০৫:৪৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

দেশে প্রথম গামা ইরেডিয়েশন সেন্টার উদ্বোধন

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় : ০৩:০১:৩৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
  • / ১৫৫৯ বার পড়া হয়েছে
এস. এ টিভি সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

দেশে প্রথমবারের মতো চালু হলো গামা ইরেডিয়েশন সেন্টার। আধুনিক এই প্রযুক্তির মাধ্যমে খাদ্যদ্রব্যের ক্ষতিকর অণুজীব ও জীবাণু ধ্বংস, কৃষিপণ্যের পচন রোধ, সংরক্ষণকাল বৃদ্ধি এবং পোকামাকড় দমন করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ফলমূল ও শাকসবজির দ্রুত পেকে যাওয়ার প্রক্রিয়া বিলম্বিত করা যাবে। ফলে কৃষিপণ্যের অপচয় কমার পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কৃষিপণ্য রপ্তানির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) গাজীপুরের ভবানীপুরে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্রে স্থাপিত দেশের প্রথম গামা ইরেডিয়েশন সেন্টারের উদ্বোধন করা হয়। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মো. আমিন উর রশিদ আনুষ্ঠানিকভাবে সেন্টারটির উদ্বোধন করেন। চীনের সহযোগিতায় আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এই কেন্দ্রটি স্থাপন করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কৃষি ও খাদ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। বিশেষ করে উৎপাদনের পর সংগ্রহ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের বিভিন্ন পর্যায়ে কৃষিপণ্যের যে অপচয় হয়, তা কমাতে এই প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

কীভাবে কাজ করবে গামা ইরেডিয়েশন প্রযুক্তি

গামা ইরেডিয়েশন হচ্ছে নিয়ন্ত্রিত মাত্রার গামা রশ্মি ব্যবহার করে খাদ্যদ্রব্য ও অন্যান্য পণ্যের ক্ষতিকর অণুজীব ধ্বংস করার একটি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে খাদ্যে থাকা ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, পোকামাকড় এবং বিভিন্ন ক্ষতিকর জীবাণু নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

প্রচলিত পদ্ধতিতে খাদ্য সংরক্ষণের জন্য অনেক ক্ষেত্রে রাসায়নিক উপাদান, নিম্ন তাপমাত্রা কিংবা বিশেষ ধরনের প্যাকেজিংয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়। তবে গামা ইরেডিয়েশন প্রযুক্তি এসব পদ্ধতির পাশাপাশি খাদ্য সংরক্ষণের একটি আধুনিক বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব।

এই প্রযুক্তিতে নির্দিষ্ট মাত্রার গামা রশ্মি প্রয়োগের ফলে খাদ্যের ক্ষতিকর অণুজীবের বংশবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। এতে খাদ্যের নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং সংরক্ষণকাল বাড়ানো সহজ হয়। তবে পণ্যের ধরন অনুযায়ী বিকিরণের মাত্রা নির্ধারণ করতে হয়।

পচন রোধ ও সংরক্ষণকাল বাড়বে কৃষিপণ্যের

বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ ফলমূল, শাকসবজি, মসলা ও অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত সংরক্ষণব্যবস্থা, হিমাগার ও আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবে এসব পণ্যের একটি অংশ নষ্ট হয়ে যায়।

বিশেষ করে উৎপাদনের মৌসুমে বাজারে সরবরাহ বেড়ে গেলে কৃষকেরা অনেক সময় কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন। আবার সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে না পারায় অনেক কৃষিপণ্য বাজারজাত করার আগেই পচে যায়।

এ অবস্থায় গামা ইরেডিয়েশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষিপণ্যের পচন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। এতে পণ্য দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা যাবে। পাশাপাশি কৃষকেরা উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করার জন্য তুলনামূলক বেশি সময় পাবেন।

বিশেষ করে আলু, পেঁয়াজ, রসুন ও অন্যান্য অঙ্কুরোদগমপ্রবণ ফসলের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। নির্দিষ্ট মাত্রায় গামা রশ্মি প্রয়োগ করে এসব পণ্যের অনাকাঙ্ক্ষিত অঙ্কুরোদগম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

