০৬:০৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬

বাঁশ-বেতের শিল্প ঘিরে ৩৫ পরিবারের জীবন-জীবিকা

রফিকুল ইসলাম, কুমিল্লা
  • আপডেট সময় : ০৪:২১:৪১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬
  • / ১৫৬৭ বার পড়া হয়েছে
এস. এ টিভি সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

পাড়ায় ঢুকতেই কানে আসে বাঁশ চিরে ফালি তৈরির খসখস শব্দ। উঠোনে বসে কেউ বাঁশ কাটছেন, কেউ ফালি তৈরি করছেন। পাশেই নারীরা নিপুণ হাতে বুনছেন কুলা, ঝুড়ি ও হাঁস-মুরগির খাঁচা। ঘরের বারান্দা, উঠোন কিংবা গাছের ছায়ায় চলছে ব্যস্ত কর্মযজ্ঞ। পুরো পাড়াটিই যেন একটি জীবন্ত কর্মশালা।

তবে এই কর্মব্যস্ততার আড়ালে রয়েছে টিকে থাকার কঠিন সংগ্রাম। কুমিল্লার তিতাস উপজেলার বড় মাছিমপুর দক্ষিণ নমপাড়ার প্রায় ৩৫টি পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঁশের কুটিরশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। কুলা, ঝুড়ি, হাঁস-মুরগির খাঁচাসহ নানা প্রয়োজনীয় সামগ্রী তৈরি করেই চলে তাদের সংসার।

একসময় গ্রামীণ জীবনে বাঁশের তৈরি এসব পণ্যের ব্যাপক ব্যবহার থাকলেও বর্তমানে সস্তা প্লাস্টিকের সামগ্রীর দাপটে কমেছে চাহিদা। পাশাপাশি বেড়েছে বাঁশের দাম। ফলে পরিশ্রমের তুলনায় আয় না থাকায় সংকটে পড়েছেন কারিগররা।

কারিগর নিখিল নমো সূত্রধর জানান, প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি এ পেশায় আছেন। তাঁর বাবা-দাদারাও বাঁশের কাজ করতেন। মাছিমপুর বা গাজীপুর বাজার থেকে একটি ভালো বাঁশ কিনতে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা লাগে। একটি বাঁশ দিয়ে পাঁচ দিনে ১৫ থেকে ২০টি কুলা তৈরি করা গেলেও এতে যে আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন।

তিনি বলেন, “আমাদের ছেলেমেয়েরা আর এই কাজ করতে চায় না। তারা বিদেশে যেতে চায়, অন্য পেশায় যেতে চায়। এভাবে চলতে থাকলে একদিন হয়তো এই শিল্পই হারিয়ে যাবে।”

নারী কারিগর লঞ্চরানি নম, নমিতা, অমিল্য ও নারায়ণ জানান, ভালো মানের বাঁশ আনতে মুরাদনগর কিংবা ঘাড়মুড়া যেতে হয়। বাঁশের দাম আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। স্বামী-স্ত্রী মিলে সপ্তাহে প্রায় ১৫টি হাঁস-মুরগির খাঁচা তৈরি করলেও শ্রম অনুযায়ী ন্যায্য মূল্য পাওয়া যায় না।

কারিগর মিলন, কনিকা, মিনা ও নিখিল নম সূত্রধর বলেন, অভাবের কারণেই তারা এখনো এ পেশায় আছেন। সরকারি প্রণোদনা, সহজ শর্তে ঋণ কিংবা প্রশিক্ষণ পেলে এ শিল্পকে আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

স্থানীয় খুচরা ব্যবসায়ী রিপন মিয়া বলেন, পাড়াটির প্রায় ৩৫টি পরিবার এই কাজের ওপর নির্ভরশীল। তিনি কারিগরদের কাছ থেকে একটি হাঁস-মুরগির খাঁচা ১৮০ টাকায় কিনে বিভিন্ন বাজারে প্রায় ২০০ টাকায় বিক্রি করেন। তাঁর মতে, বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে কারিগররা পণ্যের ভালো দাম পাবেন।

