সাফের টিকিটের দাম সর্বনিম্ন ১ হাজার টাকা, ক্ষুব্ধ
- আপডেট সময় : ০২:১২:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৫১ বার পড়া হয়েছে
আগামী ৫ নভেম্বর থেকে ঢাকায় শুরু হচ্ছে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। এই টুর্নামেন্টে হামজা চৌধুরী, জামাল ভূঁইয়াদের খেলা দেখতে দর্শকদের গুনতে হবে কমপক্ষে এক হাজার টাকা। সাধারণ গ্যালারির টিকিটের এই মূল্য নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ফুটবল সমর্থক ও সাবেক ফুটবলাররা। তাঁদের মতে, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় সাধারণ দর্শকদের জন্য এত দামের টিকিট কেনা কঠিন।
সাফ চ্যাম্পিয়নশিপকে ঘিরে দেশের ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জাতীয় দলে হামজা চৌধুরীর অন্তর্ভুক্তির পর বাংলাদেশের ম্যাচ দেখার চাহিদা বেড়েছে। তবে টিকিটের উচ্চমূল্য সেই আগ্রহে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাধারণ গ্যালারির টিকিট এক হাজার টাকা
সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে সাধারণ গ্যালারির টিকিটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে এক হাজার টাকা। অন্যদিকে ক্লাব হাউজ, ভিআইপি ও রেড বক্সের টিকিটের মূল্য আরও কয়েক গুণ বেশি। ফলে সাধারণ দর্শকদের জন্য মাঠে বসে খেলা দেখার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়তে পারে।
জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক জাহিদ হাসান এমিলি টিকিটের এই মূল্যকে বাংলাদেশের বাস্তবতায় অত্যধিক বলে মনে করছেন। নিজে একাধিক সাফ টুর্নামেন্টে খেলা এই সাবেক ফুটবলারের মতে, টিকিটের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে সাধারণ সমর্থকদের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
এমিলি বলেন, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থা এবং ফুটবলপ্রেমীদের আনুষঙ্গিক ব্যয় বিবেচনায় এক হাজার টাকা টিকিটের মূল্য বাস্তবসম্মত নয়। গতকাল থেকেই অনেকে তাঁকে টিকিটের দাম নিয়ে হতাশার কথা জানিয়েছেন।
টিকিটের দাম ৫০০-৬০০ টাকা হলে যৌক্তিক হতো
সাফের সাধারণ সম্পাদক পুরুষোত্তম ক্যাটেল টিকিটের মূল্য নির্ধারণের পেছনে কয়েকটি কারণ তুলে ধরেছেন। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, একটি টিকিটে দুটি ম্যাচ দেখার সুযোগ এবং মার্কেটিং কোম্পানির বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়েই দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নন এমিলি। তাঁর মতে, বাংলাদেশের ম্যাচ ঘিরেই মূলত দর্শকদের আগ্রহ বেশি থাকবে। অন্য ম্যাচগুলোতে একই পরিমাণ দর্শক উপস্থিত হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাছাড়া দুটি ম্যাচের মধ্যে প্রায় আড়াই ঘণ্টার ব্যবধান থাকায় দর্শকদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে।
এমিলির মতে, সাধারণ গ্যালারির টিকিটের দাম ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা নির্ধারণ করা হলে তা দর্শকদের জন্য তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য হতো।
টিকিটের দাম কমানোর দাবি সমর্থকদের
ফুটবলের অন্যতম চালিকাশক্তি সমর্থকরা। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ফুটবল দলকে সমর্থন দিতে বিভিন্ন সমর্থকগোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। এসব গোষ্ঠীর অনেকেই সাফের টিকিটের দাম নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা করছেন।
কয়েকটি সমর্থকগোষ্ঠী টিকিটের মূল্য কমানোর দাবি জানিয়েছে। দাবি পূরণ না হলে বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের কথাও জানিয়েছে তারা।
সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের নয় গোল হজম এবং ফুটবলারদের শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পরও সমর্থকদের একটি অংশ জাতীয় দলের পাশে থাকতে চায়। মাঠে উপস্থিত হয়ে বাংলাদেশ দলের জন্য গলা ফাটানোর আগ্রহ রয়েছে তাদের। কিন্তু টিকিটের উচ্চমূল্য সেই পরিকল্পনায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে সমর্থকদের অভিযোগ।
আগের ম্যাচের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি দাম
হামজা চৌধুরী জাতীয় দলে আসার পর বাংলাদেশের হোম ম্যাচগুলোতে টিকিটের চাহিদা বেড়েছে। এর আগে সিঙ্গাপুর, ভারত ও হংকংয়ের বিপক্ষে এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বের তিনটি ম্যাচে সাধারণ গ্যালারির টিকিটের দাম ছিল ৪০০ টাকা। এবার সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে সেই দাম বেড়ে এক হাজার টাকা হয়েছে।
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) কম্পিটিশন কমিটির চেয়ারম্যান গোলাম গাউসও টিকিটের দাম বেশি বলে মন্তব্য করেছেন। তবে তাঁর বক্তব্য, টিকিটের মূল্য নির্ধারণে বাফুফের সরাসরি ভূমিকা ছিল না।
তিনি জানান, সাফ কর্তৃপক্ষ টিকিটের দাম নির্ধারণ করেছে। এ বিষয়ে বাফুফের কাছে কোনো প্রস্তাব বা মতামতও চাওয়া হয়নি।
টিকিটের দাম নির্ধারণের পেছনে কী কারণ?
