নওগাঁয় পৌঁছেছে নিহত ৫ প্রবাসীর মরদেহ, এলাকায় মাতম
- আপডেট সময় : ০৫:১৫:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৪৭ বার পড়া হয়েছে
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে একটি সোফা কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারানো পাঁচ বাংলাদেশি প্রবাসীর মরদেহ নওগাঁয় পৌঁছেছে। শনিবার (৩১ অক্টোবর) মরদেহগুলো নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে পরিবার, স্বজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যে শোকের মাতম শুরু হয়। দীর্ঘদিন পর প্রিয়জনের মরদেহ বাড়িতে ফিরলেও তাদের সঙ্গে আর কথা বলার সুযোগ নেই—এমন বাস্তবতা মেনে নিতে পারছেন না স্বজনেরা। কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পাঁচটি পরিবারের পরিবেশ।
এর আগে সৌদি আরবের রিয়াদের ওই সোফা কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহত ১৬ জনের মধ্যে সাতজন বাংলাদেশির মরদেহ দেশে আনা হয়। শনিবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে নওগাঁর পাঁচ প্রবাসীর মরদেহ নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়।
নওগাঁয় পৌঁছানো পাঁচ প্রবাসী হলেন—নওগাঁ সদর উপজেলার পার-নওগাঁ মরছুলা স্কুলপাড়ার শাহীন, আত্রাই উপজেলার ইসলামগাথী গ্রামের হাসিবুল হাসান শুভ, মাধবপুর গ্রামের মসিদুল সরদার সজিব, খনজোর গ্রামের মিনহাজ প্রামাণিক এবং সাধনগর গ্রামের সাগর আলী।
বাবাকে হারানোর পর মাকেও একা করে চলে গেলেন শাহীন
নওগাঁ সদর উপজেলার পার-নওগাঁ এলাকার মরছুলা স্কুলপাড়ার বাসিন্দা শাহীন ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর শেষবারের মতো দেখতে ভিড় করেন আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনেরা। ছেলের নিথর দেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা নার্গিস বেগম।
নার্গিস বেগম জানান, শাহীনের বয়স যখন মাত্র চার মাস, তখন তার বাবা মজনু রহমান মারা যান। এরপর একাই অনেক কষ্ট ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ছেলেকে বড় করেছেন তিনি। অভাব-অনটনের মধ্যেও ছেলেকে মানুষের মতো মানুষ করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। একসময় শাহীন বড় হয়ে পরিবারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। সংসারের হাল ধরতে জীবিকার সন্ধানে পাড়ি জমান সৌদি আরবে।
কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই ছেলেকেও হারাতে হলো তাকে। ছেলের সঙ্গে শেষ ফোনালাপের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন নার্গিস বেগম।
তিনি জানান, অগ্নিকাণ্ডের দিন রাতেও ছেলের সঙ্গে কথা হয়েছিল তার। ফোনে শাহীন জানিয়েছিলেন, খাসির মাংস দিয়ে ভাত খেয়ে ঘুমাতে যাবেন। মা হয়তো ভেবেছিলেন, পরদিন আবারও ছেলের সঙ্গে কথা হবে। কিন্তু সেই রাতই যে ছেলের জীবনের শেষ রাত হয়ে থাকবে, তা তিনি কল্পনাও করেননি।
শাহীনের মৃত্যুতে পরিবারটি এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। তিনি স্ত্রী, দুই নাবালক সন্তান ও বৃদ্ধা মাকে রেখে গেছেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্বজনেরা। বর্তমানে শাহীনের বন্ধুদের সহযোগিতায় কোনো রকমে দিন পার করছে পরিবারটি।
জানাজা ও দাফনের প্রস্তুতি
শাহীনের শ্বশুর আব্দুল মালেক মোল্লা জানান, শনিবার বাদ আসর মরছুলা স্কুল মাঠে শাহীনের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। জানাজা শেষে স্থানীয় গোরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।
এদিকে একই অগ্নিকাণ্ডে নিহত নওগাঁর অন্য চার প্রবাসী হাসিবুল হাসান শুভ, মসিদুল সরদার সজিব, মিনহাজ প্রামাণিক ও সাগর আলীর মরদেহও নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছেছে। তাদের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। প্রতিবেশী ও স্থানীয় বাসিন্দারাও শোকাহত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন।
শাহীনের পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস সংসদ সদস্যের
নওগাঁর পাঁচ প্রবাসীর মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য জাহিদুল ইসলাম ধলু। বিশেষ করে নিহত শাহীন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়ায় তার পরিবার ও দুই শিশুসন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
সংসদ সদস্য শাহীনের পরিবারকে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে একটি স্থায়ী বাড়ি নির্মাণ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পাশাপাশি তার দুই নাবালক সন্তানের ভবিষ্যৎ পড়াশোনা ও দেখাশোনার সার্বিক দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন। তার এই আশ্বাসে স্বজনদের মধ্যে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়েছে।
প্রবাসে জীবিকার সন্ধানে গিয়ে নিভে গেল পাঁচটি প্রাণ
পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানো এবং স্বজনদের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন নওগাঁর এই পাঁচ প্রবাসী। প্রবাসের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে পরিবারকে সহযোগিতা করছিলেন তারা। কিন্তু একটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে তাদের সেই স্বপ্ন থেমে গেল।
একদিকে প্রিয়জন হারানোর শোক, অন্যদিকে পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা—সব মিলিয়ে শোকাবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে নিহতদের বাড়িতে। বিশেষ করে শাহীনের মতো পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তার স্ত্রী, দুই সন্তান ও বৃদ্ধা মা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
সৌদি আরবে কর্মস্থলে অগ্নিকাণ্ডে পাঁচ বাংলাদেশির এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে নওগাঁর বিভিন্ন এলাকায় শোকের আবহ বিরাজ করছে। প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা এবং কর্মস্থলে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।























