০১:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

নিউরোসার্জারির পর ফিজিওথেরাপির গুরুত্ব

প্রদীপ চন্দ্র দাস
  • আপডেট সময় : ১১:৪৮:৫০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬
  • / ১৫৪৬ বার পড়া হয়েছে
এস. এ টিভি সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

মস্তিষ্ক, মেরুদণ্ড, স্পাইনাল কর্ড ও বিভিন্ন স্নায়ুর রোগ ও আঘাতের চিকিৎসায় নিউরোসার্জারি বা স্নায়ু-শল্যচিকিৎসার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে রোগের মূল সমস্যা নিয়ন্ত্রণ বা দূর করা সম্ভব হলেও একজন রোগীর স্বাভাবিক চলাফেরা, পেশিশক্তি, ভারসাম্য, দৈনন্দিন কাজের সক্ষমতা ও স্বাধীন জীবনযাত্রায় ফিরে আসার জন্য পরবর্তী পুনর্বাসনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপি নিউরোসার্জারির পর একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে কাজ করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিউরোসার্জারির পর দীর্ঘ সময় শয্যাশায়ী থাকা, ব্যথা, পেশির দুর্বলতা, জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া, ভারসাম্যের সমস্যা এবং চলাফেরায় সীমাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে। কোনো কোনো রোগীর ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের আগে বা পরে হাঁটা, বসা, দাঁড়ানো কিংবা দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা সাময়িক বা দীর্ঘমেয়াদে কমে যেতে পারে। রোগীর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী উপযুক্ত সময়ে ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসন শুরু করা গেলে এসব জটিলতা কমানো এবং হারানো কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধারে সহায়তা করা সম্ভব।

অস্ত্রোপচারের পর কেন ফিজিওথেরাপি গুরুত্বপূর্ণ

নিউরোসার্জারির পর রোগীর পুনর্বাসনের লক্ষ্য শুধু শরীরের নড়াচড়া ফিরিয়ে আনা নয়; বরং তাকে যতটা সম্ভব নিরাপদ ও স্বনির্ভর জীবনে ফিরিয়ে নেওয়া। এজন্য রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যায়াম, মবিলাইজেশন, গেইট ট্রেনিং, ব্যালান্স ট্রেনিং এবং দৈনন্দিন কাজের অনুশীলনসহ বিভিন্ন ধরনের থেরাপি প্রয়োগ করা হতে পারে।

১. পেশিশক্তি ও নড়াচড়া পুনরুদ্ধার

মস্তিষ্ক বা মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচারের পর শরীরের কোনো অংশ দুর্বল হয়ে যেতে পারে। দীর্ঘ সময় শয্যাশায়ী থাকলেও পেশিশক্তি কমে যেতে পারে। নির্দিষ্ট ব্যায়াম ও থেরাপিউটিক এক্সারসাইজের মাধ্যমে ধীরে ধীরে পেশিশক্তি ও নড়াচড়ার ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়।

রোগীর সক্ষমতা অনুযায়ী কোন ব্যায়াম কতবার এবং কতক্ষণ করা হবে, তা ফিজিওথেরাপিস্ট নির্ধারণ করেন। সব রোগীর জন্য একই ধরনের ব্যায়াম উপযুক্ত নয়।

২. হাঁটা ও ভারসাম্য উন্নত করা

মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচার, মস্তিষ্কের বিভিন্ন রোগ বা নিউরোসার্জারির পর অনেক রোগীর হাঁটা ও ভারসাম্যে সমস্যা হতে পারে। এ অবস্থায় রোগীর সামর্থ্য অনুযায়ী গেইট ট্রেনিং ও ব্যালান্স এক্সারসাইজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রয়োজনে ওয়াকার, স্টিক বা অন্যান্য সহায়ক ডিভাইস নিরাপদভাবে ব্যবহারের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়। লক্ষ্য থাকে রোগীকে ধীরে ধীরে আরও নিরাপদ ও স্বাধীনভাবে চলাফেরার সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা।

৩. জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া প্রতিরোধ

দীর্ঘ সময় নড়াচড়া না করলে বিভিন্ন জয়েন্টের স্বাভাবিক নড়াচড়া সীমিত হয়ে যেতে পারে। এ ধরনের সমস্যা প্রতিরোধে রোগীর অবস্থা অনুযায়ী প্যাসিভ ও অ্যাক্টিভ রেঞ্জ-অব-মোশন এক্সারসাইজ করা হতে পারে।

নিয়মিত ও উপযুক্ত নড়াচড়া জয়েন্টের নমনীয়তা বজায় রাখতে এবং ভবিষ্যতে চলাফেরার জটিলতা কমাতে সহায়ক হতে পারে।

