৯৫ কারখানা বন্ধে বেকার ৬২ হাজার শ্রমিক
- আপডেট সময় : ০৫:০০:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬
- / ১৭৫৬ বার পড়া হয়েছে
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরার মতো কোনো সমন্বিত দলিল ছিল না। ফলে সরকারের বিভিন্ন বক্তব্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যান মিলিয়ে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যাচাই করা কঠিন হচ্ছে বলে জানিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
একই সঙ্গে সরকারের নেওয়া সংস্কার উদ্যোগগুলোর মধ্যেও সমন্বিত পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার নেওয়া সংস্কার উদ্যোগগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মত দিয়েছে সিপিডি।
সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীতে এক অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় এসব কথা বলেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, রাজস্ব আদায়, শিল্প উৎপাদন, বেসরকারি খাতে ঋণ, বিদেশি বিনিয়োগ এবং সরকারের সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে পর্যালোচনায় বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরে প্রতিষ্ঠানটি।
অর্থনীতির তথ্য নিয়ে সিপিডির প্রশ্ন
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের একটি পরিষ্কার ও সমন্বিত চিত্র থাকা প্রয়োজন ছিল। অর্থনীতির সেই সময়কার অবস্থার একটি নির্ভরযোগ্য ভিত্তি তৈরি করা গেলে পরবর্তী সময়ে অর্থনীতির অগ্রগতি বা অবনতির সঙ্গে তুলনা করা সহজ হতো।
কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতির সার্বিক অবস্থা তুলে ধরার মতো কোনো সমন্বিত দলিল প্রস্তুত করা হয়নি। ফলে বর্তমানে সরকারের বিভিন্ন বক্তব্য ও প্রকাশিত পরিসংখ্যানের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি না, তা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সিপিডির মতে, অর্থনীতির মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু সূচক দেখলে পুরো পরিস্থিতি বোঝা সম্ভব নয়। রাজস্ব, বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান, ঋণপ্রবাহ ও বৈদেশিক বিনিয়োগসহ বিভিন্ন সূচককে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্র তৈরি করা প্রয়োজন।
সংস্কার উদ্যোগে সমন্বয়ের ঘাটতি
সরকারের সংস্কার কর্মসূচিতেও সমন্বিত পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে বলে জানিয়েছে সিপিডি। বিভিন্ন খাতে একাধিক সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক, অগ্রাধিকার এবং বাস্তবায়নের সময়সীমা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, সরকারের বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করছে সিপিডি। এ জন্য প্রতিষ্ঠানটি সরকারের মোট ৩৬২টি সংস্কার উদ্যোগ চিহ্নিত করেছে।
এসব উদ্যোগের অগ্রগতি পর্যালোচনার জন্য ‘রিফর্ম ট্র্যাকার’ ব্যবহার করছে সিপিডি। এর মাধ্যমে কোন সংস্কার উদ্যোগ কতটা এগিয়েছে, কোথায় বাস্তবায়নে সমস্যা রয়েছে এবং কোন ক্ষেত্রে আরও পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন—এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
সিপিডির মতে, শুধু সংস্কারের ঘোষণা দিলেই হবে না। এসব উদ্যোগের বাস্তবায়ন, ফলাফল এবং অর্থনীতিতে এর প্রভাব নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে।
৯৫ কারখানা বন্ধ, চাকরি হারিয়েছেন ৬১ হাজার ৮৮১ শ্রমিক
সিপিডির অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় দেশের শিল্প খাতের দুর্বল চিত্রও উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
শিল্পাঞ্চলগুলো হলো গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী। এসব কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরাসরি চাকরি হারিয়েছেন ৬১ হাজার ৮৮১ শ্রমিক।
শিল্প খাতে কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টিকে অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছে সিপিডি। কারণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার সঙ্গে শুধু উৎপাদন কমে যাওয়ার বিষয়ই জড়িত নয়, এর প্রভাব কর্মসংস্থান, শ্রমিকদের আয় এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যবসার ওপরও পড়ে।
সিপিডির হিসাবে, শিল্প উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে নেমে শূন্যে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধিও ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে শূন্যে নেমেছে।
প্রতিষ্ঠানটির মতে, শিল্প উৎপাদনে এমন স্থবিরতা অর্থনীতিতে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পথেও বাধা তৈরি করতে পারে।
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমেছে
শিল্প খাতের পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও দুর্বলতার চিত্র তুলে ধরেছে সিপিডি। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার ফলে নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কার্যকর ঋণপ্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
সিপিডি বলছে, অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের ভূমিকা বাড়াতে হলে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার পাশাপাশি ব্যাংকিং খাত থেকে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।
কমেছে নিট বিদেশি বিনিয়োগ
বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিস্থিতি নেই বলে জানিয়েছে সিপিডি। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, নিট বিদেশি বিনিয়োগ আগে ৬৬২ মিলিয়ন ডলার থাকলেও বর্তমানে তা কমে ৫৯৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
সিপিডির মতে, বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার বিষয়টি অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিদেশি বিনিয়োগের সঙ্গে নতুন শিল্প স্থাপন, কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্থানান্তরের মতো বিষয় জড়িত।
দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গেলে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।
রাজস্ব ঘাটতি হতে পারে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা
রাজস্ব আদায় নিয়েও বড় ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছে সিপিডি। চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা।
এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ৪২ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছে সিপিডি। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এত বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
সিপিডির হিসাবে, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি হতে পারে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বড় ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে।
তবে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সরকারের কিছু উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে সিপিডি। এর মধ্যে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো এবং ই-রিটার্নের পরিধি সম্প্রসারণের উদ্যোগ রয়েছে।
এ ছাড়া বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগকেও ইতিবাচক বলেছে প্রতিষ্ঠানটি। এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে করদাতার সংখ্যা বাড়ানো, কর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা তৈরি এবং রাজস্ব আদায় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার জন্য ‘কোর বাজেট’
বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে বিশেষ ‘কোর বাজেট’ প্রণয়নের সুপারিশ করেছে সিপিডি।
প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত সময়ের জন্য এই কোর বাজেট কার্যকর করা যেতে পারে। এতে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং সীমিত সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে সিপিডি।
সিপিডির মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বাস্তবতা ও অগ্রাধিকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে সরকারের আয়-ব্যয়, বিনিয়োগ ও সংস্কার কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা প্রয়োজন।
জ্বালানি, ব্যাংকিং ও রাজস্ব খাতে সমন্বিত সংস্কারের সুপারিশ
অর্থনীতির বিভিন্ন দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে জ্বালানি, ব্যাংকিং ও রাজস্ব খাতকে আলাদাভাবে না দেখে সমন্বিতভাবে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করেছে সিপিডি।
প্রতিষ্ঠানটির মতে, এসব খাত পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা হলে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয়। আবার ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা বেসরকারি বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে। একইভাবে রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা সরকারের উন্নয়ন ও জনসেবা ব্যয়ের সক্ষমতাকে সীমিত করতে পারে।
তাই খাতভিত্তিক বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে সমন্বিত সংস্কার প্যাকেজ গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছে সিপিডি।
সংস্কারের বাস্তব ফলাফল মূল্যায়নের আহ্বান
সিপিডি বলছে, সংস্কার কার্যক্রমের ক্ষেত্রে শুধু কতগুলো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা দিয়ে অগ্রগতি বিচার করা যাবে না। এসব উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়েছে এবং অর্থনীতিতে এর কী ধরনের প্রভাব পড়েছে, সেটিও পরিমাপ করতে হবে।
এ জন্য নিয়মিতভাবে সংস্কার কর্মসূচির অগ্রগতি পর্যালোচনা, বাস্তবায়নে বাধা চিহ্নিত এবং প্রয়োজন অনুযায়ী উদ্যোগ সংশোধনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সিপিডির মতে, অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের সামনে একদিকে রাজস্ব বাড়ানোর চাপ রয়েছে, অন্যদিকে শিল্প ও বেসরকারি বিনিয়োগে গতি ফেরানোর প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান ধরে রাখা এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিবেশও তৈরি করতে হবে।
সব মিলিয়ে অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা নিরূপণে নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত তথ্যভান্ডার তৈরি, সংস্কার উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয় এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ওপর জোর দিয়েছে সিপিডি। প্রতিষ্ঠানটির মতে, এসব পদক্ষেপ নেওয়া গেলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে এবং সংস্কার উদ্যোগের বাস্তব ফলাফলও স্পষ্টভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।


