এ বিষয়ে বিসিক কুমিল্লার উপমহাব্যবস্থাপক মো. মুনতাসীর মামুন বলেন, তিতাসে এ ধরনের কুটিরশিল্পের অস্তিত্ব সম্পর্কে বিসিক অবগত। তবে অনেক কারিগর নিবন্ধিত না থাকায় তারা বিভিন্ন সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। নিবন্ধন করলে আর্থিক সহায়তা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, আধুনিক নকশা উন্নয়ন, বিপণন সুবিধা ও মেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাওয়ার পাশাপাশি রপ্তানির ক্ষেত্রেও সহযোগিতা করা হবে।

কারিগরদের দাবি, বাঁশের দাম ও উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা, সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ এবং বাজার সম্প্রসারণে সরকারি উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

বড় মাছিমপুর দক্ষিণ নমপাড়ার উঠোনে আজও বাঁশের গন্ধের সঙ্গে মিশে আছে কারিগরদের ঘাম। প্রতিটি কুলা, ঝুড়ি কিংবা খাঁচার বুননে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের জীবন-জীবিকা এবং বাংলার দীর্ঘদিনের লোকজ ঐতিহ্য। কারিগরদের মতে, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে সস্তা প্লাস্টিকের পণ্যের চাপে হারিয়ে যেতে পারে পরিবেশবান্ধব এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প।

এস. এ টিভি সমন্ধে

SATV (South Asian Television) is a privately owned ‘infotainment’ television channel in Bangladesh. It is the first ever station in Bangladesh using both HD and 3G Technology. The channel is owned by SA Group, one of the largest transportation and real estate groups of the country. SATV is the first channel to bring ‘Idol’ franchise in Bangladesh through Bangladeshi Idol.

যোগাযোগ

বাড়ী ৪৭, রাস্তা ১১৬,
গুলশান-১, ঢাকা-১২১২,
বাংলাদেশ।
ফোন: +৮৮ ০২ ৯৮৯৪৫০০
ফ্যাক্স: +৮৮ ০২ ৯৮৯৫২৩৪
ই-মেইল: info@satv.tv
ওয়েবসাইট: www.satv.tv

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৩। বাড়ী ৪৭, রাস্তা ১১৬, গুলশান-১, ঢাকা-১২১২, বাংলাদেশ। ফোন: +৮৮ ০২ ৯৮৯৪৫০০, ফ্যাক্স: +৮৮ ০২ ৯৮৯৫২৩৪

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

বাঁশ-বেতের শিল্প ঘিরে ৩৫ পরিবারের জীবন-জীবিকা

আপডেট সময় : ০৪:২১:৪১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬

পাড়ায় ঢুকতেই কানে আসে বাঁশ চিরে ফালি তৈরির খসখস শব্দ। উঠোনে বসে কেউ বাঁশ কাটছেন, কেউ ফালি তৈরি করছেন। পাশেই নারীরা নিপুণ হাতে বুনছেন কুলা, ঝুড়ি ও হাঁস-মুরগির খাঁচা। ঘরের বারান্দা, উঠোন কিংবা গাছের ছায়ায় চলছে ব্যস্ত কর্মযজ্ঞ। পুরো পাড়াটিই যেন একটি জীবন্ত কর্মশালা।

তবে এই কর্মব্যস্ততার আড়ালে রয়েছে টিকে থাকার কঠিন সংগ্রাম। কুমিল্লার তিতাস উপজেলার বড় মাছিমপুর দক্ষিণ নমপাড়ার প্রায় ৩৫টি পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঁশের কুটিরশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। কুলা, ঝুড়ি, হাঁস-মুরগির খাঁচাসহ নানা প্রয়োজনীয় সামগ্রী তৈরি করেই চলে তাদের সংসার।

