০৭:১৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬

বটতলায় শিক্ষার আলো

বাগেরহাট প্রতিনিধি:
  • আপডেট সময় : ০৫:৩৪:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬
  • / ১৫৭৫ বার পড়া হয়েছে
এস. এ টিভি সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বলেশ্বর নদের পাড়ে বিশাল এক বটগাছ। গাছটির ছায়ায় ছোট্ট টিনের ছাউনি। নেই পাকা ভবন, নেই বেঞ্চ-ডেস্ক কিংবা আধুনিক শ্রেণিকক্ষ। তবু প্রতিদিন সকাল হলেই বই-খাতা হাতে সেখানে ছুটে আসে একঝাঁক শিশু। তাদের হাসি, কোলাহল আর শেখার আগ্রহে মুখর হয়ে ওঠে বটতলার ছোট্ট পাঠশালা।

এই পাঠশালার শিক্ষক জহরলাল সরকার। অবসরজীবনে বিশ্রাম না নিয়ে গ্রামের দরিদ্র ও শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের জন্য নিজের উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন ব্যতিক্রমী এই শিক্ষাকেন্দ্র। এবার তাঁর এই মানবিক উদ্যোগের পাশে দাঁড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছে সামাজিক ও মানবিক সংগঠন “দুর্বার উন্নয়ন সংস্থা”।

বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার চরবানিয়ারী রানাপাড়া গ্রামে পাঠশালাটির অবস্থান। এখানে প্রায় ৩০ জন প্রাক্‌-প্রাথমিক শিক্ষার্থীকে সম্পূর্ণ বিনা বেতনে পাঠদান করছেন জহরলাল সরকার। পাঠদানের পাশাপাশি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী শিশুদের খাতা, কলমসহ বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণও দিয়ে থাকেন তিনি।

জহরলাল সরকার ২০২২ সালে নাজিরপুর উপজেলার মাটিভাঙ্গা ডিগ্রি কলেজ থেকে অবসর নেন। তবে অবসরের পর থেমে থাকেননি। গ্রামের শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার ভাবনা থেকে ২০২৩ সালে বটগাছের নিচে শুরু করেন এই পাঠশালা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রানাপাড়া গ্রামের অধিকাংশ পরিবার আর্থিকভাবে অসচ্ছল। গ্রামের নিকটতম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে। দীর্ঘদিন এলাকায় কোনো পাঠশালা না থাকায় অনেক শিশুই প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বিশেষ করে ছোট শিশুদের দূরের বিদ্যালয়ে পাঠানো অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়ত।

সেই বাস্তবতায় জহরলাল সরকারের উদ্যোগটি গ্রামের মানুষের কাছে আশার আলো হয়ে উঠেছে।

তবে পাঠশালাটি পরিচালনায় রয়েছে নানা সংকট। বটগাছের নিচে নির্মিত টিনের ছাউনিটি খুবই সাধারণ। সামান্য বৃষ্টি হলেই ছাউনির বিভিন্ন জায়গা দিয়ে পানি পড়ে। তখন পাঠদান বন্ধ করে শিশুদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে হয়। বর্ষাকালে কাঁচা রাস্তা কাদায় ভরে যাওয়ায় ছোট শিক্ষার্থীদের পাঠশালায় আসাও কষ্টকর হয়ে ওঠে।

জহরলাল সরকার বলেন, আমি চাই, গ্রামের কোনো শিশুই যেন শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত না হয়। যত দিন পারি, তাদের পাশে থেকে শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করে যাব। তবে এই পাঠশালাটি টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার সহযোগিতা প্রয়োজন।

পাঠশালার শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা উপকরণ এবং পাঠশালার প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সহায়তার আবেদন জানানো হয়েছে দুর্বার উন্নয়ন সংস্থার কাছে।

এ বিষয়ে দুর্বার উন্নয়ন সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, জহরলাল সরকারের এই উদ্যোগ শুধু একটি পাঠশালা নয়; এটি শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ার একটি মানবিক প্রচেষ্টা। একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নিজের সময়, শ্রম ও সামর্থ্য দিয়ে শিশুদের শিক্ষার আলো পৌঁছে দিচ্ছেন—এটি সত্যিই অনুকরণীয়।