৪. ব্যথা ও পেশির অস্বাভাবিক টান নিয়ন্ত্রণ

অস্ত্রোপচারের পর ব্যথা, পেশির শক্ত হয়ে যাওয়া বা অস্বাভাবিক টান অনেক রোগীর দৈনন্দিন কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে ব্যায়াম, পজিশনিং, ম্যানুয়াল থেরাপি বা অন্যান্য উপযুক্ত ফিজিওথেরাপি পদ্ধতি ব্যবহার করা হতে পারে।

তবে অস্ত্রোপচারের ধরন ও রোগীর অবস্থার ওপর নির্ভর করে কোন পদ্ধতি নিরাপদ, তা চিকিৎসক ও ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

৫. শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত জটিলতা কমাতে সহায়তা

দীর্ঘ সময় শয্যাশায়ী থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে ফুসফুসে সিক্রেশন জমে যাওয়া বা শ্বাস-প্রশ্বাসের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, পজিশনিং ও দ্রুত নিরাপদ মবিলাইজেশনের মাধ্যমে এসব ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করা যেতে পারে।

বিশেষ করে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে অবস্থানকারী বা শারীরিকভাবে দুর্বল রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসা দলের নিবিড় পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।

৬. দৈনন্দিন কাজের সক্ষমতা বৃদ্ধি

ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো রোগীকে যতটা সম্ভব স্বনির্ভর করে তোলা। এজন্য শুধু হাঁটার অনুশীলনই নয়, বিছানা থেকে ওঠা, বসা, দাঁড়ানো, চেয়ার থেকে ওঠা-বসা, সিঁড়ি ব্যবহার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় দৈনন্দিন কাজ ধাপে ধাপে অনুশীলন করানো হতে পারে।

রোগীর সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনুশীলনের মাত্রাও ধীরে ধীরে পরিবর্তন করা হয়।

৭. স্বাভাবিক জীবন ও কর্মক্ষেত্রে ফিরে যেতে সহায়তা

নিউরোসার্জারির পর পুনর্বাসনের লক্ষ্য কেবল শারীরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার নয়। একজন রোগীকে তার পরিবার, সামাজিক জীবন এবং সম্ভব হলে কর্মক্ষেত্রে নিরাপদভাবে ফিরিয়ে নেওয়াও পুনর্বাসনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রোগীর শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক প্রস্তুতি, বয়স, পেশা এবং দৈনন্দিন প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে পুনর্বাসন পরিকল্পনা করা হলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে আসার পথ সহজ হতে পারে।

কখন ফিজিওথেরাপি শুরু করা হয়?

নিউরোসার্জারির পর ঠিক কখন ফিজিওথেরাপি শুরু করা হবে, তা নির্ভর করে রোগের ধরন, অস্ত্রোপচারের ধরন, অস্ত্রোপচারের পর রোগীর শারীরিক ও চিকিৎসাগত অবস্থা এবং নিউরোসার্জনের নির্দেশনার ওপর।

অনেক ক্ষেত্রে রোগী চিকিৎসাগতভাবে স্থিতিশীল হলে হাসপাতালেই প্রাথমিক পর্যায়ে নিরাপদ মবিলাইজেশন ও প্রয়োজনীয় ব্যায়াম শুরু করা যেতে পারে। তবে এটি কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমার নিয়ম নয়। একজন রোগীর জন্য যে ব্যায়াম নিরাপদ, অন্য রোগীর জন্য একই ব্যায়াম উপযুক্ত নাও হতে পারে।

তাই নিউরোসার্জারির পর নিজের সিদ্ধান্তে ব্যায়াম শুরু না করে চিকিৎসক ও ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

চিকিৎসক ও ফিজিওথেরাপিস্টের সমন্বয় জরুরি

সফল পুনর্বাসনের জন্য নিউরোসার্জন, ফিজিওথেরাপিস্ট, নার্স, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। রোগীর অস্ত্রোপচারের ধরন, চিকিৎসকের নির্দেশনা, শারীরিক সক্ষমতা এবং পুনর্বাসনের লক্ষ্য বিবেচনা করে ধাপে ধাপে থেরাপি পরিকল্পনা করা উচিত।

বিশেষ করে অস্ত্রোপচারের পর কোন ধরনের নড়াচড়া করা যাবে, কোন ধরনের মুভমেন্ট এড়িয়ে চলতে হবে এবং কতটা চাপ দেওয়া নিরাপদ—এসব বিষয়ে চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি।