একসময় গ্রামীণ জীবনে বাঁশের তৈরি এসব পণ্যের ব্যাপক ব্যবহার থাকলেও বর্তমানে সস্তা প্লাস্টিকের সামগ্রীর দাপটে কমেছে চাহিদা। পাশাপাশি বেড়েছে বাঁশের দাম। ফলে পরিশ্রমের তুলনায় আয় না থাকায় সংকটে পড়েছেন কারিগররা।

কারিগর নিখিল নমো সূত্রধর জানান, প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি এ পেশায় আছেন। তাঁর বাবা-দাদারাও বাঁশের কাজ করতেন। মাছিমপুর বা গাজীপুর বাজার থেকে একটি ভালো বাঁশ কিনতে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা লাগে। একটি বাঁশ দিয়ে পাঁচ দিনে ১৫ থেকে ২০টি কুলা তৈরি করা গেলেও এতে যে আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন।

তিনি বলেন, “আমাদের ছেলেমেয়েরা আর এই কাজ করতে চায় না। তারা বিদেশে যেতে চায়, অন্য পেশায় যেতে চায়। এভাবে চলতে থাকলে একদিন হয়তো এই শিল্পই হারিয়ে যাবে।”

নারী কারিগর লঞ্চরানি নম, নমিতা, অমিল্য ও নারায়ণ জানান, ভালো মানের বাঁশ আনতে মুরাদনগর কিংবা ঘাড়মুড়া যেতে হয়। বাঁশের দাম আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। স্বামী-স্ত্রী মিলে সপ্তাহে প্রায় ১৫টি হাঁস-মুরগির খাঁচা তৈরি করলেও শ্রম অনুযায়ী ন্যায্য মূল্য পাওয়া যায় না।

কারিগর মিলন, কনিকা, মিনা ও নিখিল নম সূত্রধর বলেন, অভাবের কারণেই তারা এখনো এ পেশায় আছেন। সরকারি প্রণোদনা, সহজ শর্তে ঋণ কিংবা প্রশিক্ষণ পেলে এ শিল্পকে আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

স্থানীয় খুচরা ব্যবসায়ী রিপন মিয়া বলেন, পাড়াটির প্রায় ৩৫টি পরিবার এই কাজের ওপর নির্ভরশীল। তিনি কারিগরদের কাছ থেকে একটি হাঁস-মুরগির খাঁচা ১৮০ টাকায় কিনে বিভিন্ন বাজারে প্রায় ২০০ টাকায় বিক্রি করেন। তাঁর মতে, বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে কারিগররা পণ্যের ভালো দাম পাবেন।

এ বিষয়ে বিসিক কুমিল্লার উপমহাব্যবস্থাপক মো. মুনতাসীর মামুন বলেন, তিতাসে এ ধরনের কুটিরশিল্পের অস্তিত্ব সম্পর্কে বিসিক অবগত। তবে অনেক কারিগর নিবন্ধিত না থাকায় তারা বিভিন্ন সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। নিবন্ধন করলে আর্থিক সহায়তা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, আধুনিক নকশা উন্নয়ন, বিপণন সুবিধা ও মেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাওয়ার পাশাপাশি রপ্তানির ক্ষেত্রেও সহযোগিতা করা হবে।

কারিগরদের দাবি, বাঁশের দাম ও উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা, সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ এবং বাজার সম্প্রসারণে সরকারি উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

বড় মাছিমপুর দক্ষিণ নমপাড়ার উঠোনে আজও বাঁশের গন্ধের সঙ্গে মিশে আছে কারিগরদের ঘাম। প্রতিটি কুলা, ঝুড়ি কিংবা খাঁচার বুননে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের জীবন-জীবিকা এবং বাংলার দীর্ঘদিনের লোকজ ঐতিহ্য। কারিগরদের মতে, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে সস্তা প্লাস্টিকের পণ্যের চাপে হারিয়ে যেতে পারে পরিবেশবান্ধব এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প।