সুলিভান ভাইদের চোখ বিশ্বকাপে, বাংলাদেশের ফুটবলে বড় স্বপ্ন
- আপডেট সময় : ০২:৩৩:১৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬
- / ১৫৩১ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশের ফুটবলে নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছেন রোনান ও ডেকলান সুলিভান। জাতীয় দলের হয়ে খেলার পাশাপাশি তাঁদের লক্ষ্য আরও বড়। বাংলাদেশের হয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে খেলতে চান দুই ভাই। একই স্বপ্ন দেখছেন জাতীয় দলের প্রধান কোচ থমাস ডুলি।
সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজেদের স্বপ্ন ও বাংলাদেশে খেলার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন সুলিভান ভাইয়েরা। যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়ার সেন্ট জোসেফস ইউনিভার্সিটির ছাত্রাবাসে তাঁদের সঙ্গে কথা বলে সংবাদমাধ্যমটি।
ইনস্টাগ্রামের বার্তা থেকে বাংলাদেশ দলে
সুলিভান ভাইদের বাংলাদেশে খেলার গল্প শুরু হয় ইনস্টাগ্রামের একটি বার্তা থেকে। ‘সেভ বাংলাদেশ ফুটবল’ নামের একটি সমর্থক পেজ থেকে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
শুরুতে বিষয়টি তাঁদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। পরে তাঁরা জানতে পারেন, প্ল্যাটফর্মটি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয়ে সহায়তা করে।
দুই ভাইয়ের মা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। মায়ের সূত্রেই বাংলাদেশের হয়ে খেলার সুযোগ পান তাঁরা। তবে বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ ছিল না। কারণ তাঁদের মায়ের কাছে বাংলাদেশি পাসপোর্ট ছিল না।
শেষ পর্যন্ত গত মার্চে নিউইয়র্ক থেকে দিল্লি হয়ে ঢাকায় আসেন রোনান ও ডেকলান। যোগ দেন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ দলের ক্যাম্পে। সেখানে ৩০ জনের বেশি ফুটবলার ছিলেন। ফলে জাতীয় বয়সভিত্তিক দলে জায়গা পাওয়া নিশ্চিত ছিল না।
ভাষার বাধা পেরিয়ে দলে জায়গা
বাংলাদেশে এসে শুরুতে ভাষার পার্থক্যের কারণে সমস্যায় পড়েন দুই ভাই। বিদেশি হওয়ায় সতীর্থদের কাছ থেকেও প্রথম দিকে বল পাওয়া কঠিন ছিল।
রোনান জানান, কয়েকবার বল পেয়ে নিজেদের দক্ষতা দেখানোর পর পরিস্থিতি বদলে যায়। কয়েক দিনের অনুশীলনের পরই তাঁরা দলে জায়গা পাওয়ার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন।
এরপর মালদ্বীপে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-২০ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের হয়ে খেলেন দুই ভাই। ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে নির্ধারিত সময়ের ম্যাচ গোলশূন্য থাকে। ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে।
বাংলাদেশের হয়ে শেষ শট নিতে এগিয়ে যান রোনান। তিনি পানেনকা শটে বল জালে জড়ান। এরপরই বাংলাদেশের শিরোপা নিশ্চিত হয়।
শিরোপা জয়ে বদলে যায় সবকিছু
মালেতে সেই মুহূর্তে উল্লাসে ফেটে পড়েন হাজারো দর্শক। দেশে ছড়িয়ে পড়ে সুলিভান ভাইদের নিয়ে নতুন উন্মাদনা। দেশে ফেরার পর তাঁদের দেওয়া হয় বীরোচিত সংবর্ধনা।
ডেকলান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের যুব ফুটবলে এমন উন্মাদনা দেখা যায় না। বাংলাদেশের মানুষ ট্রফি নিয়ে আসার জন্য তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে। এই অভিজ্ঞতা তাঁদের বাংলাদেশের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করেছে।
