কিশোর গ্যাং দমনে পুলিশ তৎপর
- আপডেট সময় : ০১:৪২:১৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৫৮ বার পড়া হয়েছে
কিশোর গ্যাংয়ের লাগাম টানতে সারাদেশে বহুমুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে পুলিশ। হত্যা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক কারবার, অপহরণ, ডাকাতি ও জমি দখলসহ নানা অপরাধে কিশোরদের জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ বাড়ছে। এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান, আটক বা গ্রেপ্তার নয়, কিশোরদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতেও পরিকল্পনা করছে পুলিশ সদর দপ্তর।
সম্প্রতি কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থী অপ্রতিম কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় নিহত হওয়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। এরপর সারাদেশে কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তা নিয়ে কাজ শুরু করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। এ বিষয়ে একটি সমন্বিত প্রস্তাব তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পুলিশের একজন ডিআইজিকে।
কিশোর গ্যাংয়ের তালিকা হালনাগাদ
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কিশোর গ্যাংয়ের বিদ্যমান তালিকা হালনাগাদ করার কাজ শুরু হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশসহ দেশের বিভিন্ন থানা ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে সারাদেশে বড় পরিসরে বিশেষ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এ লক্ষ্যে পুলিশ সদর দপ্তরে ঢাকা মহানগর পুলিশের ক্রাইম জোন ও গোয়েন্দা বিভাগের ডিসিদের নিয়ে সভাও হয়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইনে কোনো সংশোধন বা সংযোজন প্রয়োজন কি না, কিংবা নতুন আইন প্রণয়নের প্রয়োজন আছে কি না, সেটিও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
পাঁচ জেলায় বিশেষ অভিযান
কুমিল্লাসহ পাঁচ জেলায় ইতোমধ্যে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে পুলিশ। কুমিল্লায় প্রথম দফায় জেলার ১৮ থানায় একযোগে অভিযান চালিয়ে ৬২৪ জনকে আটক করা হয়। এর মধ্যে ৪৫১ জনকে মুচলেকা নিয়ে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। বাকি ১৭৩ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এরপর দ্বিতীয় দফায় ২৫৪ জন এবং তৃতীয় দফায় ৪১৫ জনকে আটক করা হয়। তিন দফায় কুমিল্লায় মোট ১ হাজার ২৯৩ কিশোরকে আটক করেছে পুলিশ।
এ ছাড়া চাঁদপুর, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও চট্টগ্রামেও বিশেষ অভিযান চলছে। চাঁদপুরের আট উপজেলায় অভিযান চালিয়ে ৩৭০ জনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে ৩৫৫ জনকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আটক কয়েকজনের বিরুদ্ধে মাদক ও অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
লক্ষ্মীপুরের ছয় থানায় একযোগে অভিযান চালিয়ে ২৬৬ জনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে ২১৪ জনকে অভিভাবকের জিম্মায় মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। একইভাবে ফেনী শহরে অভিযান চালিয়ে ৩৮ কিশোরকে আটক করা হয়।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের ১৭ থানা এলাকায় একযোগে অভিযান চালিয়ে ৪৪৫ জনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
শুধু গ্রেপ্তার নয়, পুনর্বাসনের ওপরও গুরুত্ব
সমাজ-অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে প্রকৃত অপরাধ অনুযায়ী মামলা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে গ্যাংয়ের ‘বড় ভাই’, পৃষ্ঠপোষক ও অর্থদাতাদেরও আইনের আওতায় আনার প্রয়োজন রয়েছে।
তার মতে, প্রান্তিক পরিবারের পড়াশোনা ও কর্মের বাইরে থাকা কিশোরদের প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান এবং উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ তৈরি করা দরকার। পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
ঢাকায় ১৫৮ কিশোর গ্যাং
পুলিশের নথি অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকায় ১৫৮টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। এসব গ্রুপে মোট সদস্য সংখ্যা ১ হাজার ২১৯ জন। তবে সারাদেশে কিশোর গ্যাংয়ের মোট সংখ্যা ও সদস্যদের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান এখনো পাওয়া যায়নি।
পুলিশের বিভিন্ন মামলার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যে অপরাধের অভিযোগ রয়েছে তা হলো ছিনতাই। মোবাইল ফোন, টাকা, মোটরসাইকেলসহ মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় কিশোরদের জড়িত থাকার তথ্য রয়েছে।
এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন জুয়া, চাঁদাবাজি, মাদক বহন ও বিক্রি, গ্যাং-সংঘর্ষ, আধিপত্য বিস্তার, ভাড়াটে হিসেবে হামলা এবং জমি ও স্থাপনা দখলের মতো গুরুতর অপরাধেও কিশোরদের ব্যবহারের অভিযোগ উঠছে। ফলে কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে পুলিশের চলমান অভিযান কতটা কার্যকর হয়, তার পাশাপাশি কিশোরদের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে সামাজিক ও পারিবারিক উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।




