ফলমূল ও শাকসবজি দ্রুত পাকা ঠেকাতে সহায়ক

ফলমূল ও শাকসবজি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হলো দ্রুত পেকে যাওয়া এবং পচন। বিশেষ করে আম, কলা, পেঁপে, পেয়ারা ও অন্যান্য পচনশীল ফল সংগ্রহের পর দ্রুত পরিপক্ব হয়ে যায়।

ফলে দূরবর্তী বাজারে পরিবহন কিংবা বিদেশে রপ্তানির সময় পণ্যের গুণগত মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

গামা ইরেডিয়েশন প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু ফল ও সবজির পরিপক্বতা এবং পচন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। এতে পণ্য পরিবহন ও বাজারজাতকরণের জন্য বেশি সময় পাওয়া যাবে।

তবে সব ধরনের ফল ও সবজিতে একই মাত্রায় এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করা যায় না। পণ্যের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী উপযুক্ত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

কৃষিপণ্য রপ্তানিতে তৈরি হবে নতুন সুযোগ

বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা রয়েছে। তবে রপ্তানির ক্ষেত্রে পণ্যের গুণগত মান, খাদ্যনিরাপত্তা, পোকামাকড়মুক্ত অবস্থা এবং সংরক্ষণকাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করতে হয়। উৎপাদনের পর পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবহনের সময় মান ধরে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ।

গামা ইরেডিয়েশন সেন্টারের মাধ্যমে কৃষিপণ্যে ক্ষতিকর অণুজীব ও পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হবে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের নির্ধারিত মান অনুযায়ী কৃষিপণ্য প্রস্তুত করা সহজ হতে পারে।

এতে আম, আলু, পেঁয়াজ, মসলা, শাকসবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি কৃষক, কৃষি উদ্যোক্তা, প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান এবং রপ্তানিকারকেরাও উপকৃত হওয়ার সুযোগ পাবেন।

চিকিৎসাসামগ্রী জীবাণুমুক্ত করতেও ব্যবহার হবে

গামা ইরেডিয়েশন প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু কৃষি ও খাদ্য সংরক্ষণে সীমাবদ্ধ নয়। চিকিৎসা খাতেও এর গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগ রয়েছে।

এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন চিকিৎসাসামগ্রী ও চিকিৎসা সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত করা সম্ভব। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম নিরাপদ করার ক্ষেত্রে এটি কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হয়।

বিশেষ করে যেসব চিকিৎসাসামগ্রী জীবাণুমুক্ত অবস্থায় ব্যবহার করা জরুরি, সেগুলোর ক্ষেত্রে গামা রশ্মি প্রয়োগ করা যেতে পারে। শিল্প পর্যায়ে চিকিৎসাসামগ্রী জীবাণুমুক্ত করার ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে।

ফলে দেশের প্রথম গামা ইরেডিয়েশন সেন্টার কৃষি ও খাদ্য খাতের পাশাপাশি চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতেও অবদান রাখার সুযোগ তৈরি করবে।

গামা রশ্মিতে খাদ্য তেজস্ক্রিয় হবে কি?

গামা ইরেডিয়েশন প্রযুক্তি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রশ্ন থাকতে পারে—এই প্রক্রিয়ায় খাদ্য তেজস্ক্রিয় হয়ে যায় কি না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় গামা রশ্মি প্রয়োগ করে খাদ্য প্রক্রিয়াজাত করলে খাবার তেজস্ক্রিয় হয়ে যায় না। কারণ এই প্রক্রিয়ায় খাদ্যের মধ্যে তেজস্ক্রিয় পদার্থ যুক্ত করা হয় না। বরং নির্দিষ্ট শক্তির বিকিরণ ব্যবহার করে ক্ষতিকর অণুজীব ও পোকামাকড় ধ্বংস করা হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খাদ্যনিরাপত্তা ও সংরক্ষণের জন্য এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে খাদ্যের ধরন, পুষ্টিগুণ ও কাঙ্ক্ষিত সংরক্ষণকাল বিবেচনায় রেখে বিকিরণের মাত্রা নির্ধারণ করতে হয়।