রোগীর অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ

পুনর্বাসনের সফলতা অনেকাংশে রোগীর নিয়মিত অংশগ্রহণের ওপর নির্ভর করে। থেরাপিস্টের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যায়াম করা, নিরাপদভাবে চলাফেরা করা, নির্ধারিত ফলোআপে যাওয়া এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে চলা পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করতে পারে।

তবে অতিরিক্ত ব্যায়াম বা দ্রুত ফল পাওয়ার চেষ্টা করাও ক্ষতিকর হতে পারে। তাই রোগীর সক্ষমতা অনুযায়ী ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।

নিউরোসার্জারি ও পুনর্বাসন—দুটি পরস্পরসম্পূরক ধাপ

নিউরোসার্জারি রোগের মূল কারণের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, আর ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসন রোগীর হারানো কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং দৈনন্দিন জীবনে ফিরে আসতে সহায়তা করে। ফলে অস্ত্রোপচারের সফলতাকে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর ফলাফলে রূপ দিতে পুনর্বাসনের ভূমিকা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগীর অবস্থা অনুযায়ী সঠিক সময়ে এবং সঠিক পদ্ধতিতে পুনর্বাসন শুরু করা গেলে চলাফেরা, ভারসাম্য, পেশিশক্তি ও দৈনন্দিন কার্যক্ষমতার উন্নতিতে সহায়তা পাওয়া সম্ভব। তবে প্রতিটি রোগীর চিকিৎসা ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা আলাদা হওয়া প্রয়োজন।

লেখক: প্রদীপ চন্দ্র দাস
ফিজিওথেরাপি ও রিহ্যাবিলিটেশন বিশেষজ্ঞ
নিউরোসার্জারি বিভাগ, ইব্রাহীম কার্ডিয়াক হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট (আইসিআর-আইবিআর/বারডেম)

এস. এ টিভি সমন্ধে

SATV (South Asian Television) is a privately owned ‘infotainment’ television channel in Bangladesh. It is the first ever station in Bangladesh using both HD and 3G Technology. The channel is owned by SA Group, one of the largest transportation and real estate groups of the country. SATV is the first channel to bring ‘Idol’ franchise in Bangladesh through Bangladeshi Idol.

যোগাযোগ

বাড়ী ৪৭, রাস্তা ১১৬,
গুলশান-১, ঢাকা-১২১২,
বাংলাদেশ।
ফোন: +৮৮ ০২ ৯৮৯৪৫০০
ফ্যাক্স: +৮৮ ০২ ৯৮৯৫২৩৪
ই-মেইল: info@satv.tv
ওয়েবসাইট: www.satv.tv

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৩। বাড়ী ৪৭, রাস্তা ১১৬, গুলশান-১, ঢাকা-১২১২, বাংলাদেশ। ফোন: +৮৮ ০২ ৯৮৯৪৫০০, ফ্যাক্স: +৮৮ ০২ ৯৮৯৫২৩৪

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

নিউরোসার্জারির পর ফিজিওথেরাপির গুরুত্ব

আপডেট সময় : ১১:৪৮:৫০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

মস্তিষ্ক, মেরুদণ্ড, স্পাইনাল কর্ড ও বিভিন্ন স্নায়ুর রোগ ও আঘাতের চিকিৎসায় নিউরোসার্জারি বা স্নায়ু-শল্যচিকিৎসার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে রোগের মূল সমস্যা নিয়ন্ত্রণ বা দূর করা সম্ভব হলেও একজন রোগীর স্বাভাবিক চলাফেরা, পেশিশক্তি, ভারসাম্য, দৈনন্দিন কাজের সক্ষমতা ও স্বাধীন জীবনযাত্রায় ফিরে আসার জন্য পরবর্তী পুনর্বাসনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপি নিউরোসার্জারির পর একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে কাজ করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিউরোসার্জারির পর দীর্ঘ সময় শয্যাশায়ী থাকা, ব্যথা, পেশির দুর্বলতা, জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া, ভারসাম্যের সমস্যা এবং চলাফেরায় সীমাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে। কোনো কোনো রোগীর ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের আগে বা পরে হাঁটা, বসা, দাঁড়ানো কিংবা দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা সাময়িক বা দীর্ঘমেয়াদে কমে যেতে পারে। রোগীর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী উপযুক্ত সময়ে ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসন শুরু করা গেলে এসব জটিলতা কমানো এবং হারানো কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধারে সহায়তা করা সম্ভব।