তিনি আরও বলেন, দুর্বার উন্নয়ন সংস্থা সব সময় শিক্ষা, মানবিক উন্নয়ন ও সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে কাজ করার চেষ্টা করে। আমাদের সামর্থ্য ও সাংগঠনিক সক্ষমতার মধ্যে এই পাঠশালার শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার বিষয়ে আমরা ইতিবাচকভাবে কাজ করব।

দুর্বার উন্নয়ন সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এলাকার সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে স্থানীয়ভাবে প্রয়োজন নিরূপণ করে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ এবং পাঠশালার পরিবেশ উন্নয়নে সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।

স্থানীয়রা মনে করছেন, সরকারি প্রতিষ্ঠান, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এগিয়ে এলে বটতলার এই ছোট্ট পাঠশালাটি আরও কার্যকরভাবে পরিচালিত হবে। একই সঙ্গে গ্রামের আরও অনেক শিশুর শিক্ষার সুযোগ তৈরি হবে।

শিক্ষাক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রবীণ দিবসে কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (কোডেক)-এর সহযোগিতায় জহরলাল সরকার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

বটগাছের ছায়ায় বসে শিশুদের হাতে অক্ষর তুলে দিচ্ছেন এক প্রবীণ শিক্ষক। আর সেই আলোর পথকে আরও এগিয়ে নিতে পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিচ্ছে দুর্বার উন্নয়ন সংস্থা।

বড় কোনো ভবন নেই, নেই আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। আছে একজন শিক্ষকের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, শিশুদের শেখার আগ্রহ এবং সমাজের কিছু মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যয়। এই তিনের মিলনেই বটতলার ছোট্ট পাঠশালাটি হয়ে উঠতে পারে গ্রামের শিশুদের বড় স্বপ্নের ঠিকানা।

এস. এ টিভি সমন্ধে

SATV (South Asian Television) is a privately owned ‘infotainment’ television channel in Bangladesh. It is the first ever station in Bangladesh using both HD and 3G Technology. The channel is owned by SA Group, one of the largest transportation and real estate groups of the country. SATV is the first channel to bring ‘Idol’ franchise in Bangladesh through Bangladeshi Idol.

যোগাযোগ

বাড়ী ৪৭, রাস্তা ১১৬,
গুলশান-১, ঢাকা-১২১২,
বাংলাদেশ।
ফোন: +৮৮ ০২ ৯৮৯৪৫০০
ফ্যাক্স: +৮৮ ০২ ৯৮৯৫২৩৪
ই-মেইল: info@satv.tv
ওয়েবসাইট: www.satv.tv

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৩। বাড়ী ৪৭, রাস্তা ১১৬, গুলশান-১, ঢাকা-১২১২, বাংলাদেশ। ফোন: +৮৮ ০২ ৯৮৯৪৫০০, ফ্যাক্স: +৮৮ ০২ ৯৮৯৫২৩৪

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

বটতলায় শিক্ষার আলো

আপডেট সময় : ০৫:৩৪:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

বলেশ্বর নদের পাড়ে বিশাল এক বটগাছ। গাছটির ছায়ায় ছোট্ট টিনের ছাউনি। নেই পাকা ভবন, নেই বেঞ্চ-ডেস্ক কিংবা আধুনিক শ্রেণিকক্ষ। তবু প্রতিদিন সকাল হলেই বই-খাতা হাতে সেখানে ছুটে আসে একঝাঁক শিশু। তাদের হাসি, কোলাহল আর শেখার আগ্রহে মুখর হয়ে ওঠে বটতলার ছোট্ট পাঠশালা।

এই পাঠশালার শিক্ষক জহরলাল সরকার। অবসরজীবনে বিশ্রাম না নিয়ে গ্রামের দরিদ্র ও শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের জন্য নিজের উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন ব্যতিক্রমী এই শিক্ষাকেন্দ্র। এবার তাঁর এই মানবিক উদ্যোগের পাশে দাঁড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছে সামাজিক ও মানবিক সংগঠন “দুর্বার উন্নয়ন সংস্থা”।

বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার চরবানিয়ারী রানাপাড়া গ্রামে পাঠশালাটির অবস্থান। এখানে প্রায় ৩০ জন প্রাক্‌-প্রাথমিক শিক্ষার্থীকে সম্পূর্ণ বিনা বেতনে পাঠদান করছেন জহরলাল সরকার। পাঠদানের পাশাপাশি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী শিশুদের খাতা, কলমসহ বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণও দিয়ে থাকেন তিনি।

