ফুটবলের সবচেয়ে দামি ১৫ দলবদল: কে সফল?
- আপডেট সময় : ১২:৪৭:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৫২৬ বার পড়া হয়েছে
ফুটবলের দলবদলের বাজারে অর্থের অঙ্ক প্রতিনিয়ত নতুন রেকর্ড গড়ছে। ২০২৬ সালের গ্রীষ্মকালীন দলবদলেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বিশেষ করে প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলো এবার বিপুল অর্থ খরচ করেছে।
২ সেপ্টেম্বর ইউরোপের বড় লিগগুলোর দলবদলের বাজার বন্ধ হওয়ার পর সর্বোচ্চ ট্রান্সফার ফি’র তালিকায়ও এসেছে পরিবর্তন। ম্যানচেস্টার সিটিতে চেলসি থেকে এনজো ফার্নান্দেজের ১৪৫ মিলিয়ন ইউরোর দলবদল এখন আলেকজান্ডার ইসাকের সঙ্গে যৌথভাবে প্রিমিয়ার লিগের সর্বোচ্চ।
তবে বড় অঙ্কের দলবদল মানেই মাঠে সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়। কেউ প্রত্যাশা পূরণ করেছেন, কেউ আবার চোট, ফর্ম কিংবা মানিয়ে নিতে না পারার কারণে হারিয়ে গেছেন। ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ১৫টি দলবদল এক নজরে—
১. নেইমার — বার্সেলোনা থেকে পিএসজি, ২২২ মিলিয়ন ইউরো
২০১৭ সালে বার্সেলোনা ছেড়ে পিএসজিতে যোগ দেন নেইমার। তাকে পেতে ২২২ মিলিয়ন ইউরো খরচ করে ফরাসি ক্লাবটি। এখনো এটিই ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্রান্সফার ফি।
পিএসজির হয়ে ঘরোয়া ফুটবলে একাধিক সাফল্য পেলেও নেইমার ক্লাবটিকে চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতাতে পারেননি। চোটও তার ক্যারিয়ারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ২০২০ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে উঠেও বায়ার্ন মিউনিখের কাছে হেরে যায় পিএসজি।
২. কিলিয়ান এমবাপ্পে — মোনাকো থেকে পিএসজি, ১৮০ মিলিয়ন ইউরো
২০১৭ সালে মোনাকো থেকে পিএসজিতে যোগ দিয়ে দ্রুতই দলের প্রধান তারকায় পরিণত হন এমবাপ্পে। প্যারিসের ক্লাবটির হয়ে অসংখ্য গোল ও শিরোপা জিতেছেন তিনি।
পিএসজির সর্বকালের অন্যতম সেরা গোলদাতা হিসেবেও জায়গা করে নেন ফরাসি তারকা। তবে দীর্ঘ সময় চেষ্টা করেও ক্লাবটির হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার স্বপ্ন পূরণ করতে পারেননি।
৩. উসমান দেম্বেলে — ডর্টমুন্ড থেকে বার্সেলোনা, ১৪৮ মিলিয়ন ইউরো
বার্সেলোনায় যাওয়ার সময় দেম্বেলেকে ঘিরে ছিল বিপুল প্রত্যাশা। কিন্তু ক্যাম্প ন্যুতে তার শুরুটা সহজ হয়নি। বারবার চোটে পড়ায় ছন্দ ধরে রাখতে পারেননি ফরাসি উইঙ্গার।
পরে পিএসজিতে গিয়ে অবশ্য নিজের ক্যারিয়ার নতুনভাবে গড়ে তোলেন দেম্বেলে। লুইস এনরিকের অধীনে তার পারফরম্যান্সের বড় উন্নতি হয়। শেষ পর্যন্ত ব্যালন ডি’অরও জেতেন তিনি।
৪. এনজো ফার্নান্দেজ — চেলসি থেকে ম্যানচেস্টার সিটি, ১৪৫ মিলিয়ন ইউরো
২০২৬ সালের দলবদলের সবচেয়ে বড় চমক এনজো ফার্নান্দেজের ম্যানচেস্টার সিটিতে যাওয়া। চেলসি থেকে আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডারকে পেতে সিটি খরচ করেছে ১৪৫ মিলিয়ন ইউরো বা ১২৫ মিলিয়ন পাউন্ড। এটি প্রিমিয়ার লিগের যৌথ সর্বোচ্চ ট্রান্সফার ফি।
