সাগর-রুনি হত্যা মামলায় নতুন তথ্য, তদন্তে নতুন মোড়
- আপডেট সময় : ০২:০৭:২৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৩৮ বার পড়া হয়েছে
সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্তে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বরিশালের বাসায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযানে উদ্ধার করা জিও-লোকেশন, এসএমএস ও কল ডিটেইলস রেকর্ডের (সিডিআর) প্রিন্টেড কপিসহ বিভিন্ন ডিজিটাল আলামত ঘিরে মামলাটিতে নতুন করে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। এসব তথ্য পর্যালোচনা করে প্রাথমিকভাবে সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব রোকেয়া প্রাচীর সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে বলে তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব তথ্য এখনো তদন্ত ও যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত বা আদালতে প্রমাণিত অপরাধের তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
জিও-লোকেশন ও ডিজিটাল আলামতে নতুন সূত্র
তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, জিয়াউল আহসানের বাসায় দুদকের অভিযানে বেশ কিছু ডিজিটাল আলামত পাওয়া যায়। এর মধ্যে বিভিন্ন জিও-লোকেশন, এসএমএস এবং সিডিআরের প্রিন্টেড কপি রয়েছে। এসব তথ্যের সূত্র ধরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন বিষয়টি পর্যালোচনা শুরু করে।
গত ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে এসব ডিজিটাল আলামত উদ্ধারের বিষয়টি জানান। তিনি বলেন, অভিযানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জিয়াউল আহসানের এক সহকারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। প্রাথমিক অনুসন্ধানে একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও একজন মিডিয়া ব্যক্তিত্বের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সামনে এসেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামও এ বিষয়ে একই ধরনের বক্তব্য দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে টাস্কফোর্সের সঙ্গে আলোচনায় প্রসিকিউশন জানায়, সাগর-রুনি হত্যা মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে। প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষ হলে প্রাপ্ত তথ্য ও উপাত্ত মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তরের কথা রয়েছে।
এ জন্য গত ১৩ অক্টোবর প্রসিকিউশনের কাছে সংরক্ষিত ডিজিটাল আলামত ও তথ্য-উপাত্ত চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়। তবে প্রতিবেদন দাখিলের সময় পর্যন্ত সেসব তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়েছে।
১৪ বছরেও উদ্ঘাটিত হয়নি হত্যার রহস্য
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে নিজেদের ভাড়া বাসায় খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারওয়ার ও মেহেরুন রুনি। সাগর মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক এবং রুনি এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ছিলেন।
পরদিন সকালে তাঁদের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ১২ ফেব্রুয়ারি রুনির ভাই নওশের আলী রোমান শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করেন।
প্রথমে থানা-পুলিশ মামলাটির তদন্ত শুরু করে। পরে তদন্তের দায়িত্ব পায় গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে হাইকোর্টের নির্দেশে মামলাটির তদন্তভার র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) কাছে হস্তান্তর করা হয়।
কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি। তদন্তের অগ্রগতি জানতে আদালতের নির্দেশে একাধিকবার সময় বাড়ানো হয়েছে।
হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত টাস্কফোর্সের তদন্ত
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মামলাটির তদন্তে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের নির্দেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে ২০২৫ সালের ৬ এপ্রিলের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে কয়েক দফায় সময় বাড়ানো হয়।
টাস্কফোর্সের সচিব ও তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজিজুল হক আদালতে মামলার অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করেন।
প্রতিবেদনে হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন দিক, ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল, সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং আগের তদন্তের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন ডিজিটাল আলামত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনাস্থলে পাওয়া দুই অজ্ঞাত পুরুষের ডিএনএ
মামলার তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া অজ্ঞাত ব্যক্তিদের ডিএনএ।
টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাগরকে বাঁধতে ব্যবহৃত চাদর এবং রুনির টি-শার্ট থেকে পাওয়া নমুনা পরীক্ষায় দুটি অজ্ঞাত পুরুষের ডিএনএ প্রোফাইল শনাক্ত করা হয়। ঘটনাস্থলে মোট চারজনের ডিএনএ পাওয়া যায়। এর মধ্যে সাগর ও রুনির ডিএনএ শনাক্ত করা সম্ভব হলেও বাকি দুই পুরুষের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি।