কৃষি গবেষণা ও খাদ্যনিরাপত্তায় নতুন অধ্যায়

বাংলাদেশের কৃষি খাত বর্তমানে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি খাদ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানির সক্ষমতা বাড়ানোর চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। শুধু বেশি ফসল উৎপাদন করলেই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। উৎপাদিত খাদ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এ ক্ষেত্রে গামা ইরেডিয়েশন প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কৃষিপণ্যের অপচয় কমানো গেলে একই উৎপাদন থেকে বেশি পরিমাণ খাদ্য ভোক্তার কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এতে কৃষকের আর্থিক ক্ষতি কমার পাশাপাশি বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতেও সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।

চীনের সহযোগিতায় গাজীপুরের ভবানীপুরে দেশের প্রথম গামা ইরেডিয়েশন সেন্টার চালুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে কৃষি ও খাদ্য সংরক্ষণ প্রযুক্তির নতুন একটি ক্ষেত্র উন্মোচিত হলো। এখন সেন্টারটির কার্যক্রম কতটা বিস্তৃত করা যায় এবং কৃষক, উদ্যোক্তা ও রপ্তানিকারকেরা কত সহজে এই সুবিধা পান, তার ওপর এর সুফল অনেকটাই নির্ভর করবে।

সঠিক ব্যবস্থাপনা, গবেষণা এবং প্রযুক্তির বাণিজ্যিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে দেশের কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, চিকিৎসা ও রপ্তানি খাতে এই কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

এস. এ টিভি সমন্ধে

SATV (South Asian Television) is a privately owned ‘infotainment’ television channel in Bangladesh. It is the first ever station in Bangladesh using both HD and 3G Technology. The channel is owned by SA Group, one of the largest transportation and real estate groups of the country. SATV is the first channel to bring ‘Idol’ franchise in Bangladesh through Bangladeshi Idol.

যোগাযোগ

বাড়ী ৪৭, রাস্তা ১১৬,
গুলশান-১, ঢাকা-১২১২,
বাংলাদেশ।
ফোন: +৮৮ ০২ ৯৮৯৪৫০০
ফ্যাক্স: +৮৮ ০২ ৯৮৯৫২৩৪
ই-মেইল: info@satv.tv
ওয়েবসাইট: www.satv.tv

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৩। বাড়ী ৪৭, রাস্তা ১১৬, গুলশান-১, ঢাকা-১২১২, বাংলাদেশ। ফোন: +৮৮ ০২ ৯৮৯৪৫০০, ফ্যাক্স: +৮৮ ০২ ৯৮৯৫২৩৪

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

দেশে প্রথম গামা ইরেডিয়েশন সেন্টার উদ্বোধন

আপডেট সময় : ০৩:০১:৩৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

দেশে প্রথমবারের মতো চালু হলো গামা ইরেডিয়েশন সেন্টার। আধুনিক এই প্রযুক্তির মাধ্যমে খাদ্যদ্রব্যের ক্ষতিকর অণুজীব ও জীবাণু ধ্বংস, কৃষিপণ্যের পচন রোধ, সংরক্ষণকাল বৃদ্ধি এবং পোকামাকড় দমন করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ফলমূল ও শাকসবজির দ্রুত পেকে যাওয়ার প্রক্রিয়া বিলম্বিত করা যাবে। ফলে কৃষিপণ্যের অপচয় কমার পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কৃষিপণ্য রপ্তানির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) গাজীপুরের ভবানীপুরে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্রে স্থাপিত দেশের প্রথম গামা ইরেডিয়েশন সেন্টারের উদ্বোধন করা হয়। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মো. আমিন উর রশিদ আনুষ্ঠানিকভাবে সেন্টারটির উদ্বোধন করেন। চীনের সহযোগিতায় আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এই কেন্দ্রটি স্থাপন করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কৃষি ও খাদ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। বিশেষ করে উৎপাদনের পর সংগ্রহ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের বিভিন্ন পর্যায়ে কৃষিপণ্যের যে অপচয় হয়, তা কমাতে এই প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

