পাহাড়ে পর্যটকের ঢল, ঠাঁই নেই হোটেল-রিসোর্টে
- আপডেট সময় : ০৩:৪৪:০১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৬১৯ বার পড়া হয়েছে
পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে মেঘের আনাগোনা, চারদিকে সবুজের সমারোহ আর নীল আকাশের হাতছানি। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতে শারদীয় দুর্গাপূজার টানা ছুটিতে পর্যটকদের ঢল নেমেছে পার্বত্য জেলা বান্দরবানে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে ছুটে আসছেন ভ্রমণপিপাসুরা। পর্যটকদের পদচারণে মুখর হয়ে উঠেছে জেলার জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলো। সেই সঙ্গে বেড়েছে হোটেল-রিসোর্টের ব্যস্ততা। আগাম বুকিংয়ে অধিকাংশ আবাসনকেন্দ্রের কক্ষ পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় কোথাও কোথাও থাকার জায়গা পেতে ভোগান্তিতে পড়ছেন পর্যটকেরা।
পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে উপচে পড়া ভিড়
দুর্গাপূজার ছুটিকে কেন্দ্র করে বান্দরবানের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। শহরের মেঘলা ও নীলাচল থেকে শুরু করে দূরের শৈলপ্রপাত, চিম্বুক, নীলগিরি, বগালেক, কেওক্রাডং, থানচি ও তমাতুঙ্গীসহ বিভিন্ন এলাকায় পর্যটকদের ভিড় দেখা যাচ্ছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের পদচারণে জমজমাট থাকছে এসব পর্যটনকেন্দ্র।
পাহাড়ের চূড়া থেকে মেঘের ভেলা দেখা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ছবি তোলা এবং পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটাতে ব্যস্ত পর্যটকেরা। বিশেষ করে নীলাচল ও মেঘলা পর্যটনকেন্দ্রে সকাল থেকেই ছিল দর্শনার্থীদের ভিড়। একই চিত্র দেখা গেছে চিম্বুক ও নীলগিরিতেও।
পর্যটনকেন্দ্রগুলোর টিকিট কাউন্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা জানান, কোনো কোনো কেন্দ্রে প্রতিদিন গড়ে তিন হাজারের বেশি প্রবেশ টিকিট বিক্রি হচ্ছে। নীলাচল পর্যটনকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ভাষ্য, পূজার ছুটিতে সকাল থেকে আড়াই হাজারের বেশি পর্যটক সেখানে প্রবেশ করেছেন। দিনের বাকি সময়ে এ সংখ্যা চার হাজারে পৌঁছাতে পারে বলে তাঁদের ধারণা।
হোটেল-রিসোর্টে শতভাগ বুকিং
পর্যটকের বাড়তি চাপে সবচেয়ে বেশি সংকট তৈরি হয়েছে আবাসন খাতে। বান্দরবান শহরের আবাসিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টগুলোর অধিকাংশ কক্ষ আগেই বুকিং হয়ে গেছে। ফলে আগাম বুকিং ছাড়া আসা অনেক পর্যটককে থাকার জায়গা খুঁজতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। কেউ সাধারণ মানের আবাসনে উঠছেন, আবার কেউ আত্মীয়স্বজনের বাসায় অবস্থান করছেন।
টাঙ্গাইল থেকে বেড়াতে আসা রোমান বলেন, ‘হোটেল না পেয়ে কিছুটা সমস্যায় পড়তে হয়েছে। তবে পাহাড়ের সৌন্দর্য সব কষ্ট ভুলিয়ে দিয়েছে।’
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে প্রথমবার বান্দরবানে এসেছেন মিজবাহ। তিনি বলেন, কয়েকটি পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখেছেন তাঁরা। এর মধ্যে নীলাচল তাঁর সবচেয়ে ভালো লেগেছে।
গাজীপুর থেকে আসা সবুজ বলেন, ‘এর আগেও অনেকবার বান্দরবানে এসেছি। যতবারই আসি, ততবারই ভালো লাগে। পাহাড় আর প্রাকৃতিক পরিবেশ আমাকে বিমোহিত করে। সুযোগ পেলেই বান্দরবানে ছুটে আসি।’
জেলা হোটেল ও রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. জসিম উদ্দিন বলেন, শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে এবার গত বছরের তুলনায় পর্যটকের চাপ বেশি। অনেক পর্যটক হোটেল না পেয়ে সাধারণ মানের আবাসনে কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাসায় অবস্থান করছেন। তবে পর্যটকদের সেবা দিতে তাঁরা সবসময় নিয়োজিত রয়েছেন।
পর্যটকবাহী গাড়ির চাপ, বাড়ছে যানজট
পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ততা বেড়েছে পরিবহন খাতেও। জিপ-মাইক্রোবাস মালিক সমিতির লাইনম্যান মো. কামাল হোসেন বলেন, সকাল থেকে প্রতিটি গাড়িতে ১২ থেকে ১৩ জন করে পর্যটক নিয়ে প্রায় ৩০০টি পর্যটকবাহী গাড়ি বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রের উদ্দেশে ছেড়ে গেছে।
অন্যদিকে, পর্যটকদের বাড়তি চাপে শহরের প্রধান সড়ক ও পাহাড়ি পথগুলোতে যানজট তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে মেঘলা ও নীলাচলগামী সড়কে ব্যক্তিগত গাড়ি, মাইক্রোবাস ও পর্যটকবাহী বাসের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলোর প্রবেশপথেও গাড়ির চাপ বেশি থাকছে। এতে কোনো কোনো পর্যটককে গন্তব্যে পৌঁছাতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করতে হচ্ছে।
নিরাপত্তায় কাজ করছে ট্যুরিস্ট পুলিশ
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলার বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। বান্দরবান পুলিশ সুপার ওহাবুল ইসলাম খন্দকার বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে জেলার প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্রে ট্যুরিস্ট পুলিশ কাজ করছে। ভ্রমণে এসে কেউ অপ্রীতিকর ঘটনার মুখোমুখি হলে জেলা ট্যুরিস্ট পুলিশের ওয়েবসাইটে দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করে সহায়তা নিতে পারবেন।
জেলা প্রশাসক নাজনীন সুলতানা বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুর্গাপূজার পরপরই বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রবারণা উৎসব থাকায় এবার পর্যটকদের ভিড় বেড়েছে। দুর্গাপূজা ও সাপ্তাহিক ছুটির পর আগামী ২৫ থেকে ২৭ অক্টোবর মারমা বৌদ্ধদের ঐতিহ্যবাহী ওয়াগ্যোয়াই পোয়ে বা প্রবারণা উৎসব অনুষ্ঠিত হবে। এ উৎসব ঘিরেও পর্যটকদের আগ্রহ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এরপর দুই দিনের সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় মাসের শেষ পর্যন্ত বান্দরবানে পর্যটকদের ভিড় থাকতে পারে। পর্যটকদের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি টিকিট ব্যবস্থাপনা ও যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পর্যটন ব্যবসায় নতুন গতি
দুর্গাপূজার ছুটিতে পর্যটকদের এই ঢল বান্দরবানের পর্যটননির্ভর ব্যবসায় নতুন গতি এনেছে। হোটেল-রিসোর্টের পাশাপাশি পরিবহন, খাবারের দোকান ও পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে গড়ে ওঠা বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বেড়েছে বেচাকেনা ও ব্যস্ততা।
তবে পর্যটকের বিপরীতে পর্যাপ্ত আবাসন নিশ্চিত করা, যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখা এখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। পর্যটকদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক ভ্রমণ নিশ্চিত করতে প্রশাসন, পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও পর্যটন ব্যবসায়ীদের সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
