অজ্ঞাত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি পরীক্ষাগারে নমুনা পাঠানো হয়েছিল। এ ছাড়া ডিএনএর ভিত্তিতে সম্ভাব্য চেহারার ছবি তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়। কিন্তু নমুনায় একাধিক ব্যক্তির ডিএনএ মিশ্রিত থাকায় নির্ভরযোগ্য ছবি তৈরি করা সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে মামলার সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ডিএনএর সঙ্গে অজ্ঞাত নমুনাগুলোর মিল আছে কি না, তা পরীক্ষা করা হয়। তবে পাঠানো নমুনাগুলোর সঙ্গে ২৫ জনের ডিএনএ মেলেনি। পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দুটি এবং নেদারল্যান্ডসের একটি পরীক্ষাগারের সহায়তা নেওয়া হয়েছিল।
২৫ জনের ডিএনএ পরীক্ষা, জিজ্ঞাসাবাদ ৯০ সাক্ষীকে
তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদনে সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদের তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। আগের তদন্তকারী কর্মকর্তারা মোট ১৬৭ জনের জবানবন্দি গ্রহণ করেছিলেন। টাস্কফোর্সের তদন্তকালে ৯০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাঁদের মধ্যে ২৪ জনের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ভিসেরা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে চেতনানাশক পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় সাগর ও রুনিকে হত্যা করা হয়েছিল বলে তথ্য পাওয়া গেছে। পারিবারিক বা দাম্পত্য কলহের কারণে একজনকে হত্যার পর অন্যজন আত্মহত্যা করেছিলেন—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একইভাবে পেশাগত বিরোধ, অর্থনৈতিক লেনদেন কিংবা জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্রও তদন্তে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
তবে দীর্ঘ তদন্তেও হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য এবং কারা এতে জড়িত, তা নিশ্চিত করা যায়নি।
এখনো উদ্ধার হয়নি মোবাইল ফোন ও দুটি ল্যাপটপ
মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামতের মধ্যে নিহত দম্পতির লুণ্ঠিত মোবাইল ফোন এবং দুটি ল্যাপটপ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট কয়েকজন সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়নি। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, সাবেক ডিএমপি-ডিবি প্রধান মনিরুল ইসলাম, সাবেক র্যাব মহাপরিচালক মোখলেসুর রহমান এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা সম্ভব হলে মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা তদন্তের নতুন দিকনির্দেশনা পাওয়া যেতে পারে। সাংবাদিক রুমী নোমানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাঁর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। অন্যদের জিজ্ঞাসাবাদের প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে।
কারাগারে থাকা নিরাপত্তাকর্মীকে চিকিৎসার নির্দেশ
ঘটনাস্থলের ভবনের নিরাপত্তাকর্মী এনাম আহমেদ ওরফে হুমায়ুন কবিরকে ২০১৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি র্যাব গ্রেপ্তার করে। তিনি এখনো কারাগারে রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আদালতের নির্দেশে কাশিমপুর কারাগারে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সে সময় তাঁর আচরণ অস্বাভাবিক ছিল এবং তিনি যথাযথভাবে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছিলেন না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে আদালতের অনুমতি নিয়ে তাঁকে আবারও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
একজন আইনজীবীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তাঁর শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালককে একটি মেডিকেল বোর্ড গঠনের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে আগামী ৫ নভেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
৩০০টি সিডি পর্যালোচনায় নতুন তথ্যের আশা
অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুসের বক্তব্য অনুযায়ী, জিয়াউল আহসানের কাছ থেকে উদ্ধার করা প্রায় ৩০০টি সিডিতে বিপুল পরিমাণ তথ্য রয়েছে। এসব তথ্যে কথোপকথন, ভিডিও, অডিও এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধসংক্রান্ত উপাত্ত থাকতে পারে।
সংশ্লিষ্ট তথ্যগুলো পর্যালোচনা করে সাগর-রুনি হত্যা মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রমাণ ও উপাত্ত তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হলে পরবর্তী তদন্ত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।
টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদ্ঘাটন, অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধার এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই করতে আরও সময় প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, নতুন ডিজিটাল আলামত মামলাটির তদন্তে সম্ভাব্য নতুন সূত্র তৈরি করেছে। তবে এসব তথ্যের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত যোগসূত্র নির্ধারণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই এবং অপরাধীদের শনাক্ত করতে তদন্তের আরও অগ্রগতি প্রয়োজন। দীর্ঘ ১৪ বছর পরও বিচারপ্রত্যাশী পরিবার ও সাংবাদিক সমাজের অপেক্ষার অবসান ঘটবে কি না, তা নির্ভর করছে নতুন আলামত বিশ্লেষণ এবং তদন্তের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।





