অস্ত্রোপচারের পর কেন ফিজিওথেরাপি গুরুত্বপূর্ণ

নিউরোসার্জারির পর রোগীর পুনর্বাসনের লক্ষ্য শুধু শরীরের নড়াচড়া ফিরিয়ে আনা নয়; বরং তাকে যতটা সম্ভব নিরাপদ ও স্বনির্ভর জীবনে ফিরিয়ে নেওয়া। এজন্য রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যায়াম, মবিলাইজেশন, গেইট ট্রেনিং, ব্যালান্স ট্রেনিং এবং দৈনন্দিন কাজের অনুশীলনসহ বিভিন্ন ধরনের থেরাপি প্রয়োগ করা হতে পারে।

১. পেশিশক্তি ও নড়াচড়া পুনরুদ্ধার

মস্তিষ্ক বা মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচারের পর শরীরের কোনো অংশ দুর্বল হয়ে যেতে পারে। দীর্ঘ সময় শয্যাশায়ী থাকলেও পেশিশক্তি কমে যেতে পারে। নির্দিষ্ট ব্যায়াম ও থেরাপিউটিক এক্সারসাইজের মাধ্যমে ধীরে ধীরে পেশিশক্তি ও নড়াচড়ার ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়।

রোগীর সক্ষমতা অনুযায়ী কোন ব্যায়াম কতবার এবং কতক্ষণ করা হবে, তা ফিজিওথেরাপিস্ট নির্ধারণ করেন। সব রোগীর জন্য একই ধরনের ব্যায়াম উপযুক্ত নয়।

২. হাঁটা ও ভারসাম্য উন্নত করা

মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচার, মস্তিষ্কের বিভিন্ন রোগ বা নিউরোসার্জারির পর অনেক রোগীর হাঁটা ও ভারসাম্যে সমস্যা হতে পারে। এ অবস্থায় রোগীর সামর্থ্য অনুযায়ী গেইট ট্রেনিং ও ব্যালান্স এক্সারসাইজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রয়োজনে ওয়াকার, স্টিক বা অন্যান্য সহায়ক ডিভাইস নিরাপদভাবে ব্যবহারের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়। লক্ষ্য থাকে রোগীকে ধীরে ধীরে আরও নিরাপদ ও স্বাধীনভাবে চলাফেরার সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা।

৩. জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া প্রতিরোধ

দীর্ঘ সময় নড়াচড়া না করলে বিভিন্ন জয়েন্টের স্বাভাবিক নড়াচড়া সীমিত হয়ে যেতে পারে। এ ধরনের সমস্যা প্রতিরোধে রোগীর অবস্থা অনুযায়ী প্যাসিভ ও অ্যাক্টিভ রেঞ্জ-অব-মোশন এক্সারসাইজ করা হতে পারে।

নিয়মিত ও উপযুক্ত নড়াচড়া জয়েন্টের নমনীয়তা বজায় রাখতে এবং ভবিষ্যতে চলাফেরার জটিলতা কমাতে সহায়ক হতে পারে।

৪. ব্যথা ও পেশির অস্বাভাবিক টান নিয়ন্ত্রণ

অস্ত্রোপচারের পর ব্যথা, পেশির শক্ত হয়ে যাওয়া বা অস্বাভাবিক টান অনেক রোগীর দৈনন্দিন কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে ব্যায়াম, পজিশনিং, ম্যানুয়াল থেরাপি বা অন্যান্য উপযুক্ত ফিজিওথেরাপি পদ্ধতি ব্যবহার করা হতে পারে।

তবে অস্ত্রোপচারের ধরন ও রোগীর অবস্থার ওপর নির্ভর করে কোন পদ্ধতি নিরাপদ, তা চিকিৎসক ও ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

৫. শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত জটিলতা কমাতে সহায়তা

দীর্ঘ সময় শয্যাশায়ী থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে ফুসফুসে সিক্রেশন জমে যাওয়া বা শ্বাস-প্রশ্বাসের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, পজিশনিং ও দ্রুত নিরাপদ মবিলাইজেশনের মাধ্যমে এসব ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করা যেতে পারে।

বিশেষ করে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে অবস্থানকারী বা শারীরিকভাবে দুর্বল রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসা দলের নিবিড় পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।

৬. দৈনন্দিন কাজের সক্ষমতা বৃদ্ধি

ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো রোগীকে যতটা সম্ভব স্বনির্ভর করে তোলা। এজন্য শুধু হাঁটার অনুশীলনই নয়, বিছানা থেকে ওঠা, বসা, দাঁড়ানো, চেয়ার থেকে ওঠা-বসা, সিঁড়ি ব্যবহার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় দৈনন্দিন কাজ ধাপে ধাপে অনুশীলন করানো হতে পারে।