সুলিভান পরিবারের আরও দুই ভাই কুইন ও ক্যাভানও ফুটবলে পরিচিত। তাঁরা ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের হয়ে খেলছেন। কুইন যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়েছেন। ক্যাভানও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচিত।
ফলে বাংলাদেশের জন্য রোনান ও ডেকলানই হয়ে ওঠেন সম্ভাব্য পথ।
বিশ্বকাপের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন ডুলিও
শুধু সুলিভান ভাইয়েরাই নন, বাংলাদেশের ফুটবলে বিশ্বকাপের স্বপ্ন দেখছেন জাতীয় দলের প্রধান কোচ থমাস ডুলি। যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলের সাবেক এই অধিনায়ক অনূর্ধ্ব-২০ দলের সাফ শিরোপা জয়ের সাত সপ্তাহ পর জাতীয় দলের দায়িত্ব নেন।
ডুলির বিশ্বাস, বাংলাদেশের ফুটবলে বড় পরিবর্তন সম্ভব। তাঁর মতে, ভালো খেলোয়াড়দের সঠিকভাবে কোচিং করানো গেলে এবং খেলা নিয়ে তাঁদের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আনা গেলে দলের পারফরম্যান্সে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ উন্নতি করা সম্ভব।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশকে ১৫০-এর ঘরে তোলাও তাঁর কাছে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য।
বিদেশে থাকা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলারদেরও জাতীয় দলে যুক্ত করতে চান ডুলি। এরই মধ্যে কয়েকজন সম্ভাব্য খেলোয়াড়ের নাম সামনে এসেছে। তাঁদের মধ্যে আছেন ফুলহ্যাম একাডেমির ১৯ বছর বয়সী উইঙ্গার ফারহান ওয়াহিদ। আছেন ইংল্যান্ডের চতুর্থ স্তরের লিগে খেলা ২৫ বছর বয়সী লুই ওয়াটসনও।
জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে রয়েছেন হামজা চৌধুরী ও কানাডায় জন্ম নেওয়া মিডফিল্ডার শামিত সোম।
অবকাঠামো উন্নয়নেও জোর
ডুলির পরিকল্পনায় শুধু বিদেশি খেলোয়াড় যুক্ত করাই শেষ কথা নয়। বাংলাদেশের ফুটবলের অবকাঠামো উন্নয়নকেও তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী, জাতীয় দলের সাফল্যের সঙ্গে ফুটবল নিয়ে আগ্রহ বাড়বে। বাড়বে পৃষ্ঠপোষকতা ও বিনিয়োগ। গড়ে উঠবে শক্তিশালী ফুটবল কাঠামো। বয়সভিত্তিক একাডেমি থেকে উঠে আসবেন নতুন খেলোয়াড়। তাঁরা জায়গা করে নেবেন পেশাদার লিগে।
বাংলাদেশের পুরুষ ফুটবল দল ইতিহাসে মাত্র একবার এশিয়ান কাপে খেলেছে। বিশ্বকাপের মূলপর্বে এখনো জায়গা করে নিতে পারেনি। তবে ডুলি মনে করেন, এশিয়ান কাপ কিংবা বিশ্বকাপে খেলা একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে সেই প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়েও যেতে পারে।
বিশ্বকাপই চূড়ান্ত লক্ষ্য
সুলিভান ভাইদের চোখেও এখন বিশ্বকাপের স্বপ্ন। ডেকলানের বিশ্বাস, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা যোগ্য বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের একত্র করা গেলে বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ডুলির স্বপ্ন আরও বিস্তৃত। তিনি চান, বাংলাদেশের শিশুরা শুধু আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলের মতো বড় দলের সমর্থক হয়ে না থাকুক। তারা নিজেরাই ফুটবলার হয়ে উঠুক। একদিন সেই বড় দলগুলোর বিপক্ষে মাঠে নামুক।
ডুলির ভাষায়, বাংলাদেশের শিশুরা শুধু বড় দলগুলোর সমর্থক হবে—এমনটা তিনি চান না। তাঁর লক্ষ্য, তারা খেলোয়াড় হয়ে একদিন আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের মতো দলের বিপক্ষে খেলবে।
সুলিভান ভাইদের উত্থান এবং ডুলির পরিকল্পনা মিলিয়ে বাংলাদেশের ফুটবলে এখন নতুন স্বপ্ন তৈরি হয়েছে। সেই স্বপ্নের নাম—বিশ্বকাপ।


























