২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে ইলিশের আশায় জেলেরা
- আপডেট সময় : ০২:৫৭:১০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৬৫ বার পড়া হয়েছে
২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে আবারও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে পদ্মা-মেঘনা নদী ও চাঁদপুরের মাছঘাটগুলোতে। রুপালি ইলিশের আশায় হাজার হাজার জেলে নৌকা নিয়ে নদীতে নেমেছেন। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) মধ্যরাত থেকে শুরু হয়েছে ইলিশ আহরণ। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) ভোর থেকেই জেলেদের নৌকা মাছ নিয়ে ফিরতে শুরু করেছে ঘাটে। এতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন মাছ ব্যবসায়ী, আড়তদার ও শ্রমিকেরা। তবে নদীতে ইলিশের সরবরাহ শুরু হলেও এখনো কমেনি দাম। বিশেষ করে বড় আকারের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে আগের দামেই।
শুক্রবার সকাল ৭টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত চাঁদপুর সদর উপজেলার হরিণা মাছঘাটে গিয়ে দেখা যায়, জেলেদের মাছ ধরা, ঘাটে মাছ নিয়ে আসা এবং কেনাবেচার ব্যস্ততা। প্রায় তিন সপ্তাহের বিরতির পর মাছঘাটে ফিরেছে চেনা কর্মচাঞ্চল্য।
মধ্যরাত থেকে নদীতে জেলেরা, ভোরেই মাছঘাটে ফিরছেন
নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইলিশ ধরতে পদ্মা-মেঘনায় নামেন জেলেরা। কেউ বৃহস্পতিবার মধ্যরাতেই নৌকা নিয়ে নদীতে রওনা দেন। আবার কেউ রাতের শেষ ভাগে মাছ ধরতে শুরু করেন। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরতে থাকেন তারা।
চাঁদপুরের প্রায় ৭০ কিলোমিটার নদী এলাকায় এখন ইলিশ আহরণে ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলেরা। হরিণা ফেরিঘাটসংলগ্ন মাছঘাটে একের পর এক জেলে নৌকা ভিড়ছে। নৌকা থেকে প্লাস্টিকের ট্রেতে করে নামানো হচ্ছে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ।
হরিণা মাছঘাটে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২০টি ইলিশের আড়ত রয়েছে। এসব আড়তে জেলেরা মাছ এনে স্তূপ করে রাখছেন। এরপর শুরু হচ্ছে দরদাম ও হাঁকডাক। অল্প সময়ের মধ্যেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে অনেক মাছ।
এ ঘাটে সাধারণত মাছ সংরক্ষণ করে রাখার প্রবণতা কম। স্থানীয় খুচরা ব্যবসায়ীরা শহরের বাজারে বিক্রির জন্য মাছ কিনছেন। অন্যদিকে বড় স্টেশন মাছ অবতরণ কেন্দ্রে সরবরাহের জন্যও ব্যবসায়ীরা এখান থেকে তাজা ইলিশ সংগ্রহ করছেন।
প্রথম দিনেই ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকার মাছ বিক্রি
নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে নেমে প্রথম দিনেই ভালো মাছ পাওয়ার আশায় ছিলেন জেলেরা। কারও জালে উঠেছে ইলিশ, আবার কারও জালে ধরা পড়েছে ইলিশের পাশাপাশি পাঙ্গাসসহ অন্যান্য মাছ।
ঘাটের পাশের গোবিন্দপুর গ্রামের জেলে লিটন তপাদার জানান, রাতে নদীতে নেমে ভোরে ঘাটে ফিরে তিনি ১২ হাজার টাকার ইলিশ বিক্রি করেছেন।
তিনি বলেন, এভাবে মাছ পাওয়া গেলে কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হবে। সামনে আরও ভালো ইলিশ পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন তারা।
অন্যদিকে জেলে আবুল কালাম খান সাতজনের একটি দল নিয়ে মধ্যরাতে নদীতে মাছ ধরতে যান। সকালে ঘাটে এসে তারা ১৫ হাজার টাকার মাছ বিক্রি করেছেন।
তিনি জানান, কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে আবারও নদীতে মাছ ধরতে যাবেন। তবে তার আশঙ্কা, কয়েক দিন পর নদীতে ইলিশের প্রাপ্যতা কমে আসতে পারে। তাই প্রথম দিকের সময়টুকু কাজে লাগাতে চান তারা।
বড় ইলিশের কেজি ২ হাজার ৬০০ টাকা
মাছের সরবরাহ শুরু হলেও ক্রেতাদের জন্য স্বস্তির খবর নেই। এখনো চড়া দামেই বিক্রি হচ্ছে ইলিশ। বিশেষ করে এক কেজি বা তার বেশি ওজনের ইলিশের দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে রয়েছে।