কীভাবে কাজ করবে গামা ইরেডিয়েশন প্রযুক্তি

গামা ইরেডিয়েশন হচ্ছে নিয়ন্ত্রিত মাত্রার গামা রশ্মি ব্যবহার করে খাদ্যদ্রব্য ও অন্যান্য পণ্যের ক্ষতিকর অণুজীব ধ্বংস করার একটি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে খাদ্যে থাকা ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, পোকামাকড় এবং বিভিন্ন ক্ষতিকর জীবাণু নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

প্রচলিত পদ্ধতিতে খাদ্য সংরক্ষণের জন্য অনেক ক্ষেত্রে রাসায়নিক উপাদান, নিম্ন তাপমাত্রা কিংবা বিশেষ ধরনের প্যাকেজিংয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়। তবে গামা ইরেডিয়েশন প্রযুক্তি এসব পদ্ধতির পাশাপাশি খাদ্য সংরক্ষণের একটি আধুনিক বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব।

এই প্রযুক্তিতে নির্দিষ্ট মাত্রার গামা রশ্মি প্রয়োগের ফলে খাদ্যের ক্ষতিকর অণুজীবের বংশবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। এতে খাদ্যের নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং সংরক্ষণকাল বাড়ানো সহজ হয়। তবে পণ্যের ধরন অনুযায়ী বিকিরণের মাত্রা নির্ধারণ করতে হয়।

পচন রোধ ও সংরক্ষণকাল বাড়বে কৃষিপণ্যের

বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ ফলমূল, শাকসবজি, মসলা ও অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত সংরক্ষণব্যবস্থা, হিমাগার ও আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবে এসব পণ্যের একটি অংশ নষ্ট হয়ে যায়।

বিশেষ করে উৎপাদনের মৌসুমে বাজারে সরবরাহ বেড়ে গেলে কৃষকেরা অনেক সময় কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন। আবার সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে না পারায় অনেক কৃষিপণ্য বাজারজাত করার আগেই পচে যায়।

এ অবস্থায় গামা ইরেডিয়েশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষিপণ্যের পচন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। এতে পণ্য দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা যাবে। পাশাপাশি কৃষকেরা উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করার জন্য তুলনামূলক বেশি সময় পাবেন।

বিশেষ করে আলু, পেঁয়াজ, রসুন ও অন্যান্য অঙ্কুরোদগমপ্রবণ ফসলের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। নির্দিষ্ট মাত্রায় গামা রশ্মি প্রয়োগ করে এসব পণ্যের অনাকাঙ্ক্ষিত অঙ্কুরোদগম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

ফলমূল ও শাকসবজি দ্রুত পাকা ঠেকাতে সহায়ক

ফলমূল ও শাকসবজি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হলো দ্রুত পেকে যাওয়া এবং পচন। বিশেষ করে আম, কলা, পেঁপে, পেয়ারা ও অন্যান্য পচনশীল ফল সংগ্রহের পর দ্রুত পরিপক্ব হয়ে যায়।

ফলে দূরবর্তী বাজারে পরিবহন কিংবা বিদেশে রপ্তানির সময় পণ্যের গুণগত মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

গামা ইরেডিয়েশন প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু ফল ও সবজির পরিপক্বতা এবং পচন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। এতে পণ্য পরিবহন ও বাজারজাতকরণের জন্য বেশি সময় পাওয়া যাবে।

তবে সব ধরনের ফল ও সবজিতে একই মাত্রায় এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করা যায় না। পণ্যের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী উপযুক্ত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

কৃষিপণ্য রপ্তানিতে তৈরি হবে নতুন সুযোগ

বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা রয়েছে। তবে রপ্তানির ক্ষেত্রে পণ্যের গুণগত মান, খাদ্যনিরাপত্তা, পোকামাকড়মুক্ত অবস্থা এবং সংরক্ষণকাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করতে হয়। উৎপাদনের পর পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবহনের সময় মান ধরে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ।

