খুলনায় ১১ দলের লংমার্চ
গণভোটের গণরায় মানতে হবে: জামায়াতের আমির
- আপডেট সময় : ০৫:৩৬:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৬৯ বার পড়া হয়েছে
গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জনগণের ভোটে ক্ষমতায় এসে যারা এখন গণভোটের সিদ্ধান্ত অমান্য করছেন, জনগণ তাদের এই অবস্থান মেনে নেবে না। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন ক্রমাগত শক্তিশালী করা হবে। প্রয়োজনে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) বিকেলে খুলনার ঐতিহাসিক শিববাড়ি মোড়ে সাত দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চের পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে যারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে তার রায় বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর তারাই এখন সেই সিদ্ধান্ত মানতে চাইছেন না। অথচ দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে মত দিয়েছেন। জনগণের এই রায় উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যাশা ছিল নির্বাচনের পর সরকার গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোর সমাধানে উদ্যোগ নেবে। কিন্তু ক্ষমতায় বসার পর সরকার সেই প্রত্যাশা পূরণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির প্রচার চালাচ্ছে।
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি
জামায়াতের আমির অভিযোগ করেন, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসে সরকার জনগণের মতামতকে অবজ্ঞা করছে। গণভোটের মাধ্যমে জনগণ যে সিদ্ধান্ত জানিয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
তিনি বলেন, জনগণের ভোট ও সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় গিয়ে জনগণের রায় অমান্য করার কোনো অধিকার কারও নেই। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের মতামতই চূড়ান্ত। তাই গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে।
ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড নিয়ে প্রশ্ন
সরকারের ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণ কর্মসূচি নিয়েও সমালোচনা করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এসব কার্ডের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ বাস্তবে কতটা উপকৃত হচ্ছেন?
তিনি বলেন, একদিকে মানুষকে এক হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা সহায়তার কথা বলা হচ্ছে। অন্যদিকে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন খাতে মাসে কয়েক হাজার টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে এসব সহায়তা দিয়ে সাধারণ মানুষের প্রকৃত সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।
গ্যাস সরবরাহ নিয়ে অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, অনেক এলাকায় গ্যাস না থাকলেও গ্রাহকদের নিয়মিত বিল দিতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রেও নানা ভোগান্তি রয়েছে। এর পাশাপাশি অতিরিক্ত ও ভুতুড়ে বিলের অভিযোগও রয়েছে। এসব সমস্যার সমাধান না করে শুধু প্রচারণা চালালে মানুষের দুর্ভোগ কমবে না।
সার ও ডিলার নিয়োগে ঘুষের অভিযোগ
কৃষকদের দুরবস্থার কথা তুলে ধরে জামায়াতের আমির বলেন, কৃষকরা প্রয়োজনের সময় সার পাচ্ছেন না। অথচ নতুন সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে ২০ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকা এবং কোনো কোনো জায়গায় এক কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
তিনি অভিযোগ করেন, ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও ভাগ-বাঁটোয়ারার ঘটনা ঘটছে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন দেশের সাধারণ কৃষকরা।
কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো, প্রয়োজনীয় সময়ে সার সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং কৃষি খাতের অনিয়ম বন্ধের দাবি জানান তিনি।
হত্যাকাণ্ডের বিচার ও চাঁদাবাজি বন্ধের দাবি
জুলাই আন্দোলনসহ গত সাড়ে ১৫ বছরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে। বিশেষ করে হাদীসহ নিহতদের হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকারি দলের পরিচয় ব্যবহার করে যারা চাঁদাবাজি করছে, তাদের অত্যাচারে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ। চাঁদাবাজির হাত থেকে জনগণকে মুক্ত করা এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাট ও বিদেশে পাচার বন্ধ করাও তাদের আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য।
জামায়াতের আমির বলেন, দেশের মানুষ আর অন্যায়, অনিয়ম ও দুর্নীতি দেখতে চায় না। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
খুলনা থেকে ঢাকামুখী লংমার্চের হুঁশিয়ারি
পরবর্তী আন্দোলন কর্মসূচি সম্পর্কে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এবার তারা ঢাকা থেকে লংমার্চ নিয়ে খুলনায় এসেছেন। তবে দাবি আদায়ে প্রয়োজন হলে খুলনা থেকে ঢাকামুখী লংমার্চের কর্মসূচিও ঘোষণা করা হতে পারে।
এ সময় উপস্থিত জনতার উদ্দেশে তিনি প্রশ্ন রাখেন, খুলনা থেকে ঢাকায় যাওয়ার ডাক দেওয়া হলে গ্রামবাংলার মানুষ সেই কর্মসূচিতে অংশ নিতে প্রস্তুত কি না।
তিনি বলেন, সাত দফা দাবি শুধু জামায়াতে ইসলামী কিংবা ১১ দলীয় ঐক্যের দাবি নয়। এগুলো দেশের সাধারণ মানুষের বাঁচা-মরার দাবি। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ১১ দলীয় ঐক্য শুধু নিজেদের রাজনৈতিক বিজয় চায় না। তারা দেশের প্রতিটি নাগরিকের বিজয়, অধিকার ও মুক্তি নিশ্চিত করতে চায়। একটি শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন, সাম্যভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
১১ দলীয় ঐক্যের নেতাদের বক্তব্য
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের ভালোবাসা ও সমর্থন নিয়েই তারা রাজপথে নেমেছেন। সড়কের দুই পাশে মানুষের উপস্থিতি এবং পথসভায় বিপুল জনসমাগম তার প্রমাণ। জাতির সঙ্গে বেঈমানি না করার অঙ্গীকার করে তিনি বলেন, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে কোনো আপস করা হবে না।
১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ বাস্তবায়ন কমিটি খুলনার আহ্বায়ক ও খুলনা মহানগর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমানের সভাপতিত্বে পথসভাটি অনুষ্ঠিত হয়। এটি পরিচালনা করেন সংগঠনটির সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল এমপি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক।
এ ছাড়া এনসিপি, এবি পার্টি, জাগপা, লেবার পার্টি ও ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ ১১ দলীয় ঐক্যের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা এবং সংসদ সদস্যরা বক্তব্য দেন।
পথসভা থেকে নেতারা সাত দফা দাবি বাস্তবায়নে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
