টিকিটের মূল্য নিয়ে বিতর্কের মধ্যে উঠে এসেছে সাফ ও বাফুফের মধ্যে আর্থিক সমঝোতার বিষয়টিও। গত কয়েক মাসে টিকিট বিক্রি, স্টেডিয়ামের নিরাপত্তা এবং টুর্নামেন্ট আয়োজনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দুই পক্ষের আলোচনা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সমঝোতার ভিত্তিতে বাফুফে ৫০ লাখ টাকা পাবে এবং টুর্নামেন্টের বাকি খরচ বহন করবে সাফ। এই ব্যবস্থার অংশ হিসেবে মার্কেটিং পার্টনারের মতামতের ভিত্তিতে টিকিটের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সাফের সাবেক সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনও টিকিটের মূল্য নির্ধারণের পেছনে ব্যয়ের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, সাফের নিয়মিত মার্কেটিং পার্টনার স্পোর্টস ফাইভের সঙ্গে চুক্তি না থাকায় নতুন মার্কেটিং পার্টনার নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক স্পন্সর সংগ্রহেও সময় লাগছে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, টুর্নামেন্ট আয়োজনের জন্য মার্কেটিং পার্টনার টিএসএকে বিভিন্ন ব্যয় বিবেচনায় নিতে হয়েছে। এর মধ্যে বাফুফের রয়্যালটি, স্টেডিয়াম ব্যবস্থাপনা, ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) এবং দল ও রেফারিদের যাতায়াতের খরচ রয়েছে। এসব ব্যয় পুষিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যেই টিকিটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।
দর্শক কম হলে ক্ষতির আশঙ্কা
টিকিটের উচ্চমূল্যের কারণে অনেক ফুটবলপ্রেমী ম্যাচ বয়কটের পরিকল্পনা করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দর্শক মাঠে কম উপস্থিত হলে মার্কেটিং পার্টনারের প্রত্যাশিত আয়ও কমে যেতে পারে।
সমর্থকদের একাংশের যুক্তি, টিকিটের দাম ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে রাখলে আরও বেশি দর্শক মাঠে আসতে পারতেন। এতে গ্যালারি পূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ত এবং টিকিট বিক্রি থেকেও ভালো আয় হতে পারত।
তবে সালাউদ্দিনের মতে, টুর্নামেন্ট আয়োজনের বিপুল ব্যয় তুলে আনা সহজ নয়। তিন বছর পর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজন করা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি সফলভাবে টুর্নামেন্ট শেষ করার গুরুত্বের কথাও বলেছেন।
সাফের আয় নিয়ে নতুন হিসাব
আগে পুরুষদের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে সংস্থাটি অন্য টুর্নামেন্ট আয়োজনের ব্যয় মেটাত। কিন্তু স্পোর্টস ফাইভের সঙ্গে চুক্তি বাতিল হওয়ার পর নতুন করে টুর্নামেন্ট আয়োজন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশি মার্কেটিং কোম্পানি টিএসএ টুর্নামেন্টের বিপণনস্বত্ব নিয়েছে। টুর্নামেন্ট পরিচালনার জন্য তারা সাফকে অর্থ দেবে। পাশাপাশি চুক্তি অনুযায়ী বাফুফেও রয়্যালটি পাবে।
অন্যদিকে স্পন্সরশিপ, টিকিট বিক্রি, টেলিভিশন সম্প্রচার এবং মাঠসংক্রান্ত স্বত্ব বিক্রি থেকে আয় করবে টিএসএ।
সব মিলিয়ে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের টিকিটের দাম নির্ধারণে আয়-ব্যয়ের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও সাধারণ দর্শকদের সামর্থ্যের বিষয়টি সামনে এসেছে। এখন টিকিটের মূল্য কমানো হবে কি না, তা নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে আলোচনা চলছে। শেষ পর্যন্ত মাঠে দর্শকদের উপস্থিতি কেমন হয়, সেটিই হবে এই মূল্য নির্ধারণের গ্রহণযোগ্যতা বোঝার অন্যতম বিষয়।





















