২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে ইলিশের আশায় জেলেরা
- আপডেট সময় : ০২:৫৭:১০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৪২ বার পড়া হয়েছে
২২ দিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবারও পদ্মা-মেঘনার বুকে জাল ফেলছেন হাজারো জেলে। নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর নদীতে ফিরেছে মাছ ধরার কর্মচাঞ্চল্য। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) মধ্যরাত থেকেই ইলিশ শিকারের আশায় নৌকা ও জাল নিয়ে নদীতে নামতে শুরু করেন জেলেরা। প্রথম রাতেই কারও জালে ধরা পড়েছে রুপালি ইলিশ, আবার কারও জালে ইলিশের পাশাপাশি উঠেছে পাঙাশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) ভোরের আলো ফুটতেই ধরা মাছ নিয়ে চাঁদপুরের হরিণা মাছঘাটে ফিরতে শুরু করেন জেলেরা। দীর্ঘ বিরতির পর জেলেদের পদচারণ, মাছের কেনাবেচা এবং আড়তদারদের হাঁকডাকে আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে ঘাটটি।
সকাল ৭টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত সদর উপজেলার হরিণা ফেরিঘাটসংলগ্ন মাছঘাটে দেখা যায়, একের পর এক মাছ ধরার নৌকা এসে ভিড়ছে। নৌকা থেকে প্লাস্টিকের ট্রেতে সাজানো ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ নামাচ্ছেন জেলেরা। এরপরই শুরু হচ্ছে দরদাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপস্থিতিতে জমে উঠছে আড়তগুলোর বেচাকেনা।
মাছঘাটে ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য
হরিণা মাছঘাটে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২০টি ইলিশের আড়ত রয়েছে। এসব আড়তে ধরা মাছের বড় অংশ দ্রুত বিক্রি করা হয়। একদল খুচরা ব্যবসায়ী শহরের বিভিন্ন বাজারে বিক্রির জন্য মাছ কিনছেন। অন্যদিকে আরেক দল ব্যবসায়ী বড় স্টেশন মাছ অবতরণ কেন্দ্রে নিয়ে বিক্রির উদ্দেশ্যে মাছ সংগ্রহ করছেন।
এতে জেলে, আড়তদার, শ্রমিক ও পাইকারদের ব্যস্ততায় মুখর হয়ে উঠেছে পুরো মাছঘাট। দীর্ঘদিন পর এমন কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসায় সংশ্লিষ্টদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে স্বস্তি।
প্রথম রাতেই ১২ হাজার টাকার ইলিশ বিক্রি
নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে মাছ পেয়ে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে জেলেদের মুখে। ঘাটসংলগ্ন গোবিন্দপুর গ্রামের জেলে লিটন তপাদার বৃহস্পতিবার রাতে নদীতে মাছ ধরতে যান। শুক্রবার ভোরে ঘাটে ফিরে তিনি ১২ হাজার টাকার ইলিশ বিক্রি করেছেন।
লিটন তপাদার জানান, নদীতে এভাবে ইলিশ পাওয়া গেলে কয়েক দিনের মধ্যেই ঋণের টাকা পরিশোধ করতে পারবেন। দীর্ঘ ২২ দিন মাছ ধরতে না পারায় তাদের আর্থিক সংকট তৈরি হয়েছিল। এখন তাদের প্রত্যাশা, আগামী দিনগুলোতেও নদীতে ইলিশের সরবরাহ অব্যাহত থাকবে।
নিষেধাজ্ঞা শেষ হলেও কমেনি ইলিশের দাম
নদীতে মাছ ধরার উৎসব ফিরলেও সাধারণ ক্রেতাদের জন্য এখনো স্বস্তির খবর নেই। কারণ, বাজারে ইলিশের দাম বেশ চড়া। হরিণা মাছঘাটের আড়তদার জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, বর্তমানে এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকায়।
এ ছাড়া ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের কেজি ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। আর ২০০ থেকে ৩০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রতি হালি ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকায়।
