বলিউডে বিতর্ক নতুন নয়। তবে কিছু বিতর্ক কেবল একটি সিনেমাকে ঘিরে সীমাবদ্ধ থাকে না; সেগুলো সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, দর্শকের মানসিকতা এবং তারকাদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দেয়। ২০১২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘জিসম ২’ ছিল তেমনই একটি সিনেমা। ছবির গল্প বা বক্স অফিসের চেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল এর নায়িকা সানি লিওনি।
বলিউডে তাঁর অভিষেকের সময় থেকেই প্রশ্ন উঠেছিল—একজন সাবেক প্রাপ্তবয়স্ক চলচ্চিত্র তারকাকে কি মূলধারার হিন্দি সিনেমার নায়িকা হিসেবে দর্শক গ্রহণ করবে? এক দশকেরও বেশি সময় পর সেই বিতর্কে নতুন করে আলো ফেলেছেন নির্মাতা মহেশ ভাট। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, ‘বিগ বস ৫’–এর ঘরে সানির সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের পরই তাঁকে ‘জিসম ২’–এর নায়িকা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
সম্প্রতি ‘দ্য রাশম্মি বিরাগ শো’তে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মহেশ ভাট বলেন, তখন পুজা ভাট ছবিটির প্রযোজনা ও পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। সিনেমার প্রচারণাও শুরু হয়ে গিয়েছিল। এমনকি প্রধান অভিনেত্রী চূড়ান্ত হওয়ার আগেই রহস্যময় একটি সিলুয়েট পোস্টার প্রকাশ করা হয়, যা দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি করে। তবে দ্রুত নায়িকা নির্বাচন করা জরুরি হয়ে পড়ে।
সানি লিওনির বলিউড যাত্রার সূচনা কোনো সিনেমার সেটে নয়, বরং জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘বিগ বস ৫’–এর মাধ্যমে। ওয়াইল্ড কার্ড প্রতিযোগী হিসেবে তাঁর অংশগ্রহণই তখন দেশজুড়ে তুমুল বিতর্কের জন্ম দেয়। সমালোচকদের প্রশ্ন ছিল, একজন প্রাপ্তবয়স্ক বিনোদনশিল্পীকে পারিবারিক সময়ে সম্প্রচারিত একটি অনুষ্ঠানে আনা কতটা গ্রহণযোগ্য?
এই বিতর্কের মধ্যেই ভাট পরিবারের নজরে আসেন সানি। নতুন মুখের খোঁজে থাকা পূজা ভাট তাঁকে নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। ঝুঁকি ছিল বড়, কিন্তু আলোচনাও ছিল ততটাই।
মহেশ ভাট জানান, সে সময় ভায়াকম১৮–এর তৎকালীন প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা রাজ নায়াক তাঁকে বলেছিলেন, ‘আপনি তো সাহসী কাস্টিংয়ের জন্য পরিচিত। সানি লিওনিকে কেন আপনার ছবিতে নিচ্ছেন না?’
তাঁর ভাষায়, টেলিভিশন চ্যানেলও তখন বিতর্ক নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। অনেকেই প্রশ্ন তুলছিলেন, ভারতের মতো দেশে একজন প্রাপ্তবয়স্ক চলচ্চিত্র তারকাকে কীভাবে এমন একটি অনুষ্ঠানে আনা হলো, যা প্রায় প্রতিটি পরিবারের ঘরে দেখা হয়।
তবে সানির সঙ্গে সরাসরি দেখা করার পর তাঁর ধারণা বদলে যায় বলে জানান মহেশ ভাট।
‘ওর সঙ্গে কথা বলেই আমাদের মনে হয়েছিল, ও অভিনয় করতে পারবে,’ বলেন তিনি।
এরপরই তিনি পূজা ভাটকে সানিকে ‘জিসম ২’–এর প্রধান চরিত্রে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
‘জিসম’–এর জন্যও প্রথম পছন্দ ছিলেন সানি
মজার বিষয় হলো, ‘জিসম’ ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে সানির সম্পর্ক আরও আগে থেকেই হওয়ার কথা ছিল। পূজা ভাট এর আগে জানিয়েছিলেন, ২০০৩ সালে মুক্তি পাওয়া প্রথম ‘জিসম’–এর নায়িকা হিসেবেও তাঁর প্রথম পছন্দ ছিলেন সানি লিওনি। কিন্তু সে সময় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রাপ্তবয়স্ক ম্যাগাজিন পেন্টহাউস–এর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ থাকায় তাঁকে নেওয়া সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত ছবিতে অভিনয় করেন বিপাশা বসু ও জন আব্রাহাম।
বছর কয়েক পর ‘জিসম ২’–এর পরিকল্পনা শুরু হলে আবারও সামনে আসে সানির নাম। তবে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের ভেতরেও বিষয়টি নিয়ে দ্বিধা ছিল। পূজা ভাটের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিনেতা ডিনা মুরিয়া। প্রথমে বলেছিলেন, ‘সে খুব সুন্দর, কিন্তু…’—আর সেই ‘কিন্তু’র মধ্যেই ছিল মূল প্রশ্ন, দর্শক কি তাঁকে বলিউডের মূলধারার নায়িকা হিসেবে গ্রহণ করবে?
‘দর্শকের প্রত্যাশাই ছবির সবচেয়ে বড় বাধা’
মহেশ ভাটের মতে, ‘জিসম ২’ প্রত্যাশা অনুযায়ী সাড়া না পাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল দর্শকের পূর্বধারণা।
তিনি জানান, মুক্তির আগেই একজন পরিবেশক ছবিটির জন্য অস্বাভাবিক বেশি অর্থ দিয়েছিলেন। এতে বিস্মিত হয়ে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘ছবি না দেখেই এত দাম দিচ্ছ কেন?’
জবাবে পরিবেশক বলেছিলেন, ‘ভারতে গুগলে সবচেয়ে বেশি খোঁজা নারীদের একজন সানি লিওনি। ছবি যেমনই হোক, তাঁর জনপ্রিয়তাই যথেষ্ট।’
মহেশের মতে, সেই জনপ্রিয়তাই শেষ পর্যন্ত ছবিটির জন্য উল্টো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
‘দর্শক একজন প্রাপ্তবয়স্ক চলচ্চিত্র তারকাকে সংসারী নারী হিসেবে দেখতে আসেননি। তাঁরা আরও উসকানিমূলক কিছু প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু আমরা ভিন্ন ধরনের গল্প বলেছিলাম। প্রত্যাশা আর বাস্তবতার এই ফারাকই ছবির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায়,’ বলেন তিনি।
বিতর্কের মধ্যেও শক্তিশালী সূচনা
সমালোচনা ও বিতর্ক সত্ত্বেও বক্স অফিসে ‘জিসম ২’–এর শুরুটা ছিল বেশ শক্তিশালী। মহেশ ভাটের দাবি, মুক্তির প্রথম তিন দিন প্রায় সব প্রদর্শনীই ছিল হাউসফুল। মাঝারি বাজেটের ছবিটি প্রথম প্রদর্শনী পর্বেই প্রায় ৩০ কোটি রুপি আয় করে, যা সে সময়ের হিসেবে উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
এক দশকেরও বেশি সময় পর মহেশ ভাটের এই মন্তব্য আবারও মনে করিয়ে দিল, ‘জিসম ২’ কেবল একটি সিনেমা ছিল না; এটি ছিল বলিউডে গ্রহণযোগ্যতা, দর্শকের প্রত্যাশা এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দীর্ঘদিনের এক বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।