নাইন-ইলেভেনের পর দুই যুগের মার্কিন যুদ্ধ, প্রাণ গেছে ৪৫ লাখের বেশি
- আপডেট সময় : ০১:০১:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৫৪১ বার পড়া হয়েছে
নাইন-ইলেভেন হামলার ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০০১ সালের ওই হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে শুরু হয় একের পর এক যুদ্ধ ও সামরিক অভিযান। এসব সংঘাতে বিপর্যস্ত হয়েছে লাখ লাখ মানুষের জীবন।
ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াটসন ইনস্টিটিউটের ‘কস্ট অব ওয়ার’ প্রকল্পের হিসাবে, ২০০১ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধগুলোতে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৪৫ লাখ থেকে ৪৭ লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে সরাসরি নিহত প্রায় ৯ লাখ ৪০ হাজার। রোগ, অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যগত জটিলতায় মারা গেছেন আরও ৩৬ লাখ থেকে ৩৮ লাখ মানুষ।
‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ থেকে দীর্ঘ সংঘাত
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আল-কায়েদার ১৯ হামলাকারী চারটি বাণিজ্যিক বিমান ছিনতাই করে যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালায়। নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও পেন্টাগনে চালানো ওই হামলায় প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিহত হন।
এরপর মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। হামলার এক মাসেরও কম সময় পর আফগানিস্তানে অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এটিকে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করেন। পরে ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও সামরিক অভিযান চালানো হয়।
আফগানিস্তানে প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতি
২০০১ সালের ৭ অক্টোবর ‘অপারেশন এন্ডিউরিং ফ্রিডম’ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তালেবান ক্ষমতা হারালেও যুদ্ধ চলে প্রায় ২০ বছর।
‘কস্ট অব ওয়ার’ প্রকল্পের হিসাবে, আফগানিস্তানে সরাসরি প্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার মানুষ নিহত হন। ক্ষুধা, রোগ ও চিকিৎসার অভাবে মারা যান আরও কয়েক লাখ মানুষ। যুদ্ধের আগে দেশটিতে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার হার ছিল ৬২ শতাংশ। পরে তা বেড়ে ৯২ শতাংশে পৌঁছে।
ইরাক যুদ্ধেও ব্যাপক প্রাণহানি
আফগানিস্তানে হামলার দুই বছরেরও কম সময় পর ২০০৩ সালের ১৯ মার্চ ইরাকে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। ইরাকে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক অস্ত্র থাকার দাবি করে এই অভিযান শুরু করা হলেও পরে সেই দাবি মিথ্যা প্রমাণিত হয়।
ইরাক যুদ্ধে সরাসরি প্রায় ৩ লাখ ১৫ হাজার মানুষ নিহত হন বলে ‘কস্ট অব ওয়ার’ প্রকল্পের হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। যুদ্ধের ভয়াবহতা দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
ড্রোন ও বিমান হামলাতেও প্রাণহানি
স্থলযুদ্ধের পাশাপাশি পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়ায় বিমান ও ড্রোন অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র।
ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের হিসাবে, ২০০৪ সাল থেকে পাকিস্তানে ৪২৩টি মার্কিন হামলায় আনুমানিক ২ হাজার ৪৯৯ থেকে ৪ হাজার ১ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে বেসামরিক মানুষের সংখ্যা ৪২৪ থেকে ৯৬৬। ইয়েমেনে অন্তত ১৮৬টি হামলা ও অভিযানে নিহত হয়েছেন অন্তত ৮৫৩ জন। এর মধ্যে অন্তত ১৫৮ জন বেসামরিক।
২০১৪ সালে ইরাক ও সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন অভিযানও ব্যাপক প্রাণহানি ঘটায়। কর্মকর্তারা ১ হাজার ৪১৭ বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর কথা স্বীকার করলেও এয়ারওয়ার্সের হিসাবে প্রকৃত সংখ্যা ৮ হাজার ২৬৪ থেকে ১৩ হাজার ৩৬০ হতে পারে।
বাস্তুচ্যুত ৩ কোটি ৮০ লাখের বেশি
যুদ্ধের প্রভাব শুধু প্রাণহানিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ‘কস্ট অব ওয়ার’ প্রকল্পের হিসাবে, আফগানিস্তান, ইরাক, পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, ফিলিপাইন, লিবিয়া ও সিরিয়ায় ৩ কোটি ৮০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
দুই দশকের বেশি সময় পরও বহু মানুষ ঘরছাড়া। ইরাকের ২০০৩ সালের আগ্রাসনের দুই দশক পরও ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছেন।
মার্কিন সেনাদের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
এই যুদ্ধগুলোর প্রভাব পড়েছে মার্কিন সেনা ও সাবেক সেনাদের ওপরও। আফগানিস্তানে ২০২১ সালে সেনা প্রত্যাহারের আগ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা নিহত এবং ২০ হাজার আহত হন।
ইরাক যুদ্ধে ৩ হাজার ৪৮১ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৩১ হাজারের বেশি আহত হন। একই সঙ্গে যুদ্ধফেরত অনেক সেনা দীর্ঘমেয়াদি মানসিক স্বাস্থ্যসংকটে ভুগছেন।
যুদ্ধের খরচ ৮ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি
দুই দশকের এসব যুদ্ধের আর্থিক খরচও ছিল বিপুল। ‘কস্ট অব ওয়ার’ প্রকল্পের হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ পরিচালনায় প্রায় ৫ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। সাবেক সেনাদের চিকিৎসা ও সহায়তার জন্য আগামী কয়েক দশকে আরও ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের হিসাব রয়েছে।
সব মিলিয়ে যুদ্ধের মোট খরচ দাঁড়াতে পারে অন্তত ৮ ট্রিলিয়ন ডলারে।
ফলে নাইন-ইলেভেনের পর শুরু হওয়া ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ শুধু সামরিক সংঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর দীর্ঘমেয়াদি মানবিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য এখনও বহন করছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মানুষ এবং যুক্তরাষ্ট্রও।


