ইলিশের পাশাপাশি জেলেদের জালে উঠছে পাঙাশও। আকারভেদে বড় পাঙাশের কেজি বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকায়। ছোট পাঙাশের দাম ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা।
আড়তদার জাহাঙ্গীর হোসেনের মতে, ইলিশের চাহিদা বেশি থাকায় আপাতত দাম কমার সম্ভাবনা কম। তবে নদীতে মাছের সরবরাহ বাড়লে দামে কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে।
আরেক আড়তদার মো. সেলিম জানান, শুক্রবার সকাল থেকেই ঘাটে মাছ আসতে শুরু করেছে। আজ ও আগামীকাল মাছের সরবরাহ কেমন থাকে, তা পর্যবেক্ষণ করে পরিস্থিতি বোঝা যাবে। আগের বছরগুলোতেও নিষেধাজ্ঞা শেষে প্রথম দুই দিন ভালো মাছ পাওয়া গেলেও পরবর্তী সময়ে সরবরাহ কমে যাওয়ার নজির রয়েছে।
বড় ইলিশ বেশি, ছোট মাছের সংখ্যা কম
আড়তদার ইব্রাহীম মিয়ার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা শেষে এবার তুলনামূলক বড় আকারের ইলিশ বেশি আসছে। তবে ছোট আকারের ইলিশের সংখ্যা কম। মোট ইলিশের পরিমাণ আশানুরূপ না হলেও পাঙাশ পাওয়া যাওয়ায় জেলেদের কিছুটা লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে মাছঘাটের প্রবীণ ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম ছৈয়ালের কণ্ঠে রয়েছে হতাশা। তার মতে, একসময় বছরের এই সময়ে পদ্মা-মেঘনায় প্রচুর ইলিশ পাওয়া যেত। কিন্তু এবার সেই চিত্র দেখা যাচ্ছে না।
তিনি অভিযোগ করেন, এক শ্রেণির জেলে নিষেধাজ্ঞার সময়ও মা ইলিশ শিকার করেছেন। প্রশাসন তাদের কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। ফলে অভিযান পরিচালনা করা হলেও প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে মনে করেন তিনি।
নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে সুফল পাওয়ার দাবি মৎস্য বিভাগের
অন্যদিকে মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষায় ধারাবাহিক অভিযান এবং নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের ফলে সুফল পাওয়া যাচ্ছে।
চাঁদপুর সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক জানান, জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষায় দুটি অভিযান কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করায় জেলেরা এখন এর সুফল পাচ্ছেন। ইলিশের পাশাপাশি পাঙাশও পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, পাঙাশের উৎপাদন বাড়াতে সরকারিভাবে প্রকল্প গ্রহণ করা হলে এ মাছও ইলিশের মতো জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জেলেদের সামনে এখন নতুন প্রত্যাশা
দীর্ঘ ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে পদ্মা-মেঘনায় জেলেদের প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে আবারও সচল হয়েছে চাঁদপুরের মাছঘাটগুলো। মাছ ধরা, বিক্রি ও পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত মানুষের কর্মব্যস্ততাও ফিরে এসেছে।
তবে এই স্বস্তির মধ্যেও জেলেদের সামনে রয়েছে নানা অনিশ্চয়তা। আগামী দিনগুলোতে নদীতে পর্যাপ্ত ইলিশ পাওয়া যাবে কি না, মাছের সরবরাহ বাড়লে দাম কমবে কি না এবং মাছ বিক্রির আয় দিয়ে দীর্ঘদিনের ঋণের বোঝা কতটা কমানো সম্ভব হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
তবু নতুন আশায় বুক বেঁধেছেন জেলেরা। নদীতে ইলিশের সরবরাহ বাড়বে এবং মাছ বিক্রি করে আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবেন—এমন প্রত্যাশা নিয়েই আবারও পদ্মা-মেঘনার বুকে জাল ফেলছেন তারা।





















