ইসরায়েলের নির্বাচনে কাতার-তুরস্কের গোপন অর্থায়ন
- আপডেট সময় : ০২:৪০:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৪৩ বার পড়া হয়েছে
ইসরায়েলের সদ্য সমাপ্ত সাধারণ নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপ ও গোপন অর্থায়নের অভিযোগ উঠেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন লিকুদ পার্টি ও তাদের মিত্ররা দাবি করেছে, আরব মুসলিম দলগুলোর পক্ষে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হয়েছে। এ ঘটনায় কাতার ও তুরস্কের নাম সামনে এসেছে। তবে দুই দেশই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
নির্বাচনে কথিত বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ তদন্তে নেমেছে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেট। তবে এখন পর্যন্ত এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।
সরকার গঠনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি কোনো জোট
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন।
নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন মধ্যপন্থি জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন।
ফলে কোনো জোটই এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। নির্বাচনে আরব মুসলিম দল জয়েন্ট লিস্ট ও ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা রা’আম পার্টির আসনসংখ্যা নিয়েও রাজনৈতিক আলোচনা তৈরি হয়েছে।
ভোট কারচুপি ও বিদেশি অর্থায়নের অভিযোগ
ভোট গণনার সময় লিকুদ পার্টি ও নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ কয়েকটি গণমাধ্যম দুই আরব দলের বিরুদ্ধে নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তোলে।
লিকুদের দাবি, নির্বাচনে বিদেশি সহায়তায় ভোট কারচুপির চেষ্টা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল নেসেটের ওপর বিদেশি প্রভাব প্রতিষ্ঠা, ইসরায়েলকে ইসলামীকরণের দিকে ঠেলে দেওয়া এবং ডানপন্থি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা।
দলটির অভিযোগ, কিছু এলাকায় রা’আম পার্টির ব্যালট পেপারের সঙ্গে খামে নগদ অর্থ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভোটগ্রহণ কমিটির সদস্যদের হুমকি, ভোটারদের একসঙ্গে কেন্দ্রে প্রবেশ এবং একই ব্যক্তির একাধিকবার ভোট দেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়েছে।
এ ছাড়া ব্যালট খামের সংখ্যা ও নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যার মধ্যে অমিল এবং ভোটার সংগঠিত করতে নিষিদ্ধ সফটওয়্যার ব্যবহারের অভিযোগ করেছে দলটি।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেনি লিকুদ পার্টি।
অর্থায়নের উৎস হিসেবে কাতার ও তুরস্কের নাম
ইসরায়েলি কয়েকটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুর দলের সদস্যরা কথিত বিদেশি হস্তক্ষেপের জন্য কাতার ও তুরস্ককে সন্দেহ করছেন।
চ্যানেল ১৩-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, অতীতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন আর্থিক পথ দিয়ে অর্থ লেনদেন হয়েছে কি না।
এসব পথের মধ্যে মুদ্রা বিনিময়কারী প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সংস্থার মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের বিষয়টিও রয়েছে। অভিযোগ করা হচ্ছে, এই অর্থ আরব মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।
লিকুদ পার্টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ঘটনাটিকে ‘রা’আম-গেট’ আখ্যা দিয়ে লিখেছে, ইসরায়েলের নির্বাচন চুরি করা হয়েছে।
তদন্ত শুরু করেছে শিন বেট
নির্বাচনে বিদেশি অর্থায়ন ও হস্তক্ষেপের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে শিন বেট।
ইসরায়েলের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও সাবেক বিচারপতি নোয়াম সোলবার্গের আহ্বানের পর সংস্থাটি এ পদক্ষেপ নেয়।
সোলবার্গ এক চিঠিতে জানান, ইসরায়েলের স্বার্থবিরোধী বাইরের পক্ষগুলো অর্থায়নের মাধ্যমে নির্বাচনে অনৈতিক হস্তক্ষেপ করেছে—এমন কিছু গুরুতর অভিযোগ তাঁর কাছে এসেছে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত নন বলেও উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ডিন লিভনে নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দেওয়া এক চিঠিতে তিনি জানান, নেসেট নির্বাচন আইন মেনেই অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভোটকেন্দ্রগুলোতে স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়েছিল। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় নিয়মতান্ত্রিক অনিয়মের অভিযোগের কোনো ভিত্তি পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি।
নেতানিয়াহুর বিরোধীদের পাল্টা অভিযোগ
লিকুদ পার্টির অভিযোগের তীব্র সমালোচনা করেছেন নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোট।
তাঁর দাবি, নির্বাচনের ফলাফলকে অবৈধ প্রমাণের চেষ্টা করছে লিকুদ পার্টি। কারণ, তারা নির্বাচনে পরাজিত হয়েছে।
আইজেনকোট বলেন, নেতানিয়াহু মিথ্যাচার, জনমত প্রভাবিত করা এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মাধ্যমে বাস্তবতা মোকাবিলা করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন।
অন্যদিকে, আরব দল জয়েন্ট লিস্টও বিদেশি অর্থায়ন, ভোট কেনা ও নিষিদ্ধ সফটওয়্যার ব্যবহারের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
দলটির এক বিবৃতিতে বলা হয়, নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকার করে ডানপন্থি গোষ্ঠীগুলো ভিত্তিহীন অভিযোগ ছড়াচ্ছে। এসব অভিযোগ আরব সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক শক্তির প্রতি তাদের ভীতিরই বহিঃপ্রকাশ।
বিরোধী নেতা ইয়াইর গোলানও নেতানিয়াহুর সমালোচনা করেছেন। তাঁর ভাষ্য, জনগণ নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু তিনি ভোটারদের রায় মেনে নিতে অস্বীকার করছেন।
অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে কাতার ও তুরস্ক
ইসরায়েলের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ ও অর্থায়নের অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে কাতার।
দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি বলেছেন, ইসরায়েলি নির্বাচনে হস্তক্ষেপ কিংবা নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে কোনো কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, কিছু ইসরায়েলি রাজনীতিক ও তাদের ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যম আবারও কাতারবিরোধী অপপ্রচার শুরু করেছে। ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যে কাতারকে জড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, অভিযোগগুলো সত্য হলে মনে হতো পুরো ইসরায়েলই কাতারের মালিকানাধীন।
এদিকে, তুরস্কও নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে অভিহিত করেছে।
তুরস্কের যোগাযোগ অধিদপ্তরের অপপ্রচার মোকাবিলা কেন্দ্র এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এসব অভিযোগ জনমতকে প্রভাবিত ও বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে ছড়ানো হচ্ছে।
একই সঙ্গে বিভ্রান্তিকর প্রতিবেদন ও ভিত্তিহীন অভিযোগে আস্থা না রাখতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।





















