বন্ধ হচ্ছে পদ্মা ব্যাংক, অবসায়নের উদ্যোগ নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক
- আপডেট সময় : ১২:৫০:০৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৪২ বার পড়া হয়েছে
দীর্ঘদিনের তারল্য সংকট, বিপুল খেলাপি ঋণ, পুঞ্জীভূত লোকসান ও মূলধন ঘাটতির কারণে পদ্মা ব্যাংক পিএলসি বন্ধ বা অবসায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ব্যাংকটির সংকট কাটাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হলেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি না হওয়ায় এবার ব্যাংকিং রেজ্যুলেশন প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানটি গুটিয়ে ফেলার পথে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, পদ্মা ব্যাংকের অবসায়নের অনুমোদনের বিষয়টি চলতি অক্টোবর মাসেই বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় উপস্থাপন করা হতে পারে। পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন পাওয়া গেলে ব্যাংকটি বন্ধের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকে সমাধান হয়নি
গত বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) পদ্মা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠকে ব্যাংকটির তারল্য পরিস্থিতি, খেলাপি ঋণ, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
তবে বৈঠকে ব্যাংকটির সংকট কাটিয়ে ওঠার মতো কোনো কার্যকর ও সুনির্দিষ্ট সমাধান পাওয়া যায়নি। বরং বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ব্যাংকটিকে স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা কঠিন বলে মনে করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এর আগে পদ্মা ব্যাংকের পরিস্থিতির উন্নতির জন্য পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। পাশাপাশি ব্যাংকটির কার্যক্রম সচল রাখতে বিভিন্ন ধরনের নীতিগত সহায়তাও দেওয়া হয়। কিন্তু এসব উদ্যোগের পরও তারল্য সংকট কাটেনি।
৫ হাজার কোটি টাকা সহায়তা চেয়েও সাড়া পায়নি
সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে পদ্মা ব্যাংকের পক্ষ থেকে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা সহায়তা চাওয়া হয়েছিল। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক সেই সহায়তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, নতুন করে তারল্য সহায়তা দিয়ে ব্যাংকটির দীর্ঘমেয়াদি সংকট সমাধান করা সম্ভব নয়। কারণ ব্যাংকটির বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ, সঞ্চিত লোকসান এবং মূলধন ঘাটতি রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকটিকে আগের অবস্থায় রেখে দেওয়ার পরিবর্তে অবসায়নের উদ্যোগ নেওয়াকে বেশি বাস্তবসম্মত মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে পদ্মা ব্যাংককে অন্য কোনো ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার বিষয়েও অনাগ্রহ রয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর মধ্যে।
খেলাপি ঋণ ৫ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত পদ্মা ব্যাংকের মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা।
এর মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকা খেলাপি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হয়েছে, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ৯০ শতাংশ। এর আগের বছরের জুনে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫ হাজার ১৩১ কোটি টাকা। তখন মোট ঋণের প্রায় ৯১ দশমিক ৬৬ শতাংশ ছিল খেলাপি।
ঋণ পুনঃতফসিল ও এক্সিট কর্মসূচির আওতায় কিছু অর্থ আদায় হওয়ায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ সামান্য কমেছে। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতিতে ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি এখনও অত্যন্ত দুর্বল।
সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপুল অর্থ আটকে আছে
পদ্মা ব্যাংকে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংস্থার বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে আছে। ব্যাংকটির হিসাবে, প্রায় ৪৩টি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা পদ্মা ব্যাংকে জমা রয়েছে।
এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি), জীবন বীমা করপোরেশন, সাধারণ বীমা করপোরেশন, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, তিতাস গ্যাস, বিটিআরসি, মোংলা বন্দর ও চট্টগ্রাম বন্দরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড ও সংশ্লিষ্ট ট্রাস্টের প্রায় ৭৬০ কোটি টাকা পদ্মা ব্যাংকে রয়েছে। এসব অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়টিও জটিল হয়ে উঠেছে।
৬০ শাখা ও ১ হাজার ৬০০ কর্মী
