মাদারগঞ্জে আরও দুই গ্যাসকূপ খননের প্রস্তুতি
- আপডেট সময় : ০৩:৪৭:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৬১ বার পড়া হয়েছে
জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায় দেশের ৩০তম গ্যাসক্ষেত্র ‘জামালপুর-১’-এ গ্যাসের সন্ধান পাওয়ার পর এবার আরও দুটি কূপ খননের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)। নতুন কূপ দুটি খননের স্থান নির্ধারণ ও মাটি পরীক্ষার কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে সংস্থাটি। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ডিসেম্বরে প্রকল্প দুটির অনুমোদন মিলতে পারে।
বাপেক্স সূত্রে জানা গেছে, মাদারগঞ্জে নতুন কূপ দুটি খনন করা হলে ওই অঞ্চলে গ্যাসের মজুত, বাণিজ্যিক সম্ভাবনা ও উত্তোলনযোগ্যতা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত প্রাকৃতিক গ্যাস জাতীয় জ্বালানি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দুটি কূপের নাম জামালপুর-২ ও জামালপুর নর্থ-১
বাপেক্সের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মাদারগঞ্জ উপজেলায় তিনটি কৌশলগত স্থানে গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উপজেলার বালিজুড়ী ইউনিয়নের তারতাপাড়া গ্রামে ‘জামালপুর-১’ কূপে ইতোমধ্যে গ্যাসের সন্ধান মিলেছে। এবার দ্বিতীয় ও তৃতীয় কূপ খননের প্রস্তুতি চলছে।
বাপেক্সের পরিকল্পনা ও আইসিটি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রউফ জানান, নতুন কূপ দুটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘জামালপুর-২’ ও ‘জামালপুর নর্থ-১’। এর মধ্যে একটি কূপে মূল্যায়ন ও উন্নয়ন কার্যক্রম (অ্যাপ্রেইজাল কাম ডেভেলপমেন্ট) এবং অন্যটিতে অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
তিনি জানান, প্রকল্প দুটি বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনে ডিপিপি অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে মাঠপর্যায়ে খননকাজ এগিয়ে নেওয়া হবে। প্রতিটি কূপ ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত খননের পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন কূপ দুটি খননের জন্য মাদারগঞ্জ উপজেলার গুনারীতলা ইউনিয়নের সিংদহ এবং চরপাকেরদহ ইউনিয়নের নব্যচর এলাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে উভয় স্থানে মাটি পরীক্ষার কাজ শেষ হয়েছে।
জামালপুর-১ কূপে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস ৭২০ কোটি ঘনফুট
মাদারগঞ্জের তারতাপাড়া গ্রামে অবস্থিত জামালপুর-১ কূপে প্রায় ১ হাজার ৩০ কোটি ঘনফুট বা ১০ দশমিক ৩ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুত রয়েছে। এর মধ্যে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ প্রায় ৭২০ কোটি ঘনফুট বা ৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ঘনফুট।
বাপেক্সের জামালপুর-১ কূপের ফিল্ড ইনচার্জ বাইজিদ হোসেন জানান, এ কূপ থেকে দৈনিক গড়ে ৪০ থেকে ৫০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে। এই হারে গ্যাস উত্তোলন করা গেলে প্রায় পাঁচ বছর কূপটি থেকে উৎপাদন চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
কূপটি থেকে প্রাপ্ত গ্যাস সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে সরিষাবাড়ী উপজেলার তারাকান্দিতে অবস্থিত যমুনা সার কারখানায় সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। জামালপুর-১ কূপ থেকে কারখানাটির দূরত্ব প্রায় ২৫ কিলোমিটার। এ জন্য পাইপলাইন নির্মাণে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
গ্যাস সরবরাহ শুরু হলে যমুনা সার কারখানার জ্বালানি চাহিদা পূরণে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমানোরও সুযোগ তৈরি হবে।
১৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে খনন করা হয় প্রথম কূপ
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে জামালপুর-১ অনুসন্ধান কূপ খনন করে বাপেক্স। ২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল প্রায় ২ হাজার ৬০০ মিটার গভীরতায় তিনটি স্তরে ড্রিল স্টেম টেস্টের (ডিএসটি) মাধ্যমে খননকাজ সফলভাবে শেষ হয়। পরে একই বছরের ৩১ মে অগ্নি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কূপটিতে গ্যাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। এরপর শুরু হয় পরীক্ষামূলক গ্যাস উত্তোলন।
পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কূপটির ১ হাজার ৪৪১ থেকে ১ হাজার ৪৪৪ মিটার গভীরতায় বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনযোগ্য গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, কূপটিতে গ্যাসের চাপ প্রায় ১ হাজার ১২৪ পিএসআই। দৈনিক ৪০ থেকে ৫০ লাখ ঘনফুট হারে গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব বলে পরীক্ষায় ধারণা পাওয়া গেছে।
বাপেক্সের হিসাব অনুযায়ী, এই গ্যাসের আর্থিক মূল্য সংস্থার নিজস্ব মার্জিনে প্রায় ৮২ কোটি টাকা, ভোক্তাপর্যায়ে প্রায় ৪৬৮ কোটি টাকা এবং সমপরিমাণ গ্যাস এলএনজি আমদানির মাধ্যমে সংগ্রহ করতে হলে ব্যয় হতে পারে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা।
তিন কূপের গ্যাস জাতীয় সঞ্চালন লাইনে যুক্ত করার পরিকল্পনা
জামালপুর-১ কূপ খনন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক জানান, নতুন দুটি কূপে গ্যাসের বাণিজ্যিক উপস্থিতি, মজুতের পরিমাণ ও উত্তোলনযোগ্যতা যাচাই করা হবে। এরপর তিনটি কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলন এবং জাতীয় সঞ্চালন লাইনে সংযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রথম কূপ থেকে দৈনিক গড়ে ৫ মিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন কূপ দুটি খননের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সিভিল ওয়ার্ক শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সংশ্লিষ্টদের আশা, ডিপিপি অনুমোদন ও পরবর্তী কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন হলে মাদারগঞ্জে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের পরিধি বাড়বে। এতে দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি শিল্পকারখানায় জ্বালানি সরবরাহের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে নতুন কূপ দুটিতে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস পাওয়া যাবে কি না, তা খনন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হওয়ার পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।






















