আ.লীগের মিছিল ঠেকাতে ব্যর্থ হলে দায় নিতে হবে ওসি-ডিসিকে
- আপডেট সময় : ১১:১০:০২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৫২৮ বার পড়া হয়েছে
রাজধানীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল ঠেকাতে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) কঠোর নির্দেশ দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। কোনো এলাকায় এমন মিছিল বা জমায়েত হলে সংশ্লিষ্ট ওসি ও উপ-পুলিশ কমিশনারকে (ডিসি) দায় নিতে হবে। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা বা অপারেশনাল ঘাটতি থাকলে জবাবদিহির আওতায় আনার কথাও জানিয়েছে ডিএমপি।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ডিএমপির মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভা বা ক্রাইম কনফারেন্সে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়। সভায় আগস্ট মাসের অপরাধ পরিস্থিতি পর্যালোচনার পাশাপাশি সামনের দিনগুলোতে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের করণীয় নিয়ে আলোচনা করা হয়।
আগাম তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ
সভায় বলা হয়, কোনো ঘটনা ঘটার পর অভিযান চালালেই দায়িত্ব শেষ হবে না। সম্ভাব্য মিছিল, জমায়েত ও অপতৎপরতার বিষয়ে আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। এরপর প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সঙ্গে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়কে ভিত্তি না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
ডিএমপির গুলশান বিভাগের উপকমিশনার আ ফ ম আনোয়ার হোসেন খান জানান, গুলশানের সাম্প্রতিক ঝটিকা মিছিলের ঘটনা সভায় গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে ওই ঘটনায় কোনো নির্দিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাকে এককভাবে দায়ী করা হয়নি।
তিনি বলেন, কোথায় তথ্যের ঘাটতি ছিল এবং কেন আগাম প্রস্তুতি আরও কার্যকর করা যায়নি, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গুলশানের মিছিলে তথ্য এসেছিল ৮ মিনিট আগে
সভায় জানানো হয়, গত শুক্রবার গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মিছিলের বিষয়ে পুলিশ মাত্র আট মিনিট আগে গোয়েন্দা তথ্য পেয়েছিল। তথ্য পাওয়ার পরই গুলশান থানা পুলিশ তৎপর হয়।
তবে এত অল্প সময়ে বড় জমায়েত ঠেকাতে পুলিশের প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। ডিএমপি বলেছে, ভবিষ্যতে শুধু গোয়েন্দা সংস্থার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। পুলিশের নিজস্ব তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
প্রবেশপথ ও চেকপোস্টে নজরদারি বাড়বে
রাজধানীর প্রবেশপথে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও রাতের চেকপোস্টে ব্লক চেক জোরদার করতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকার বাইরে থেকে কেউ এসে যাতে অপতৎপরতায় যুক্ত হতে না পারে, সে বিষয়েও নজরদারি বাড়াতে বলা হয়েছে। সন্দেহজনক ব্যক্তিদের বিষয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তাদের গতিবিধি সম্পর্কে আগাম তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ডিজিএফআই, এনএসআই, সিটিএসবি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেও বলা হয়েছে।
রাজনৈতিক পরিচয়ে গ্রেপ্তার নয়
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল ঠেকানোর নামে নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও সতর্ক করেছে ডিএমপি।
সভায় বলা হয়েছে, শুধু কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অতীতে সম্পৃক্ততা ছিল—এমন পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে গ্রেপ্তার করা যাবে না। মিছিলে সরাসরি অংশগ্রহণকারীদের ছবি, ভিডিও ও তথ্য-প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে শনাক্ত করতে হবে।
সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
থানায় ওসিদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে নির্দেশ
সভায় থানায় ওসিদের উপস্থিতি নিয়েও কঠোর বার্তা দেওয়া হয়। সম্প্রতি তেজগাঁও ও পল্টন থানায় পরিদর্শনের সময় সংশ্লিষ্ট ওসিদের না পাওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে। পরে দুই থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়।
ডিএমপি কমিশনারের নির্দেশনা অনুযায়ী, দায়িত্ব পালনের সময় ওসিদের থানায় অবস্থান করতে হবে। জরুরি প্রয়োজনে বাইরে যেতে হলে জিডিতে বিষয়টি উল্লেখ করতে হবে। পাশাপাশি দায়িত্ব পরবর্তী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছে বুঝিয়ে দিতে হবে।
ডিউটির সময় নির্ধারিত পোশাক পরার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
‘যে জায়গায় কাজ হবে না, সেখানে পরিবর্তন’
ক্রাইম কনফারেন্সে উপস্থিত এক কর্মকর্তা জানান, ডিএমপি কমিশনার স্পষ্ট করেছেন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কোনো কর্মকর্তা বা ইউনিট ব্যর্থ হলে পরিবর্তন আনা হবে।
দায়িত্ব পালনে গাফিলতি বা অপেশাদার আচরণ মেনে নেওয়া হবে না। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে কমিশনারের বার্তা ছিল—‘যে জায়গায় কাজ হবে না, সেই জায়গায় পরিবর্তন’।
ছিনতাই ও কিশোর গ্যাং দমনে অভিযান
সভায় ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধেও অভিযান জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এলাকাভিত্তিক দায়িত্ব ভাগ করে পুলিশ সদস্যদের ডিউটি করতে বলা হয়েছে।
অপরাধপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে নিয়মিত টহল বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কোনো এলাকায় যাতে নিরাপত্তার শূন্যতা তৈরি না হয়, সেদিকে নজর দিতে বলা হয়েছে।
গুলশানের সাম্প্রতিক ঘটনায় ডিবি ও থানা পুলিশের সমন্বিত অভিযানে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্যও সভায় জানানো হয়। তাদের মধ্যে ঢাকার বাইরে থেকে আসা কয়েকজনও রয়েছেন।
এ ছাড়া আবাসিক হোটেল ও অন্যান্য হোটেলে অবস্থানকারী অতিথিদের তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ ও সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে ডিএমপি। বাসাবাড়িতে নতুন ভাড়াটিয়ার পাশাপাশি পুরোনো ভাড়াটিয়াদের তথ্যও হালনাগাদ করতে বলা হয়েছে।
কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও নাগরিকদের সঙ্গে ওসিদের নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেও বলা হয়েছে।




















