ফরিদপুরে সিজারের পর পেটে গজ, নার্স বিথীর মৃত্যু
- আপডেট সময় : ০৩:০৪:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৫১ বার পড়া হয়েছে
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের পর পেটে গজ রেখে সেলাই করে দেওয়ার অভিযোগের ঘটনায় দীর্ঘ চার মাস মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে মারা গেলেন বিথী আক্তার নামের এক নার্সিং শিক্ষার্থী। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
বিথী আক্তার ফরিদপুর ইন্টারন্যাশনাল নার্সিং কলেজ থেকে ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফারি সম্পন্ন করেছিলেন। নার্স হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। তবে সিজারিয়ান অপারেশনের পর শারীরিক জটিলতায় তার ইন্টার্নশিপ ও লাইসেন্স পরীক্ষায় অংশ নেওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
সিজারের পর থেকেই শারীরিক জটিলতা
পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ৬ মে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিথী আক্তারের সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের পর তার পেটের ভেতরে গজ রেখে সেলাই করে দেওয়া হয়। এরপর থেকেই তীব্র পেট ব্যথাসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগতে থাকেন তিনি।
অবস্থার ক্রমাগত অবনতি হলে প্রায় দুই মাস পর তার পুনরায় অস্ত্রোপচার করা হয়। তখন পেটের ভেতরে গজ থাকার বিষয়টি ধরা পড়ে বলে দাবি পরিবারের। দীর্ঘ সময় পেটের ভেতরে গজ থাকার কারণে তার শরীরে গুরুতর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হয়।
পরবর্তীতে তার বাইপাস সার্জারিও করতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। এরপর থেকে দীর্ঘ চার মাস ধরে বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন বিথী।
৬১ কেজি থেকে ওজন নেমে আসে ৩৯ কেজিতে
পরিবারের সদস্যরা জানান, সিজারিয়ান অপারেশনের আগে বিথী আক্তারের ওজন ছিল প্রায় ৬১ কেজি। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার কারণে তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। একপর্যায়ে তার ওজন কমে প্রায় ৩৯ কেজিতে নেমে আসে।
অসুস্থতার কারণে নিজের নবজাতক সন্তানকে কোলে নেওয়া এবং বুকের দুধ খাওয়ানোর সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হন বিথী। দীর্ঘ চিকিৎসা ও শারীরিক যন্ত্রণার মধ্যেই সন্তানকে দূর থেকে দেখতে হয়েছে তাকে বলে জানান স্বজনরা।
চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পরিবারের
এর আগে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বিথী আক্তার নিজেই জানিয়েছিলেন, তার পেটে গজ থেকে যাওয়ার কারণে ইনফেকশন তৈরি হয় এবং এতে পেটের নাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার চিকিৎসার পেছনে পরিবারকে দীর্ঘদিন ধরে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।
পরিবারের অভিযোগ, সঠিক সময়ে বিষয়টি শনাক্ত করা গেলে বিথীর শারীরিক অবস্থার এতটা অবনতি নাও হতে পারত। তবে পেটে গজ থাকার অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
বিথীর স্বামী রাকিবুল ইসলামসহ পরিবারের সদস্যরা এ ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। তাদের দাবি, চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা হয়েছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হোক। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বিথীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পরিবার, স্বজন ও পরিচিতজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
সিভিল সার্জনের বক্তব্য
এ বিষয়ে ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, বিথী আক্তার ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাই তার চিকিৎসা ও মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষই বিস্তারিত বলতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, জেলার স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চলমান রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবায় যেকোনো ধরনের অবহেলা কঠোরভাবে দমন করা হবে।
এদিকে, বিথী আক্তারের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং সিজারিয়ান অপারেশনের পর পেটে গজ থাকার অভিযোগের সত্যতা উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি আরও জোরালো হয়েছে।























