকায় পরিবহন থেকে যাত্রী নামেন, কর্মজীবীরা চলাচল করেন এবং সড়ক তুলনামূলক ফাঁকা থাকে, সেসব স্থান বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
এ কারণে ভোরের সময়ে ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, কমলাপুর, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, গুলিস্তান, মতিঝিল, ওয়ারী, মিরপুর, বাড্ডা ও ভাটারায় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
দুই বছরে ৭০৩ মামলা, গ্রেপ্তার ১,৮৩৭
ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রাজধানীতে ছিনতাই সংক্রান্ত ৫৩১টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় ১ হাজার ৪৩৫ জনকে।
২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১৭২টি মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪০২ জনকে।
অর্থাৎ ২০২৫ ও ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত মোট ৭০৩টি মামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ১ হাজার ৮৩৭ জন।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে তেজগাঁও বিভাগে। ২০২৫ সালে এ বিভাগে ১৪৬টি মামলায় ৫১০ জন গ্রেপ্তার হন। ২০২৬ সালে মামলা হয়েছে ৩৪টি। গ্রেপ্তার হয়েছেন ১৩৮ জন।
ওয়ারী বিভাগে ২০২৫ সালে ৯৩টি মামলায় ২১৭ জন এবং ২০২৬ সালে ৩৮টি মামলায় ৯৮ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন।
মতিঝিল বিভাগে ২০২৫ সালে ১০১টি মামলায় ১৪৪ জন এবং ২০২৬ সালে ২৫টি মামলায় ৩৬ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন।
মিরপুর বিভাগে ২০২৫ সালে ৫৫টি মামলায় ২১৯ জন এবং ২০২৬ সালে ১৬টি মামলায় ৪০ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন।
৮৯ চেকপোস্টে পুলিশের বিশেষ অভিযান
ভোরের ছিনতাই ঠেকাতে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। মধ্যরাত থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ৮৯টি চেকপোস্ট বসানো হয়েছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মোহাম্মদ ওসমান গনি জানান, প্রতিটি চেকপোস্টে একজন কর্মকর্তাসহ আটজন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন।
একই সময়ে প্রতিটি থানায় চার থেকে পাঁচটি মোবাইল পেট্রোল টিম কাজ করছে। প্রতিটি টিমে একজন কর্মকর্তাসহ সাতজন পুলিশ সদস্য রয়েছেন।
ডিএমপি সূত্র বলছে, বিশেষ এই ব্যবস্থায় চেকপোস্ট ও মোবাইল পেট্রোল টিমে প্রায় ২ হাজার ১১২ থেকে ২ হাজার ৪৬২ জন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন।
এর বাইরে নিয়মিত টহল, পিকেট ও ফুড পেট্রোলও চালু রয়েছে।
ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন বলেন, নগরীর নিরাপত্তায় পুলিশ দিন-রাত বিভিন্ন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়। চেকপোস্টের পাশাপাশি ফুড পেট্রোল, মোবাইল পার্টি ও পিকেট পার্টি দায়িত্ব পালন করে।
তিনি জানান, মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম নিয়মিত তদারকি করেন সংশ্লিষ্ট ডিসি, এডিসি ও এসিরা। অভিযোগ পাওয়া গেলে নিয়মিত মামলা নেওয়া হয়। জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়।
ভোরের ঢাকায় ছিনতাই ঠেকাতে পুলিশের এই বিশেষ তৎপরতা নগরবাসীর নিরাপত্তা বাড়াতে কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।




















