প্রতিবন্ধী সেবা প্রকল্পে শেখ মোতালিবের বিরুদ্ধে নারী হয়রানির অভিযোগ
- আপডেট সময় : ০৫:৪০:১১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬
- / ১৬৩৩ বার পড়া হয়েছে
নিজের তত্বাবধানে থাকা বিভাগকে সম্পূর্ণ ব্যাক্তিগত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করে রাজত্ব গড়েছেন সরকারি কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ মোতালিব! প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, প্রকল্পে আত্মীয়করণ, নিয়োগ বাণিজ্য, প্রকল্প ব্যয়ের অর্থ আত্মসাৎ, একাধিক নারী সহকর্মীকে যৌন হয়রানিসহ নানা লোমহর্ষক অভিযোগের বোঝা নিয়ে লুকোচুরি খেলায় মেতে আছেন প্রতিবন্ধী সেবা নিশ্চিতে সরকারি প্রকল্প হরিলুটের দলনেতা হিসেবে পরিচিতি পাওয়া মোতালিব।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রনালয়ের অধিনে থাকা জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের উপপরিচালক এবং “অটিজম ও এনডিডি সেবাদান কেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনা” প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) হিসেবে কাজ করে আসছিলেন শেখ মোহাম্মদ মোতালিব।
অটিজম ও এনডিডি সেবাদান কেন্দ্র প্রকল্পের একাধিক নারী কর্মকর্তাকে ধারাবাহিক ভাবে অনৈতিক প্রস্তাব, যৌন হয়রানি ও প্রশাসনিকভাবে হয়রানি করার অভিযোগের প্রেক্ষিতে শেখ মোহাম্মদ মোতালিবকে নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় গত ১৯ জুলাই।
দাপ্তরিক পত্রের সুত্র মতে, মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ সেলিম হোসেন সাক্ষরিত অফিস আদেশে মোতালিবকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তিনি এই প্রকল্পের প্রশাসন ও অর্থ শাখার উপপরিচালক হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
অভিযোগকারী নারী কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মোতালিবের শক্তপোক্ত সিন্ডিকেটের কারণে বর্তমানে তারা সুষ্ঠু তদন্ত ও সঠিক বিচার পাওয়ার বিষয়ে সন্ধিহান রয়েছেন।
জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মোহাম্মদ সেলিম হোসেন বলেন, নিয়মিত তদন্ত কাজ চলছে, তবে আমি এবিষয়ে অতটা জানিনা।
শেখ মোতালিবের বিরুদ্ধে পাওয়া ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম ও নারী হেনস্থার মতো বিভিন্ন অভিযোগে তদন্ত চলছে জানিয়ে তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব, উক্ত মন্ত্রনালয়ের উপ-সচিব রবিউল ইসলাম বলেন, শেখ মোহাম্মদ মোতালিবের বিরুদ্ধে নানামুখী অভিযোগ, সবগুলোর তদন্ত চলছে। আশা করছি কিছুদিনের মধ্যে আরও কয়েকটি শুনানীর মাধ্যমে তদন্ত শেষ হবে।
শেখ মোহাম্মদ মোতালিবের বিরুদ্ধে প্রকল্পে দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য ও নিয়োগে আত্মীয়করণে প্রসঙ্গে ওঠা অভিযোগের প্রেক্ষিতে জানা গেছে, শেখ মোতালিব তার অন্তত ২৫ জন নিকটাত্মীয়কে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দিয়েছেন। সরকারি প্রকল্পে এমন নিয়োগ প্রশ্নবিদ্ধ বলে দাবি করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। অভিযোগ রয়েছে, দুর্নীতির সুবিধাজনক সিন্ডিকেট গড়ে তুলে প্রকল্পের অধিকাংশ অর্থ আত্মসাৎ করার জন্যেই তিনি গড়ে তুলেছেন এমন দলবল।
স্ত্রীর আপন চার বোন, এক ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, ভাইয়ের স্ত্রীর ভাই-বোন, বন্ধু সহপাঠী স্বজনদের নিয়েই শেখ মোতালিবের দুর্নীতির মহা আয়োজন।
শেখ মোতালিবের আত্মীয়স্বজনদের অনেকের সাথেই প্রতিবেদকের কথা হয়, এবং জাতীয় পরিচয় পত্রের তথ্যমতেও আত্মীয়তার প্রমাণ মিলেছে। তবে আত্মীয়দের কেউ-কেউ পরিচয় অস্বীকার করেন এবং কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ থাকেন।
এছাড়াও শেখ মোহাম্মদ মোতালিবের বিরুদ্ধে প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—প্রকল্পে জনবল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশ করে নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি-কোটি টাকা আত্মসাৎ। নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্পের বিভিন্ন কাজের টেন্ডার পাইয়ে দেওয়া, কেন্দ্রভিত্তিক শিশুদের টিফিন বাবদ বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ, শিশুদের অ্যাক্টিভিটিজ অব ডেইলি লিভিং প্রশিক্ষণের বরাদ্দ আত্মসাৎ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বার্ষিক প্রশিক্ষণ বাবদ বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ, এনডিডি ব্যক্তির পিতামাতার কর্মসংস্থানের জন্য বিশেষ অনুদানের বরাদ্দ আত্মসাৎ, কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ক্রয়ের মাধ্যমে মোটা অংকের অর্থ আত্মসাৎ ইত্যাদি।
