অনলাইনে জুয়ার টাকা ক্রিপ্টোতে বদলে বিদেশে পাচার
- আপডেট সময় : ০৫:১৯:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫২৪ বার পড়া হয়েছে
অনলাইন বেটিং ও জুয়ার মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) ও ব্যাংক হিসাবে জমা করে পরে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তরের মাধ্যমে বিদেশে পাচারের অভিযোগে সংঘবদ্ধ চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) পাবনার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। সিআইডি জানিয়েছে, চক্রটি বিভিন্ন নামে ওয়েবসাইট খুলে অনলাইন বেটিং ও জুয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করত। পরে জুয়ার অর্থ সংগ্রহ করে তা বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে একত্র করা এবং ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করে বিদেশে পাচার করা হতো বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
পাবনায় তিনজন গ্রেপ্তার
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন পাবনা সদর উপজেলার ঈদগাহ রোড বাইলেন এলাকার মো. মনোয়ার হোসেন (৪১), রামচন্দ্রপুরের মো. মারুফ হোসেন হলি (২৭) এবং সাঁথিয়া উপজেলার বনগ্রাম এলাকার মো. ইলিয়াস হোসেন রাজু (২৬)।
সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে আতাইকুলা থানার আতাইকুলা ইউনিয়নের বনগ্রাম বাজার এলাকা থেকে ইলিয়াস হোসেন রাজুকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে সাঁথিয়া থানার কাশিনাথপুর বাজার এলাকা থেকে মনোয়ার হোসেন ও মারুফ হোসেন হলিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ও সিমকার্ড জব্দ করা হয়েছে।
যেভাবে চলত অনলাইন বেটিং
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ জানান, নিয়মিত সাইবার মনিটরিংয়ের সময় দেশে ও বিদেশে অবস্থানকারী একটি সংঘবদ্ধ চক্রের অনলাইন বেটিং ও জুয়া পরিচালনার তথ্য পাওয়া যায়।
চক্রটি বিভিন্ন সময়ে নতুন নতুন নামে ওয়েবসাইট খুলে বেটিং ও জুয়ার কার্যক্রম চালাত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এসব ওয়েবসাইটের বিজ্ঞাপনও প্রচার করা হতো।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলাকে কেন্দ্র করে টাকার বিনিময়ে বেটিংয়ের আয়োজন করা হতো। এসব সাইটে অংশ নিতে ব্যবহারকারীদের প্রথমে নির্দিষ্ট মাধ্যমে টাকা জমা বা ‘টপ-আপ’ করতে হতো।
এমএফএস ও ব্যাংক হিসাব সংগ্রহ
তদন্তে সিআইডি জানতে পেরেছে, বেটিং সাইটে টাকা জমা ও উত্তোলনের জন্য ব্যবহৃত এমএফএস এজেন্ট নম্বর এবং ব্যাংক হিসাব নিয়মিত পরিবর্তন করা হতো।
এ জন্য চক্রটি দেশের বিভিন্ন এলাকায় এজেন্ট নিয়োগ করত। এসব এজেন্টের মাধ্যমে একাধিক এমএফএস এজেন্ট নম্বর ও ব্যাংক হিসাব সংগ্রহ করা হতো।
পরে টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমে এসব নম্বর ও ব্যাংক হিসাবের তথ্য বেটিং সাইট পরিচালনাকারীদের কাছে পাঠানো হতো। এরপর ওই হিসাবগুলো অনলাইন জুয়ার অর্থ লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
টেলিগ্রামে তথ্য, ক্রিপ্টোতে রূপান্তর
সিআইডির তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্ন স্থান থেকে অবৈধ ই-ট্রানজেকশনের মাধ্যমে আসা অর্থ এসব এজেন্টের মাধ্যমে একত্র করা হতো। এজেন্টরা কমিশন রেখে বাকি টাকা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করত।
পরবর্তী সময়ে এসব অর্থ বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করা হতো। এরপর ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ দেশের বাইরে পাচার করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পেয়েছে সিআইডি।
সিআইডির ধারণা, এভাবে অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে থাকতে পারে। তবে মোট কত টাকা পাচার হয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়ায় কারা জড়িত, তা এখনো তদন্তাধীন।
জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ছুফি উল্লাহ জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা অনলাইন বেটিং চক্রের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা এবং জুয়ার টাকা সংগ্রহের বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন।
তবে তারা কী পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেছেন, অর্থপাচারের পুরো প্রক্রিয়াটি কীভাবে পরিচালিত হয়েছে এবং দেশের বাইরে অর্থ পাঠানোর সঙ্গে কারা জড়িত—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।
এ ছাড়া অনলাইন বেটিংয়ের সঙ্গে জড়িত দেশি-বিদেশি ব্যক্তি ও চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। একই সঙ্গে অবৈধ ই-ট্রানজেকশন ও অর্থপাচারের প্রকৃত পরিমাণ ও পদ্ধতি উদঘাটন এবং অন্য সহযোগীদের গ্রেপ্তারে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
পল্টন থানায় মামলা
এ ঘটনায় সিআইডি বাদী হয়ে গত ১৯ মে পল্টন থানায় মামলা করে। মামলায় সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ২০(২), ২১(২), ২৪(২) ও ২৭(২) ধারা উল্লেখ করা হয়েছে।
সিআইডি জানিয়েছে, অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের অবৈধ লেনদেন, অর্থপাচার এবং এর সঙ্গে জড়িত দেশি-বিদেশি চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট ২০২৫ সালের ২৮ মে জারি করা নির্দেশনায় অনলাইন জুয়ার কার্যক্রম বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছিল। এরপরও সংঘবদ্ধ চক্রটি অবৈধ অনলাইন বেটিং ও আর্থিক লেনদেন চালিয়ে আসছিল বলে তদন্তে তথ্য পেয়েছে সিআইডি।
অনলাইন জুয়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান
সিআইডি সাধারণ মানুষকে অনলাইন জুয়া ও বেটিং থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে এ ধরনের কার্যক্রমে কোনো ব্যক্তি বা চক্রের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন না করার অনুরোধ করা হয়েছে।
কোনো ব্যক্তি অনলাইন জুয়া, অবৈধ ই-ট্রানজেকশন বা অর্থপাচার সম্পর্কে তথ্য জানলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর আহ্বান জানিয়েছে সিআইডি।