হরিণা মাছঘাটের আড়তদার জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, বাজারে ইলিশের চাহিদা বেশি থাকায় দাম কমার সম্ভাবনা কম। বর্তমানে বিভিন্ন আকারের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে নিচের দামে—
-
এক কেজি ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা।
-
৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা।
-
২০০ থেকে ৩০০ গ্রাম ওজনের ছোট ইলিশ প্রতি হালি ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকা।
তিনি আরও জানান, ইলিশের পাশাপাশি জেলেদের জালে পাঙ্গাসও ধরা পড়ছে। বড় আকারের পাঙ্গাস প্রতি কেজি প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা এবং ছোট আকারের পাঙ্গাস ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
তবে ঘাটে ইলিশের সরবরাহ বাড়লে দামের কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
ইলিশের সরবরাহ নিয়ে অপেক্ষায় আড়তদারেরা
নিষেধাজ্ঞা শেষে প্রথম দিন মাছ আসতে শুরু করলেও সামনের দিনগুলোতে সরবরাহ কেমন থাকবে, তা নিয়ে এখনই নিশ্চিত হতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা।
আরেক আড়তদার মো. সেলিম বলেন, শুক্রবার সকাল থেকে ঘাটে মাছ আসতে শুরু করেছে। আজ ও আগামীকাল পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করলে ইলিশের সরবরাহ সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যাবে। কারণ আগের বছরগুলোতে নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার দুই দিন পর থেকেই ইলিশের সরবরাহ কমে যেতে দেখা গেছে।
আড়তদার ইব্রাহীম মিয়া জানান, নিষেধাজ্ঞার পর প্রথম দিকে বড় আকারের ইলিশ বেশি পাওয়া যাচ্ছে। তবে ছোট আকারের ইলিশের সংখ্যা তুলনামূলক কম। ইলিশের পরিমাণ কিছুটা কম হলেও পাঙ্গাস পাওয়া যাওয়ায় জেলেদের লোকসান আংশিকভাবে পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার সুফল নিয়ে প্রশ্ন প্রবীণ ব্যবসায়ীর
তবে নদীতে প্রত্যাশিত পরিমাণ ইলিশ না পাওয়ার বিষয়ে কিছুটা হতাশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় প্রবীণ মাছ ব্যবসায়ীরা।
হরিণা মাছঘাটের প্রবীণ ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম সৈয়াল বলেন, এ সময় সাধারণত নদীতে প্রচুর ইলিশ পাওয়া যেত। কিন্তু এবার সেই চিত্র দেখা যাচ্ছে না। তার মতে, নিষেধাজ্ঞা চলাকালে এক শ্রেণির অসাধু জেলে মা ইলিশ শিকার করায় ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। প্রশাসন তাদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
অভিযান কঠোর হওয়ায় সুফল পাচ্ছেন জেলেরা: মৎস্য কর্মকর্তা
এদিকে জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষায় সরকারের নেওয়া অভিযান জোরদার থাকায় জেলেরা এর সুফল পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন চাঁদপুর সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক।
তিনি বলেন, জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষায় দুটি অভিযান কঠোরভাবে পরিচালিত হওয়ায় নদীতে মাছের উৎপাদন বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। জেলেরা ইলিশের পাশাপাশি পাঙ্গাসও পাচ্ছেন।
পাঙ্গাস মাছের উৎপাদন বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেন এই কর্মকর্তা। তার মতে, সরকারিভাবে পাঙ্গাসের উৎপাদন ও বংশবিস্তার বাড়াতে প্রকল্প নেওয়া হলে এ মাছও ইলিশের মতো জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
সব মিলিয়ে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে চাঁদপুরের নদী ও মাছঘাটে ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য। তবে জেলেদের প্রত্যাশা, সামনের দিনগুলোতে নদীতে ইলিশের পরিমাণ বাড়বে এবং ন্যায্য দাম পেলে তাদের ঋণ ও সংসারের ব্যয় সামাল দেওয়া সহজ হবে।

