২০২৩ সালে বেনফিকা থেকে ১২১ মিলিয়ন ইউরোতে চেলসিতে আসার পর ১৭০ ম্যাচে ৩১ গোল ও ৩০টি অ্যাসিস্ট করেছেন এনজো। এবার ম্যানচেস্টার সিটিতে তার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ।
৫. আলেকজান্ডার ইসাক — নিউক্যাসল থেকে লিভারপুল, ১৪৫ মিলিয়ন ইউরো
২০২৫ সালের গ্রীষ্মে নিউক্যাসল থেকে লিভারপুলে যোগ দেন আলেকজান্ডার ইসাক। তার জন্য খরচ হয় ১৪৫ মিলিয়ন ইউরো।
নিউক্যাসলে নিজেকে ইউরোপের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পর অ্যানফিল্ডে নতুন অধ্যায় শুরু করেন সুইডিশ ফরোয়ার্ড। ২০২৬ সালে এনজো ফার্নান্দেজের দলবদল পর্যন্ত এটিই ছিল প্রিমিয়ার লিগের সর্বোচ্চ ট্রান্সফার ফি।
৬. মরগান রজার্স — অ্যাস্টন ভিলা থেকে চেলসি, ১৩৭ মিলিয়ন ইউরো
অ্যাস্টন ভিলায় দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর ২০২৬ সালে চেলসিতে যোগ দেন মরগান রজার্স। তার জন্য চেলসির খরচ প্রায় ১৩৭ মিলিয়ন ইউরো বা ১১৭ মিলিয়ন পাউন্ড।
বড় অঙ্কের এই দলবদলের পর এখন প্রশ্ন, ভিলার পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা স্ট্যামফোর্ড ব্রিজেও ধরে রাখতে পারবেন কি না।
৭. এলিয়ট অ্যান্ডারসন — নটিংহাম ফরেস্ট থেকে ম্যানচেস্টার সিটি, ১৩৫ মিলিয়ন ইউরো
নটিংহাম ফরেস্টে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দেন ইংলিশ মিডফিল্ডার এলিয়ট অ্যান্ডারসন।
তার জন্য সিটি খরচ করেছে প্রায় ১৩৫ মিলিয়ন ইউরো। মিডফিল্ডের বিভিন্ন পজিশনে খেলার সক্ষমতার কারণে তাকে ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
৮. ব্র্যাডলি বারকোলা — পিএসজি থেকে লিভারপুল, ১২৫ মিলিয়ন ইউরো
২০২৬ সালে পিএসজি থেকে লিভারপুলে যোগ দেন ব্র্যাডলি বারকোলা। ফরাসি উইঙ্গারকে পেতে প্রাথমিকভাবে লিভারপুলের খরচ হয়েছে ১২৫ মিলিয়ন ইউরো।
পিএসজির হয়ে টানা দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ে অবদান রাখা বারকোলাকে লিভারপুলের ভবিষ্যৎ আক্রমণভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
৯. ইয়ান দিয়োমান্দে — আরবি লাইপজিগ থেকে রিয়াল মাদ্রিদ, ১২৫ মিলিয়ন ইউরো
বুন্দেসলিগায় দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর আলোচনায় আসেন আইভরি কোস্টের তরুণ উইঙ্গার ইয়ান দিয়োমান্দে।
২০২৬ সালে তাকে দলে ভেড়ায় রিয়াল মাদ্রিদ। দলবদলের প্রাথমিক ফি প্রায় ১২৫ মিলিয়ন ইউরো। নতুন ‘গ্যালাকটিকো’ হিসেবে দিয়োমান্দের ওপর এখন বড় প্রত্যাশা।
১০. ফিলিপে কুতিনহো — লিভারপুল থেকে বার্সেলোনা, ১৩৫ মিলিয়ন ইউরো
লিভারপুলে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর ২০১৮ সালে বার্সেলোনায় যোগ দেন কুতিনহো। তার দলবদলে ১৩৫ মিলিয়ন ইউরো পর্যন্ত খরচ করে কাতালান ক্লাবটি।
কিন্তু লিভারপুলের সেই দুর্দান্ত কুতিনহোকে বার্সেলোনায় খুব বেশি দেখা যায়নি। ধারে বায়ার্ন মিউনিখ ও অ্যাস্টন ভিলায় খেলার পর ২০২২ সালে স্থায়ীভাবে ক্লাব ছাড়েন তিনি।
১১. জোয়াও ফেলিক্স — বেনফিকা থেকে আতলেতিকো মাদ্রিদ, ১২৭ মিলিয়ন ইউরো
বেনফিকায় দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর ২০১৯ সালে ফেলিক্সকে দলে নেয় আতলেতিকো মাদ্রিদ। তাকে পেতে প্রায় ১২৭ মিলিয়ন ইউরো খরচ করে স্প্যানিশ ক্লাবটি।
