৩৬ বছরের শিক্ষকতা শেষে অবসরে মেরিনা জাহান: গ্রামের শিশুদের স্বপ্ন দেখানো এক আলোকযাত্রার গল্প
- আপডেট সময় : ০৫:২৭:২০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬
- / ১৬৬৯ বার পড়া হয়েছে
বিদায়ের মুহূর্ত সাধারণত বিষাদের। কিন্তু কিছু বিদায় থাকে, যা অশ্রুর ভেতরেও আনন্দ, গর্ব আর কৃতজ্ঞতার এক অনন্য অনুভূতি ছড়িয়ে দেয়। বগুড়ার শাহজাহানপুর উপজেলার ভান্ডার পাইকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মেরিনা জাহান-এর বিদায় ছিল ঠিক তেমনই এক বিরল মুহূর্ত।
৪ আগস্ট ২০২৬। বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে ছিল না কোনো উৎসব, তবুও উৎসবের আবহ। ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের হাতে ছিল ফুল, চোখে ছিল অশ্রু, মুখে ছিল প্রিয় ‘ম্যাডাম’-কে হারানোর বেদনা। কেউ ফুল দিয়ে জড়িয়ে ধরেছে, কেউ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকেছে, কেউ আবার কান্না লুকাতে পারেনি। ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠেছিল পুরো বিদ্যালয় চত্বর। একজন শিক্ষকের প্রতি শিশুদের এমন অকৃত্রিম ভালোবাসা উপস্থিত সবাইকে আবেগাপ্লুত করে তোলে।
দীর্ঘ ৩৬ বছরের শিক্ষকতা জীবনের সমাপ্তি ঘটল মেরিনা জাহানের। তবে এটি শুধু একজন সরকারি কর্মচারীর অবসর গ্রহণ ছিল না; এটি ছিল এমন একজন শিক্ষকের প্রতি হাজারো শিশুর ভালোবাসার প্রকাশ। যিনি তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে গ্রামের অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের হাতে তুলে দিয়েছেন শিক্ষার আলো, স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন, মানুষ হওয়ার পাঠ দিয়েছেন।
প্রায় এক দশক ধরে ভান্ডার পাইকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিদ্যালয়টিকে শুধু পাঠদানের প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ রাখেননি; গড়ে তুলেছিলেন সৃজনশীল ও আনন্দময় শিক্ষার এক প্রাণকেন্দ্র। তাঁর উদ্যোগে নিয়মিত আয়োজন করা হতো বইমেলা, বিজ্ঞানমেলা, বিজ্ঞানবিষয়ক কর্মশালা, বর্ণমেলা, চারু-কারু উৎসব, শব্দ গঠন উৎসব, নিরাপদ সড়ক উৎসবসহ নানা ব্যতিক্রমী আয়োজন, যা শিশুদের শেখাকে করে তুলেছিল আনন্দময় ও জীবনঘনিষ্ঠ।
শ্রেণিকক্ষের গণ্ডি পেরিয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়তেন প্রকৃতির মাঝে। পাখি দেখা, গাছপালা চেনা, প্রকৃতির নানা উপাদান সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ—এসব ছিল তাঁর শিক্ষাদর্শনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর বিশ্বাস ছিল, প্রকৃতির কাছ থেকেই শিশুরা সবচেয়ে বড় শিক্ষা লাভ করে।
কোনো শিক্ষার্থী টানা দুদিন বিদ্যালয়ে না এলে তিনি নিজেই খোঁজ নিতে চলে যেতেন তার বাড়িতে। শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতির কারণ জেনে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতেন। তাঁর কাছে শিক্ষকতা ছিল দায়িত্বের চেয়ে অনেক বেশি—ছিল মানবিক অঙ্গীকার।তবে
বিদায় বেলাতেও তিনি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাতে শিক্ষামূলক বই তুলে দিয়ে গেছেন|
উপজেলা সহকারি প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা উর্মি তালুকদারের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দু আব্দুল লতিফ। বিশেষ অতিথি ছিলেন উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল ওয়াহিদ।
সহকারী শিক্ষক কানিজ মাওলা বলেন, মেরিনা ম্যাডাম সবসময় বলতেন, ভালো শিক্ষক হতে হলে আগে ভালো মানুষ হতে হবে। বিদ্যালয়ের প্রতিটি শিশুকে তিনি নিজের সন্তানের মতো দেখতেন। নতুন নতুন উদ্যোগ নিয়ে তিনি আমাদেরও ভাবতে শিখিয়েছেন। তাঁর কর্মস্পৃহা ও সৃজনশীলতা আমাদের জন্য দীর্ঘদিন অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
সহকারী শিক্ষক নাজমা আক্তার বলেন, ম্যাডামের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে বুঝেছি, একটি বিদ্যালয় বদলে দিতে বড় বাজেট নয়, বড় মনের একজন শিক্ষকই যথেষ্ট। বইমেলা, বিজ্ঞানমেলা, প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ—সবকিছুই তিনি শিশুদের শেখার আনন্দ বাড়ানোর জন্য করতেন। তাঁর মতো নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক খুব কমই দেখা যায়।
বিদায় অনুষ্ঠানে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মীম আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে, “ম্যাডাম আমাদের শুধু বই পড়াননি। তিনি আমাদের গাছ চিনিয়েছেন, পাখি দেখিয়েছেন, গল্প শুনিয়েছেন।
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাকিব হাসান বলে, সবসময় বলতেন, ভালো মানুষ হতে হবে। আমি বড় হয়ে ম্যাডামের মতো একজন শিক্ষক হতে চাই।
বিদায় অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের প্রতিটি মুখে ছিল একই অনুভূতি—একজন প্রধান শিক্ষক অবসরে যাচ্ছেন, কিন্তু একজন আলোকিত মানুষ থেকে যাচ্ছেন শত শত শিক্ষার্থীর হৃদয়ে।
সরকারি চাকরির নিয়মে অবসর নেওয়া যায়, কিন্তু একজন প্রকৃত শিক্ষক কখনো অবসর নেন না। তিনি বেঁচে থাকেন তাঁর শিক্ষার্থীদের স্বপ্নে, তাদের অর্জনে, তাদের মানবিকতায় এবং ভবিষ্যতের প্রতিটি সফল পদক্ষেপে।
মেরিনা জাহানের ৩৬ বছরের শিক্ষকতা জীবনের সমাপ্তি তাই একটি চাকরির শেষ নয়; এটি এক আলোকিত পথচলার নতুন অধ্যায়ের সূচনা। বিদ্যালয়ের আঙিনায় তাঁর পায়ের শব্দ হয়তো আর শোনা যাবে না, কিন্তু তিনি যে ভালোবাসা, মূল্যবোধ ও জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে গেছেন, তা আগামী প্রজন্মের পথচলাকে দীর্ঘদিন আলোকিত করে রাখবে।






















