ময়মনসিংহে বর্ষায় যৌবন ফিরে পেয়েছে ব্রহ্মপুত্র
- আপডেট সময় : ০৩:২৭:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
- / ১৫২৫ বার পড়া হয়েছে
শুষ্ক মৌসুমে কোথাও হাঁটুসমান পানি, কোথাও জেগে ওঠে বালুর চর। পাল তোলা নৌকা দেখা যায় না। জাল হাতে জেলেদের ব্যস্ততাও থাকে না। সরু খালের মতো পড়ে থাকে ময়মনসিংহের প্রাণ ব্রহ্মপুত্র নদ।
তবে বর্ষা এলেই বদলে যায় সেই চিত্র। পানিতে ভরে ওঠে নদ। বাড়ে স্রোত। নদীর বুকে দেখা মেলে পাল তোলা নৌকার। জেলেরা নেমে পড়েন মাছ ধরতে। সব মিলিয়ে মনে হয়, হারানো যৌবন ফিরে পেয়েছে ব্রহ্মপুত্র।
বর্ষায় বদলে যায় নদীর চিত্র
বর্ষায় ব্রহ্মপুত্রে পানি বাড়ায় নদীর দুই তীরের পরিবেশও শীতল হয়ে ওঠে। প্রশান্তির খোঁজে মানুষ ছুটে আসে নদপাড়ে। কেউ নৌকায় ঘোরেন, কেউ উপভোগ করেন নদীর সৌন্দর্য।
জয়নুল পার্কে ঘুরতে আসা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী লাইজু ইসলাম বলেন, গত বছরের এপ্রিলে ব্রহ্মপুত্র দেখতে এসে নদে পানি প্রায় দেখেননি। কোথাও হাঁটুসমান পানি ছিল। আবার কোথাও মানুষ হেঁটেই নদ পার হচ্ছিলেন। তখন নদটিকে খালের মতো মনে হয়েছিল। এবার নদে পানি ও নৌকা দেখে ভালো লাগছে।
শহরের বাসিন্দা প্রবাল দাস বলেন, ছোটবেলায় এই নদে গোসল করতেন। বন্ধুদের সঙ্গে মাছও ধরেছেন। এখন নদে বালু ও ময়লা থাকায় সেই পরিবেশ নেই। তবে বর্ষায় নদে পানি এলে শৈশবের স্মৃতি ফিরে আসে।
নৌকা চলায় আয় বেড়েছে মাঝিদের
পাল তোলা নৌকার মাঝি হান্নান মিয়া বলেন, বছরের প্রায় আট মাস নদে পানি কম থাকে। তখন নৌকা নিয়ে বসে থাকলেও যাত্রী পাওয়া যায় না। অনেক সময় নৌকা চরে আটকে যায়।
তিনি বলেন, এখন নদে পানি বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে নৌকার যাত্রী। প্রতি ঘণ্টায় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা ভাড়ায় মানুষকে ঘোরানো হচ্ছে। এতে তাদের আয়ও হচ্ছে।
নূরুল ইসলাম নামে এক জেলে বলেন, একসময় ব্রহ্মপুত্রে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। নদ শুকিয়ে যাওয়ায় মাছ কমে গেছে। অনেক জেলে পরিবার অন্যত্র চলে গেছে। কেউ কেউ পেশা বদলেছেন। তবে বর্ষায় পানি বাড়লে পুঁটি, ট্যাংড়া, ছোট চিংড়িসহ বিভিন্ন মাছ পাওয়া যায়।
খনন প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন
ব্রহ্মপুত্রের নাব্যতা ফেরাতে ২ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২২৭ কিলোমিটার নদ খনন প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রকল্পের মেয়াদ ও বরাদ্দ কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, খননের নামে নদীর বালু উত্তোলনই বেশি হয়েছে। এতে নাব্যতা ফেরার বদলে বালু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনকে ম্যানেজ করে বালু বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, খনন শুরু হলে ময়মনসিংহবাসী আশা করেছিলেন ব্রহ্মপুত্র তার হারানো যৌবন ফিরে পাবে। কিন্তু নাব্যতা ফেরানোর বদলে বালু উত্তোলন ও বিক্রিই যেন বড় বিষয় হয়ে উঠেছে। তিনি পরিকল্পিতভাবে নদ খননের দাবি জানান।
নদ রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপের দাবি
পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন আন্দোলনের সভাপতি লে. কর্নেল (অব.) ড. মো. শাহাব উদ্দীন বলেন, ব্রহ্মপুত্র এখনো অনেকটা মৃত অবস্থায় রয়েছে। বর্ষা শেষে আবারও নদ শুকিয়ে খালে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা আছে।
তার অভিযোগ, খননের নামে নদ দখল ও বালু বাণিজ্য চলছে। নদ খননের প্রকল্পে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখে দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মকসুমুল হাকিম চৌধুরী বলেন, দেশের প্রতিটি জেলায় গুরুত্বপূর্ণ একটি করে নদ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে নদ-নদীর তথ্য চাওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ নদগুলো পর্যায়ক্রমে খননের আওতায় আনা হবে।
তিনি বলেন, ব্রহ্মপুত্রে খনন কাজ চলছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বিআইডব্লিউটিএ কাজটি দেখভাল করছে। নদী রক্ষা কমিশন ও প্রশাসনও বিষয়টি তদারক করছে। খনন শেষ হলে এ অঞ্চলের মানুষ উপকৃত হবেন।