তবে দিয়েগো সিমিওনের কৌশলের সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারেননি পর্তুগিজ ফরোয়ার্ড। পরে বার্সেলোনা, চেলসি ও এসি মিলানে ধারে খেলেছেন। ২০২৫ সালে যোগ দেন আল নাসরে।
১২. জুড বেলিংহাম — ডর্টমুন্ড থেকে রিয়াল মাদ্রিদ, ১২৭ মিলিয়ন ইউরো
রিয়াল মাদ্রিদে গিয়ে বড় ট্রান্সফার ফি’র চাপকে উল্টো শক্তিতে পরিণত করেছেন বেলিংহাম। প্রথম মৌসুমেই অসাধারণ পারফরম্যান্সে দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে ওঠেন ইংলিশ মিডফিল্ডার।
গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে গোল এবং মাঝমাঠে প্রভাব বিস্তার করে রিয়ালের চ্যাম্পিয়নস লিগ ও ঘরোয়া সাফল্যে বড় ভূমিকা রাখেন তিনি।
১৩. ফ্লোরিয়ান ভির্টজ — লেভারকুসেন থেকে লিভারপুল, ১২৫ মিলিয়ন ইউরো
লেভারকুসেনের ঐতিহাসিক বুন্দেসলিগা জয়ে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ফ্লোরিয়ান ভির্টজের। তার পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হয়ে ইউরোপের বড় ক্লাবগুলো আগ্রহ দেখায়।
শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালে লিভারপুলে যোগ দেন জার্মান মিডফিল্ডার। তবে অ্যানফিল্ডে তার শুরুটা এখনো প্রত্যাশামতো সহজ হয়নি।
১৪. এনজো ফার্নান্দেজ — বেনফিকা থেকে চেলসি, ১২১ মিলিয়ন ইউরো
কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার শিরোপাজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার পর এনজো ফার্নান্দেজকে দলে নেয় চেলসি। ২০২৩ সালে বেনফিকা থেকে তাকে আনতে প্রায় ১২১ মিলিয়ন ইউরো খরচ করে ক্লাবটি।
শুরুর দিকে মানিয়ে নিতে সময় লাগলেও পরে চেলসির মাঝমাঠের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে ওঠেন তিনি। ২০২৬ সালে ম্যানচেস্টার সিটিতে যাওয়ার আগে চেলসির হয়ে ১৭০ ম্যাচ খেলেন এনজো।
১৫. এডেন হ্যাজার্ড — চেলসি থেকে রিয়াল মাদ্রিদ, ১২১ মিলিয়ন ইউরো
চেলসির হয়ে দীর্ঘ সময় দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর ২০১৯ সালে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন হ্যাজার্ড। তাকে ঘিরে ছিল নতুন ‘গ্যালাকটিকো’ হওয়ার প্রত্যাশা।
কিন্তু চোট ও ফর্মহীনতায় সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। রিয়ালের হয়ে লা লিগায় ৫৪ ম্যাচ খেলে মাত্র চার গোল করেন বেলজিয়ান তারকা। শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে ফুটবলকে বিদায় জানান তিনি।
বড় অঙ্ক, বড় ঝুঁকি
২০২৬ সালের দলবদল আবারও দেখিয়েছে, ফুটবলে অর্থের অঙ্ক কত দ্রুত বদলে যাচ্ছে। শুধু প্রিমিয়ার লিগেই গ্রীষ্মকালীন দলবদলে ৩.৪ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি খরচ হয়েছে।
তবে রেকর্ড ট্রান্সফার ফি সব সময় রেকর্ড সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। নেইমার, কুতিনহো ও হ্যাজার্ডের মতো তারকারা প্রত্যাশার চাপ সামলাতে পারেননি। আবার বেলিংহামের মতো কেউ কেউ সেই চাপকেই সাফল্যের শক্তিতে পরিণত করেছেন।
ফুটবলের বাজারে তাই একটি বিষয়ই নিশ্চিত—একজন খেলোয়াড়ের দাম যতই আকাশছোঁয়া হোক, মাঠে তার ভবিষ্যৎ কখনোই আগেভাগে লেখা থাকে না।





