এসব অভিযোগ বিভিন্ন পত্র মারফত উর্ধতন দপ্তরেও জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। বিভিন্ন ব্যাক্তি দুর্নীতি দমন কমিশন এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রনালয়ে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন এই মোতালিবের বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২২ সালের এপ্রিলে প্রথম পর্যায়ে ১৪টি ‘অটিজম ও এনডিডি সেবাদান কেন্দ্র’ স্থাপন করে অটিজম ও এনডিডি সেবাদান কেন্দ্র প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। উচ্চ অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২২ সালের এপ্রিল মাস থেকে বর্তামান সময় পর্যন্ত বাস্তবায়নাধীন। সম্পূর্ণ সরকারি খরচে এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪৯৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল, অটিজম ও এনডিডি বৈশিষ্টসম্পন্ন শিশু ও ব্যক্তিদের জীবনচক্রের বিভিন্ন ধাপে মাল্টি-ডিসিপ্লিনারি টিম দ্বারা প্রকল্প এলাকার প্রায় এক লাখ অটিজমসহ অন্যান্য এনডিডি শিশু ও ব্যক্তির জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রতিবন্ধিতার মাত্রা ও ধরন অনুযায়ী বয়সভিত্তিক প্রয়োজনমাফিক ১৭ ধরনের সেবা প্রদান। এসব সেবার মধ্যে রয়েছে—ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ থেরাপি, সাইকোথেরাপি, গ্রুপথেরাপি, সাইকো সোশ্যাল কাউন্সিলিং বা কাউন্সিলিং সেবা, সহায়ক উপকরণ বিতরণ, চিকিৎসাসেবা প্রদান, ঔষধ বিতরণ, সিবিআর (কমিউনিটি বেইজড রিহ্যাবিলিটেশন) অ্যাপ্রোচে সেবা প্রদান, অ্যাক্টিভিটিস অব ডেইলি লিভিং বিষয়ক প্রশিক্ষণ, এনডিডি ব্যক্তির জন্য আয়বর্ধক কার্যক্রম বিষয়ক প্রশিক্ষণ, এনডিডি ব্যক্তির মা-বাবার কর্মসংস্থান, এনডিডি ব্যক্তির প্রতিভা অন্বেষণ ও লালনসহ পুরস্কার প্রদান, প্রতিবন্ধীদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল গঠন করে দলীয় কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন, সেবা কেন্দ্রভিত্তিক প্রতিবন্ধী বা এনডিডি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কমিটি ও কমিটিভিত্তিক কার্যক্রম ইত্যাদি।
অটিজম ও এনডিডি সেবাদান কেন্দ্র শীর্ষক প্রকল্প ও নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্টের পরিচালক মুছাম্মৎ শাহীনা আক্তার বলেন– অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা সকল অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে সব জানা যাবে।
৫শ’ কোটির প্রকল্পের অধিকাংশ অর্থ অভিযুক্ত কর্মকর্তা মোতালিব ও তার ছত্রছায়ায় থাকা বিগত সরকারের সিন্ডিকেট আত্মসাৎ করায় প্রতিবন্ধীদের জীবনমান উন্নয়নের এই প্রকল্পে সুফল আসেনি বলে জানিয়েছেন একাধিক অভিযোগকারী। তাদের অভিযোগ, বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের সহযোগিতায় তিনি এই প্রকল্পের অর্থ লুটপাটের রাম-রাজত্ব কায়েম করেছিলেন শেখ মোতালিব। দপ্তরের বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে নিয়ম ভেঙ্গে নিজের ব্যাক্তিগত প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি করারও রেকর্ড রয়েছে শেখ মোতালিবের।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট অন্য একটি সূত্র গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, নথিপত্র এবং অন্যান্য প্রমাণ সংগ্রহ ও পর্যালোচনার কাজ চলছে। শুনানী চলছে। উপযুক্ত নিয়মেই তদন্ত কার্যক্রম চলবে এবং দোষ প্রমাণিত হলে নিয়মানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে সুত্রটি দাবি করে, তদন্ত কমিটিতে থাকা সদস্য মোতালিবের অপরাধ ও লুটতরাজ ঢাকতে মরিয়ে হয়ে উঠেছেন।
অভিযুক্ত কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ মোতালিবের কাছে এসংক্রান্ত বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বক্তব্য জানাবেন বলেও আর জানাননি। একাধিকবার ফোন কল ও ক্ষুদেবার্তা পাঠালেও প্রতিত্তোর করেননি অভিযুক্ত কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ মোতালিব।


