রোগীর সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনুশীলনের মাত্রাও ধীরে ধীরে পরিবর্তন করা হয়।

৭. স্বাভাবিক জীবন ও কর্মক্ষেত্রে ফিরে যেতে সহায়তা

নিউরোসার্জারির পর পুনর্বাসনের লক্ষ্য কেবল শারীরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার নয়। একজন রোগীকে তার পরিবার, সামাজিক জীবন এবং সম্ভব হলে কর্মক্ষেত্রে নিরাপদভাবে ফিরিয়ে নেওয়াও পুনর্বাসনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রোগীর শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক প্রস্তুতি, বয়স, পেশা এবং দৈনন্দিন প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে পুনর্বাসন পরিকল্পনা করা হলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে আসার পথ সহজ হতে পারে।

কখন ফিজিওথেরাপি শুরু করা হয়?

নিউরোসার্জারির পর ঠিক কখন ফিজিওথেরাপি শুরু করা হবে, তা নির্ভর করে রোগের ধরন, অস্ত্রোপচারের ধরন, অস্ত্রোপচারের পর রোগীর শারীরিক ও চিকিৎসাগত অবস্থা এবং নিউরোসার্জনের নির্দেশনার ওপর।

অনেক ক্ষেত্রে রোগী চিকিৎসাগতভাবে স্থিতিশীল হলে হাসপাতালেই প্রাথমিক পর্যায়ে নিরাপদ মবিলাইজেশন ও প্রয়োজনীয় ব্যায়াম শুরু করা যেতে পারে। তবে এটি কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমার নিয়ম নয়। একজন রোগীর জন্য যে ব্যায়াম নিরাপদ, অন্য রোগীর জন্য একই ব্যায়াম উপযুক্ত নাও হতে পারে।

তাই নিউরোসার্জারির পর নিজের সিদ্ধান্তে ব্যায়াম শুরু না করে চিকিৎসক ও ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

চিকিৎসক ও ফিজিওথেরাপিস্টের সমন্বয় জরুরি

সফল পুনর্বাসনের জন্য নিউরোসার্জন, ফিজিওথেরাপিস্ট, নার্স, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। রোগীর অস্ত্রোপচারের ধরন, চিকিৎসকের নির্দেশনা, শারীরিক সক্ষমতা এবং পুনর্বাসনের লক্ষ্য বিবেচনা করে ধাপে ধাপে থেরাপি পরিকল্পনা করা উচিত।

বিশেষ করে অস্ত্রোপচারের পর কোন ধরনের নড়াচড়া করা যাবে, কোন ধরনের মুভমেন্ট এড়িয়ে চলতে হবে এবং কতটা চাপ দেওয়া নিরাপদ—এসব বিষয়ে চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি।

রোগীর অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ

পুনর্বাসনের সফলতা অনেকাংশে রোগীর নিয়মিত অংশগ্রহণের ওপর নির্ভর করে। থেরাপিস্টের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যায়াম করা, নিরাপদভাবে চলাফেরা করা, নির্ধারিত ফলোআপে যাওয়া এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে চলা পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করতে পারে।

তবে অতিরিক্ত ব্যায়াম বা দ্রুত ফল পাওয়ার চেষ্টা করাও ক্ষতিকর হতে পারে। তাই রোগীর সক্ষমতা অনুযায়ী ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।

নিউরোসার্জারি ও পুনর্বাসন—দুটি পরস্পরসম্পূরক ধাপ

নিউরোসার্জারি রোগের মূল কারণের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, আর ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসন রোগীর হারানো কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং দৈনন্দিন জীবনে ফিরে আসতে সহায়তা করে। ফলে অস্ত্রোপচারের সফলতাকে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর ফলাফলে রূপ দিতে পুনর্বাসনের ভূমিকা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগীর অবস্থা অনুযায়ী সঠিক সময়ে এবং সঠিক পদ্ধতিতে পুনর্বাসন শুরু করা গেলে চলাফেরা, ভারসাম্য, পেশিশক্তি ও দৈনন্দিন কার্যক্ষমতার উন্নতিতে সহায়তা পাওয়া সম্ভব। তবে প্রতিটি রোগীর চিকিৎসা ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা আলাদা হওয়া প্রয়োজন।

লেখক: প্রদীপ চন্দ্র দাস
ফিজিওথেরাপি ও রিহ্যাবিলিটেশন বিশেষজ্ঞ
নিউরোসার্জারি বিভাগ, ইব্রাহীম কার্ডিয়াক হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট (আইসিআর-আইবিআর/বারডেম)