জহরলাল সরকার ২০২২ সালে নাজিরপুর উপজেলার মাটিভাঙ্গা ডিগ্রি কলেজ থেকে অবসর নেন। তবে অবসরের পর থেমে থাকেননি। গ্রামের শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার ভাবনা থেকে ২০২৩ সালে বটগাছের নিচে শুরু করেন এই পাঠশালা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রানাপাড়া গ্রামের অধিকাংশ পরিবার আর্থিকভাবে অসচ্ছল। গ্রামের নিকটতম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে। দীর্ঘদিন এলাকায় কোনো পাঠশালা না থাকায় অনেক শিশুই প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বিশেষ করে ছোট শিশুদের দূরের বিদ্যালয়ে পাঠানো অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়ত।

সেই বাস্তবতায় জহরলাল সরকারের উদ্যোগটি গ্রামের মানুষের কাছে আশার আলো হয়ে উঠেছে।

তবে পাঠশালাটি পরিচালনায় রয়েছে নানা সংকট। বটগাছের নিচে নির্মিত টিনের ছাউনিটি খুবই সাধারণ। সামান্য বৃষ্টি হলেই ছাউনির বিভিন্ন জায়গা দিয়ে পানি পড়ে। তখন পাঠদান বন্ধ করে শিশুদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে হয়। বর্ষাকালে কাঁচা রাস্তা কাদায় ভরে যাওয়ায় ছোট শিক্ষার্থীদের পাঠশালায় আসাও কষ্টকর হয়ে ওঠে।

জহরলাল সরকার বলেন, আমি চাই, গ্রামের কোনো শিশুই যেন শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত না হয়। যত দিন পারি, তাদের পাশে থেকে শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করে যাব। তবে এই পাঠশালাটি টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার সহযোগিতা প্রয়োজন।

পাঠশালার শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা উপকরণ এবং পাঠশালার প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সহায়তার আবেদন জানানো হয়েছে দুর্বার উন্নয়ন সংস্থার কাছে।

এ বিষয়ে দুর্বার উন্নয়ন সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, জহরলাল সরকারের এই উদ্যোগ শুধু একটি পাঠশালা নয়; এটি শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ার একটি মানবিক প্রচেষ্টা। একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নিজের সময়, শ্রম ও সামর্থ্য দিয়ে শিশুদের শিক্ষার আলো পৌঁছে দিচ্ছেন—এটি সত্যিই অনুকরণীয়।

তিনি আরও বলেন, দুর্বার উন্নয়ন সংস্থা সব সময় শিক্ষা, মানবিক উন্নয়ন ও সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে কাজ করার চেষ্টা করে। আমাদের সামর্থ্য ও সাংগঠনিক সক্ষমতার মধ্যে এই পাঠশালার শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার বিষয়ে আমরা ইতিবাচকভাবে কাজ করব।

দুর্বার উন্নয়ন সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এলাকার সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে স্থানীয়ভাবে প্রয়োজন নিরূপণ করে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ এবং পাঠশালার পরিবেশ উন্নয়নে সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।

স্থানীয়রা মনে করছেন, সরকারি প্রতিষ্ঠান, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এগিয়ে এলে বটতলার এই ছোট্ট পাঠশালাটি আরও কার্যকরভাবে পরিচালিত হবে। একই সঙ্গে গ্রামের আরও অনেক শিশুর শিক্ষার সুযোগ তৈরি হবে।

শিক্ষাক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রবীণ দিবসে কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (কোডেক)-এর সহযোগিতায় জহরলাল সরকার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

বটগাছের ছায়ায় বসে শিশুদের হাতে অক্ষর তুলে দিচ্ছেন এক প্রবীণ শিক্ষক। আর সেই আলোর পথকে আরও এগিয়ে নিতে পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিচ্ছে দুর্বার উন্নয়ন সংস্থা।

বড় কোনো ভবন নেই, নেই আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। আছে একজন শিক্ষকের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, শিশুদের শেখার আগ্রহ এবং সমাজের কিছু মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যয়। এই তিনের মিলনেই বটতলার ছোট্ট পাঠশালাটি হয়ে উঠতে পারে গ্রামের শিশুদের বড় স্বপ্নের ঠিকানা।