নজরুল বর্ষ উপলক্ষে ময়মনসিংহে লোকজ সাংস্কৃতিক মেলা
- আপডেট সময় : ০২:৫২:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৩৯ বার পড়া হয়েছে
ময়মনসিংহে বছরব্যাপী নজরুল বর্ষ উদ্যাপনের অংশ হিসেবে আয়োজিত দুদিনব্যাপী লোকজ সাংস্কৃতিক মেলায় পরিবেশিত হয়েছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী গুরু-শিষ্যের পালাগান। দীর্ঘদিন পর এমন আয়োজন ঘিরে নগরীর শিল্পাচার্য জয়নুল উদ্যানের বৈশাখী মঞ্চে দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। পালাগানের সুর ও কথায় মুগ্ধ হন উপস্থিত সংস্কৃতিপ্রেমীরা।
বাঙালির সমৃদ্ধ লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার লক্ষ্যে ময়মনসিংহে শুরু হয়েছে দুদিনব্যাপী লোকজ সাংস্কৃতিক মেলা। বছরব্যাপী নজরুল বর্ষ উদ্যাপনের অংশ হিসেবে জেলা প্রশাসন, ময়মনসিংহ এ মেলার আয়োজন করেছে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর ২০২৬) ছিল মেলার প্রথম দিন। এদিন মেলার অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে পরিবেশিত হয় বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকজ পরিবেশনা ‘পালাগান (গুরু-শিষ্য)’। সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘের শিল্পীরা এই পালাগান পরিবেশন করেন। এতে শিষ্যের ভূমিকায় ছিলেন বাউল মো. হাফিজ উদ্দিন এবং গুরুর ভূমিকায় ছিলেন বাউল স্বদেশ তালুকদার।
বৈশাখী মঞ্চে পালাগানের ঐতিহ্যবাহী আসর
ময়মনসিংহ নগরীর শিল্পাচার্য জয়নুল উদ্যানের বৈশাখী মঞ্চে পালাগানের আসর বসে। আয়োজনের আগে প্রচার-প্রচারণা থাকায় অনুষ্ঠানস্থলে দর্শকদের ব্যাপক সমাগম ঘটে। দীর্ঘদিন পর শহরের মঞ্চে এমন ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনা দেখতে ও শুনতে বিভিন্ন বয়সী মানুষ উপস্থিত হন।
গুরু ও শিষ্যের কথোপকথন, প্রশ্ন-উত্তর এবং গানের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় পালাগানের পরিবেশনা। এতে উঠে আসে জীবনের নানা দর্শন, আধ্যাত্মিক ভাবনা এবং লোকজ জ্ঞান ও বিশ্বাসের বিভিন্ন দিক। পরিবেশনার প্রতিটি পর্বে দর্শকেরা মনোযোগ দিয়ে গান উপভোগ করেন।
উপস্থিত সংস্কৃতিপ্রেমীদের অনেকে বলেন, পালাগান বাংলার নিজস্ব সাংস্কৃতিক সম্পদ। এ ধরনের আয়োজন নিয়মিত করা হলে হারিয়ে যেতে বসা লোকজ ঐতিহ্য আবারও মানুষের কাছে ফিরে আসবে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মও বাংলার শেকড় ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে।
বাংলার লোকজ সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য পালাগান
পালাগান বাংলার লোকজ সংস্কৃতির অন্যতম প্রাচীন ও জনপ্রিয় পরিবেশনা। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে এ গানের বিশেষ জনপ্রিয়তা রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকায় মেলা, উৎসব ও বিশেষ অনুষ্ঠানে পালাগানের আসর বসে।
সাধারণত পৌরাণিক কাহিনি, ঐতিহাসিক ঘটনা, আধ্যাত্মিক দর্শন কিংবা লৌকিক প্রেমগাথাকে কেন্দ্র করে পালাগান পরিবেশিত হয়। একটি নির্দিষ্ট আখ্যান বা কাহিনিকে ভিত্তি করে গানের মাধ্যমে এর বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।
এ পরিবেশনায় সাধারণত দুজন প্রধান গায়েন অংশ নেন। তাঁরা গুরু ও শিষ্যের ভূমিকায় থেকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রশ্নোত্তর, তর্ক ও গানের মাধ্যমে নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন। শরিয়ত-মারফত, আধ্যাত্মিকতা, মানবজীবন এবং নৈতিক দর্শনের নানা বিষয় উঠে আসে তাঁদের গানে।
পালাগানের আসর সাধারণত টপ্পা গান দিয়ে শুরু হয়। এরপর সেই গানের বিষয় ও সুরের সূত্র ধরে মূল পালার কাহিনি এগিয়ে যায়। গানের কথার পাশাপাশি শিল্পীদের তাৎক্ষণিক সংলাপ ও উপস্থাপনাও এ পরিবেশনাকে আকর্ষণীয় করে তোলে।
পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা
একসময় গ্রামবাংলার মানুষের বিনোদন ও সাংস্কৃতিক চর্চার অন্যতম মাধ্যম ছিল পালাগান। গ্রামের হাটবাজার, মেলা কিংবা খোলা মাঠে রাতভর বসত পালাগানের আসর। তবে আধুনিক বিনোদনমাধ্যমের প্রসার এবং নিয়মিত পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পধারা এখন নানা সংকটের মুখে।
বিশেষ করে শহরাঞ্চলে পালাগানের আয়োজন তুলনামূলকভাবে কমে গেছে। গ্রামীণ জনপদে কিছু শিল্পী ও সংগঠনের উদ্যোগে এ চর্চা টিকে থাকলেও নতুন প্রজন্মের মধ্যে এর পরিচিতি ও আগ্রহ বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে লোকজ সাংস্কৃতিক মেলার আয়োজনকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নিয়মিত পৃষ্ঠপোষকতা এবং পরিবেশনার সুযোগ তৈরি করা গেলে পালাগানের মতো ঐতিহ্যবাহী শিল্পধারা টিকিয়ে রাখা সম্ভব।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পালাগান ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যাশা
লোকজ সাংস্কৃতিক মেলায় গুরু-শিষ্যের পালাগান পরিবেশনকারী সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, বাঙালি জাতির রয়েছে সমৃদ্ধ লোকজ সংস্কৃতির বিশাল ভান্ডার। পালাগান সেই ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এ শিল্পধারা হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, আজকের মতো ভবিষ্যতেও প্রশাসন যদি এভাবে লোকজ সংস্কৃতির পাশে দাঁড়ায়, তাহলে পালাগান হারিয়ে যাবে না। বরং এ ঐতিহ্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়বে।
আয়োজকদের এমন উদ্যোগে স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রেমীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। তাঁদের প্রত্যাশা, নজরুল বর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত এ মেলা শুধু বিনোদনের আয়োজন হয়ে থাকবে না; বরং বাংলার হারিয়ে যেতে বসা লোকজ সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও চর্চার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করবে।




















