সংসদের তিন অধিবেশনে খরচ ৭০৩ কোটি টাকা
- আপডেট সময় : ০১:০৮:৪৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৫৫৭ বার পড়া হয়েছে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম তিন অধিবেশনে ৬০ কার্যদিবসে অধিবেশন পরিচালনায় ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭০৩ কোটি টাকা। হিসাব অনুযায়ী, সংসদের এক মিনিট অধিবেশন চললে সরকারের ব্যয় হয় গড়ে ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৮২৫ টাকা। অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে ব্যয় প্রায় ৫ হাজার ৯৪৭ টাকা।
তবে সংসদের মূল দায়িত্ব আইন প্রণয়নে তুলনামূলক কম সময় ব্যয় হয়েছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা, বাজেট আলোচনা এবং বিভিন্ন বিতর্কে উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় হয়েছে।
৬০ দিনে ব্যয় ৭০৩ কোটি টাকা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় ১২ মার্চ। এটি শেষ হয় ৩০ এপ্রিল। এ অধিবেশনে সংসদ বসে ২৫ কার্যদিবস।
দ্বিতীয় বা বাজেট অধিবেশন চলে ৭ জুন থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত। এতে ২৬ কার্যদিবস সংসদ বসে। এরপর তৃতীয় অধিবেশন শুরু হয় ২৭ আগস্ট। ১০ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া এ অধিবেশনে কার্যদিবস ছিল ৯টি।
সব মিলিয়ে প্রথম তিন অধিবেশনে সংসদ বসেছে ৬০ কার্যদিবস।
সংসদ সচিবালয়ে অধিবেশন কত ঘণ্টা চলেছে, তার সম্মিলিত হিসাব না থাকলেও অধিবেশন শুরুর ও শেষের সময় এবং বিরতি বিবেচনায় গড় মেয়াদ প্রায় ৫ ঘণ্টা ৪৭ মিনিট।
এই হিসাবে তিন অধিবেশনে মোট ৩২৮ ঘণ্টা ২০ মিনিট বা ১৯ হাজার ৭০০ মিনিট অধিবেশন চলেছে। প্রতি মিনিটে ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৮২৫ টাকা ব্যয় ধরলে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৭০২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।
রাষ্ট্রপতির ভাষণে ব্যয় ৮৬ কোটি টাকা
চলতি বছরের ১২ মার্চ জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বর্ষ শুরুর ভাষণের ওপর ৪০ ঘণ্টা ১৪ মিনিট আলোচনা হয়। এতে অংশ নেন ২৮০ জন সংসদ সদস্য।
প্রতি মিনিটের ব্যয়ের হিসাবে শুধু এই আলোচনায় সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা।
রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় জামায়াত-এনসিপি জোটের সদস্যরা সংসদে বিক্ষোভ করে ভাষণ বর্জন করেন। পরে ভাষণের ওপর সাধারণ আলোচনার জন্য ৫০ ঘণ্টা সময় বরাদ্দের প্রস্তাবও তাদের পক্ষ থেকে আসে।
বাজেট আলোচনায় ব্যয় ১০৪ কোটি টাকা
দ্বিতীয় অধিবেশনে বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা হয়েছে ৪৮ ঘণ্টা ৫১ মিনিট। এতে অংশ নেন ৩১৬ জন সংসদ সদস্য।
মোট ২ হাজার ৯৩১ মিনিটের এ আলোচনায় সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।
তবে সংসদের সব ব্যয়কে অপ্রয়োজনীয় বলা যায় না। প্রশ্নোত্তর, আইন প্রণয়ন, সংসদীয় কমিটির কাজ এবং নোটিশ নিষ্পত্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমও সংসদের নিয়মিত কাজের অংশ।
আইন প্রণয়নে তুলনামূলক কম সময়
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে ৯৪টি বিল পাস এবং ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপিত হয়। প্রধানমন্ত্রীকে করা ৯৩টি প্রশ্নের মধ্যে ৩৫টির উত্তর দেওয়া হয়।
এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের জন্য পাওয়া ২ হাজার ৫০৯টি প্রশ্নের মধ্যে ১ হাজার ৭৭৮টির উত্তর দেওয়া হয়।
বাজেট অধিবেশনে ১০টি সরকারি বিল পাস হয়। তৃতীয় অধিবেশনের ৯ কার্যদিবসে পাস হয়েছে ৬টি বিল।
তবে তৃতীয় অধিবেশনে অল্প সময়ে বিল উত্থাপন ও পাসের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালও দ্রুত বিল সংসদে পাঠানোর বিষয়ে নির্বাহী বিভাগের সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর সংসদ সদস্যদের বিল ভালোভাবে পড়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া প্রয়োজন।
সময়ের সঙ্গে বেড়েছে অধিবেশন ব্যয়
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) বিভিন্ন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, অষ্টম জাতীয় সংসদে প্রতি মিনিটে ব্যয় ছিল প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। নবম সংসদের আটটি অধিবেশনে তা বেড়ে প্রায় ৭৮ হাজার টাকা হয়।
দশম সংসদের ১৪তম থেকে ১৮তম অধিবেশনে প্রতি মিনিটে গড় ব্যয় দাঁড়ায় ১ লাখ ৬৩ হাজার ৬৮৬ টাকা। একাদশ সংসদের প্রথম ২২ অধিবেশনে তা বেড়ে হয় ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৪ টাকা।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির প্রভাব সমন্বয় করলে একাদশ সংসদের ওই ব্যয় দাঁড়ায় ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৮২৫ টাকা। সেই হিসাব ধরেই বর্তমান সংসদে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৫ হাজার ৯৪৭ টাকা ব্যয়ের হিসাব করা হয়েছে।
সংসদ সচিবালয়ের বাজেট ২৯০ কোটি টাকা
২০২৬-২৭ অর্থবছরে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের মোট প্রস্তাবিত বাজেট ২৯০ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এর মধ্যে পরিচালন খাতে ২৮৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা এবং উন্নয়ন খাতে ৭০ লাখ টাকা রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া জাতীয় সংসদ ভবনের রক্ষণাবেক্ষণেও প্রতিবছর বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়। বিশেষ প্রকল্পসহ কোনো কোনো বছর ভবনের ভৌত ও ইলেকট্রোমেকানিক্যাল রক্ষণাবেক্ষণে ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে।
এর বাইরে নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ, অগ্নিনিরাপত্তা, সম্প্রচার, গণপূর্তের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব এবং ওভারটাইমসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় রয়েছে।
সংসদ বিষয়ক গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ বলেন, আইন প্রণয়নে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া প্রয়োজন। বিলের প্রতিটি ধারা পর্যালোচনা এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ থাকলে আরও কার্যকর ও টেকসই আইন প্রণয়ন সম্ভব।
জাতীয় সংসদের অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক কামরুল ইসলাম বলেন, সংসদের বার্ষিক বাজেটকে শুধু অধিবেশনভিত্তিক ব্যয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ, সম্প্রচার, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সেবার ব্যয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।