গামা ইরেডিয়েশন সেন্টারের মাধ্যমে কৃষিপণ্যে ক্ষতিকর অণুজীব ও পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হবে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের নির্ধারিত মান অনুযায়ী কৃষিপণ্য প্রস্তুত করা সহজ হতে পারে।

এতে আম, আলু, পেঁয়াজ, মসলা, শাকসবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি কৃষক, কৃষি উদ্যোক্তা, প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান এবং রপ্তানিকারকেরাও উপকৃত হওয়ার সুযোগ পাবেন।

চিকিৎসাসামগ্রী জীবাণুমুক্ত করতেও ব্যবহার হবে

গামা ইরেডিয়েশন প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু কৃষি ও খাদ্য সংরক্ষণে সীমাবদ্ধ নয়। চিকিৎসা খাতেও এর গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগ রয়েছে।

এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন চিকিৎসাসামগ্রী ও চিকিৎসা সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত করা সম্ভব। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম নিরাপদ করার ক্ষেত্রে এটি কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হয়।

বিশেষ করে যেসব চিকিৎসাসামগ্রী জীবাণুমুক্ত অবস্থায় ব্যবহার করা জরুরি, সেগুলোর ক্ষেত্রে গামা রশ্মি প্রয়োগ করা যেতে পারে। শিল্প পর্যায়ে চিকিৎসাসামগ্রী জীবাণুমুক্ত করার ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে।

ফলে দেশের প্রথম গামা ইরেডিয়েশন সেন্টার কৃষি ও খাদ্য খাতের পাশাপাশি চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতেও অবদান রাখার সুযোগ তৈরি করবে।

গামা রশ্মিতে খাদ্য তেজস্ক্রিয় হবে কি?

গামা ইরেডিয়েশন প্রযুক্তি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রশ্ন থাকতে পারে—এই প্রক্রিয়ায় খাদ্য তেজস্ক্রিয় হয়ে যায় কি না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় গামা রশ্মি প্রয়োগ করে খাদ্য প্রক্রিয়াজাত করলে খাবার তেজস্ক্রিয় হয়ে যায় না। কারণ এই প্রক্রিয়ায় খাদ্যের মধ্যে তেজস্ক্রিয় পদার্থ যুক্ত করা হয় না। বরং নির্দিষ্ট শক্তির বিকিরণ ব্যবহার করে ক্ষতিকর অণুজীব ও পোকামাকড় ধ্বংস করা হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খাদ্যনিরাপত্তা ও সংরক্ষণের জন্য এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে খাদ্যের ধরন, পুষ্টিগুণ ও কাঙ্ক্ষিত সংরক্ষণকাল বিবেচনায় রেখে বিকিরণের মাত্রা নির্ধারণ করতে হয়।

কৃষি গবেষণা ও খাদ্যনিরাপত্তায় নতুন অধ্যায়

বাংলাদেশের কৃষি খাত বর্তমানে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি খাদ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানির সক্ষমতা বাড়ানোর চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। শুধু বেশি ফসল উৎপাদন করলেই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। উৎপাদিত খাদ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এ ক্ষেত্রে গামা ইরেডিয়েশন প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কৃষিপণ্যের অপচয় কমানো গেলে একই উৎপাদন থেকে বেশি পরিমাণ খাদ্য ভোক্তার কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এতে কৃষকের আর্থিক ক্ষতি কমার পাশাপাশি বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতেও সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।

চীনের সহযোগিতায় গাজীপুরের ভবানীপুরে দেশের প্রথম গামা ইরেডিয়েশন সেন্টার চালুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে কৃষি ও খাদ্য সংরক্ষণ প্রযুক্তির নতুন একটি ক্ষেত্র উন্মোচিত হলো। এখন সেন্টারটির কার্যক্রম কতটা বিস্তৃত করা যায় এবং কৃষক, উদ্যোক্তা ও রপ্তানিকারকেরা কত সহজে এই সুবিধা পান, তার ওপর এর সুফল অনেকটাই নির্ভর করবে।

সঠিক ব্যবস্থাপনা, গবেষণা এবং প্রযুক্তির বাণিজ্যিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে দেশের কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, চিকিৎসা ও রপ্তানি খাতে এই কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।