পদ্মা ব্যাংকের বর্তমানে ৬০টি শাখা, ১৪টি উপশাখা এবং ৬টি এজেন্ট আউটলেট রয়েছে। ব্যাংকটিতে কর্মরত জনবলের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৬০০।
ব্যাংকটি বন্ধ বা অবসায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলে আমানতকারী, কর্মী এবং ব্যাংকটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর এর প্রভাব পড়বে। ফলে অবসায়ন প্রক্রিয়ায় আমানতকারীদের অর্থ ফেরত, সম্পদ ও দায় নির্ধারণ এবং কর্মীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে পৃথক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হবে।
ফারমার্স ব্যাংক থেকে পদ্মা ব্যাংক
২০১৩ সালে ‘দ্য ফারমার্স ব্যাংক’ নামে যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই অনিয়ম, দুর্নীতি ও আর্থিক সংকটের কারণে ব্যাংকটির কার্যক্রম বড় ধরনের সমস্যায় পড়ে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, নাম পরিবর্তন এবং মূলধন জোগানসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়। পরে ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি ফারমার্স ব্যাংকের নাম পরিবর্তন করে ‘পদ্মা ব্যাংক’ করা হয়।
তবে নাম পরিবর্তন ও পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তনের পরও ব্যাংকটির আর্থিক সংকট কাটেনি। বরং সময়ের সঙ্গে খেলাপি ঋণ ও লোকসান আরও বেড়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ৭১৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ
২০১৯ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক এবং রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থা আইসিবি মিলে পদ্মা ব্যাংকে নতুন করে ৭১৫ কোটি টাকা মূলধন জোগান দেয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সেই বিনিয়োগের অর্থও এখনো ফেরত পাওয়া যায়নি। ফলে পদ্মা ব্যাংক অবসায়ন করা হলে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ ও আমানতের অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়টি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
পদ্মা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান জানিয়েছেন, ব্যাংকটির আমানত ও মূলধন প্রায় শেষ হয়ে গেছে। সঞ্চিত লোকসান ব্যাংকের সম্পদ ও দায়ের পরিমাণকেও ছাড়িয়ে গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তার মতে, এখন পদ্মা ব্যাংকের কর্মকর্তাদের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে ঋণ আদায়। ব্যাংকটির ব্যয় কমানোর জন্য আগেই নির্দেশ দেওয়া হলেও তাতে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি।
একীভূত করার পথও কঠিন
পদ্মা ব্যাংককে অন্য কোনো ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার সম্ভাবনাও জটিল হয়ে উঠেছে। কারণ, বিপুল খেলাপি ঋণ ও পুঞ্জীভূত লোকসানের দায় নিতে কোনো ব্যাংক আগ্রহ দেখাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এর আগে এক্সিম ব্যাংককে সোনালী ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেটি সফল হয়নি। ফলে পদ্মা ব্যাংকের ক্ষেত্রেও একই ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ব্যাংকটির প্রকৃত সম্পদ ও দায় নিরূপণ, ঋণপোর্টফোলিও যাচাই এবং আদায়যোগ্য সম্পদ চিহ্নিত করা এখন গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বড় খেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের উদ্যোগও নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন করে তারল্য সহায়তা দিয়ে পদ্মা ব্যাংকের মতো দুর্বল ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি সংকট সমাধান করা সম্ভব নয়। প্রথমে ব্যাংকটির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা নিরূপণ করতে হবে।
এর পাশাপাশি ঋণপোর্টফোলিওর গুণগত মান যাচাই, বড় খেলাপিদের সম্পদ শনাক্তকরণ, দ্রুত আদায়যোগ্য অর্থ নির্ধারণ এবং মূলধন ঘাটতির প্রকৃত চিত্র বের করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু নাম পরিবর্তন বা পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন করলেই একটি দুর্বল ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা যায় না। খেলাপি ঋণ আদায়, মূলধন পুনর্গঠন এবং আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংকের পক্ষে স্বেচ্ছায় পদ্মা ব্যাংকের দায়িত্ব নেওয়া কঠিন। মন্দ ঋণ, পুঞ্জীভূত লোকসান ও মূলধন ঘাটতির কারণে ব্যাংকটিকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ঘুরিয়ে দাঁড় করানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে পদ্মা ব্যাংককে টিকিয়ে রাখা বা অন্য কোনো ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করা অত্যন্ত কঠিন। সবকিছু বিবেচনায় ব্যাংকটি গুটিয়ে ফেলা বা লিকুইডেশনের পথই সামনে রয়েছে।




















