আশুলিয়ায় পোশাক কারখানায় অসন্তোষ, ২০ কারখানায় ছুটি
- আপডেট সময় : ০৫:০৪:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৪৭ বার পড়া হয়েছে
ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তি বন্ধ এবং শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধের দাবিতে পোশাক কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকাল থেকে বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকরা কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ শুরু করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অন্তত ২০টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। এ সময় শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।
শনিবার দুপুরে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর, কাঠগড়া, জিরাবো ও নরসিংহপুর এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে শ্রমিক অসন্তোষের চিত্র দেখা যায়। এসব এলাকার একাধিক পোশাক কারখানার শ্রমিকরা বিভিন্ন দাবিতে কর্মবিরতি পালন করেন। এতে শিল্পাঞ্চলের স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
যেসব কারখানায় শ্রমিক বিক্ষোভ
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সকালে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকার নিউ এইজ অ্যাপারেলস ও নিউ এইজ গার্মেন্টসের শ্রমিকরা প্রথমে কর্মবিরতি শুরু করেন। তাদের প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, শ্রমিকদের কালো তালিকা তৈরি বন্ধ এবং কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই চাকরির নিশ্চয়তা দেওয়া।
পরে শ্রমিকদের এই আন্দোলন আশপাশের অন্যান্য কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে। আল-মুসলিম, কন্টিনেন্টাল, কাঠগড়া এলাকার এআর জিন্স ও নাঈম সোয়েটারের শ্রমিকরাও বিক্ষোভে অংশ নেন। এ ছাড়া নরসিংহপুরের এফএনএফ গার্মেন্টস এবং জিরাবো এলাকার টাউজার লাইন পোশাক কারখানার শ্রমিকদের মধ্যেও অসন্তোষ দেখা দেয়।
একপর্যায়ে বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা সড়কে ও কারখানার সামনে জড়ো হয়ে নিজেদের দাবির পক্ষে স্লোগান দিতে থাকেন। এতে ওই এলাকার শিল্পাঞ্চলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
শ্রমিক-পুলিশ ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, আহত ৫ পুলিশ
শনিবার দুপুরে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকায় শ্রমিকদের বড় একটি অংশ জড়ো হলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এ সময় পুলিশ বিক্ষোভরত শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। জবাবে উত্তেজিত শ্রমিকদের একটি অংশ পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এতে শিল্প পুলিশের অন্তত পাঁচ সদস্য আহত হন। অন্যদিকে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন পোশাকশ্রমিকও আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলোতে উৎপাদন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে আশুলিয়ার অন্তত ২০টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।
বেতন বাড়েনি, ক্ষোভ শ্রমিকদের
শ্রমিকদের অভিযোগ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ বাড়িভাড়া, খাবার, চিকিৎসা ও যাতায়াত ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। কিন্তু সেই তুলনায় তাদের বেতন বাড়ছে না। ফলে বর্তমান বেতনে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউ এইজ অ্যাপারেলসের এক শ্রমিক বলেন, বর্তমানে সবকিছুর দাম বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে তাদের বেতন বাড়েনি। এই বেতনে পরিবার নিয়ে জীবনযাপন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বেতন বৃদ্ধি না হলে সংসারের খরচ মেটানো সম্ভব হচ্ছে না বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
শ্রমিকদের দাবি, দ্রুত নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণা করতে হবে। পাশাপাশি শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্ত করে চাকরির সুযোগ বন্ধ করা এবং অন্যায়ভাবে ছাঁটাইয়ের মতো কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে।
মজুরি বোর্ড গঠন না হওয়ায় অসন্তোষ
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, সরকার শ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণের জন্য মজুরি বোর্ড গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। একই সঙ্গে অক্টোবরের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা করার কথাও ছিল।
কিন্তু ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেনি। ফলে শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ায় শ্রমিকরা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানান তিনি।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২০ কারখানায় সাধারণ ছুটি
আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, শ্রমিকরা উত্তেজিত হয়ে পড়লে পুলিশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। এ সময় উত্তেজিত শ্রমিকদের হামলায় শিল্প পুলিশের পাঁচ সদস্য আহত হন।
তিনি আরও জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দুপুরে আশুলিয়ার ২০টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
অন্যদিকে আশুলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হারুন অর রশিদ জানান, সকাল থেকে জিরাবো, নিশ্চিন্তপুর ও কাঠগড়া এলাকায় পোশাকশ্রমিকরা বিক্ষোভ ও কর্মবিরতি পালন করেন। তবে দুপুরের দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে।
শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি ও চাকরির নিরাপত্তার দাবিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট এ অসন্তোষে আশুলিয়ার তৈরি পোশাকশিল্পে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।























