২০২৬ হতে পারে ইতিহাসের উষ্ণতম বছর, ২০২৭ নিয়েও শঙ্কা
- আপডেট সময় : ১২:৪৫:৪২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৫৭ বার পড়া হয়েছে
প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী হয়ে ওঠা ‘সুপার এল নিনো’র প্রভাবে ২০২৬ সাল বিশ্বের ইতিহাসে উষ্ণতম বছর হতে পারে। একই সঙ্গে ২০২৭ সালেও বৈশ্বিক তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা কোপার্নিকাসের পরিচালক কার্লো বুয়োনতেম্পো এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
সোমবার বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বুয়োনতেম্পো বলেন, অতীতের এল নিনো পরিস্থিতির ধরন অনুসরণ করলে ২০২৬ সালে তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড হতে পারে। এর প্রভাব পরবর্তী বছরেও অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে ২০২৭ সালেও বিশ্ব নতুন উষ্ণতার রেকর্ডের মুখোমুখি হতে পারে।
কী এই সুপার এল নিনো?
এল নিনো প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র। এই পরিস্থিতিতে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরের স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি উষ্ণ পানি বৈশ্বিক আবহাওয়ার ধরনে পরিবর্তন আনে। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে খরা, অতিবৃষ্টি, বন্যা ও তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তবে এল নিনোর প্রভাবের সঙ্গে মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড থেকে নির্গত গ্রিনহাউস গ্যাস পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে তাপ আটকে রাখছে। ফলে প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্রের কারণে তাপমাত্রা বাড়লে তার প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে।
প্রশান্ত মহাসাগরে তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড
কোপার্নিকাসের তথ্য অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো পর্যবেক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল নিনো ৩.৪-এ গত সেপ্টেম্বরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ২৯ দশমিক ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। সংস্থাটির দেওয়া তথ্য অনুসারে, ওই অঞ্চলে এটি সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড।
এর আগে ১৯৮২-৮৩, ১৯৯৭-৯৮ এবং ২০১৫-১৬ সালে শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তবে এবারের পর্যবেক্ষণে নিনো ৩.৪ অঞ্চলের তাপমাত্রা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
চলতি বছরের জুনে বর্তমান এল নিনো পর্ব শুরু হয়। তবে এটিই ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো কি না, সে বিষয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন বুয়োনতেম্পো।
তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের তাপমাত্রা দীর্ঘমেয়াদে বেড়ে যাওয়ায় অতীতের এল নিনো পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির সরাসরি তুলনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে কোপার্নিকাস নতুন একটি সূচক ব্যবহার করছে, যেখানে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় সমুদ্রের সামগ্রিক উষ্ণতা বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়। ওই সূচক অনুযায়ী, বর্তমান এল নিনো এখনো অতীতের ঘটনাগুলোর তুলনায় বেশি শক্তিশালী নয়। তবে এটিকে বড় মাত্রার একটি ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন বুয়োনতেম্পো।
অন্যদিকে, জাপানের আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, এল নিনো পরিস্থিতি রেকর্ডে থাকা সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছেছে। তবে বিভিন্ন সংস্থা এল নিনোর তীব্রতা নির্ধারণে ভিন্ন ভিন্ন সূচক ব্যবহার করায় তাদের মূল্যায়নে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
সেপ্টেম্বরে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের তাপমাত্রায় রেকর্ড
বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রাও উদ্বেগজনক অবস্থায় পৌঁছেছে। কোপার্নিকাসের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ২১ দশমিক ০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। ২০২৩ সালের একই মাসে এই তাপমাত্রা ছিল ২০ দশমিক ৯২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
এদিকে, গত আগস্টে তাপমাত্রার রেকর্ড হওয়ার পর সেপ্টেম্বর ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় উষ্ণতম সেপ্টেম্বর। এ মাসে ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি বায়ুর গড় তাপমাত্রা ছিল ১৬ দশমিক ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
প্রাক্-শিল্পায়ন যুগের (১৮৫০-১৯০০) গড় তাপমাত্রার তুলনায় এই তাপমাত্রা ১ দশমিক ৬৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। টানা দ্বিতীয় মাসের মতো বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির পরিমাণ ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা ছাড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিসংখ্যান বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কতটা তীব্র হচ্ছে, তার গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। তবে এক বা একাধিক মাসের তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়ালেই প্যারিস জলবায়ু চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি তাপমাত্রা-সীমা স্থায়ীভাবে অতিক্রম হয়েছে, এমনটি বলা যায় না।
২০২৭ সালেও বাড়তে পারে বৈশ্বিক তাপমাত্রা
বুয়োনতেম্পোর আশঙ্কা, আগামী বছরের শুরুর দিকেও বৈশ্বিক তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকতে পারে। এল নিনোর সময় প্রশান্ত মহাসাগরে সঞ্চিত তাপের একটি অংশ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে এল নিনো পরিস্থিতি চূড়ায় পৌঁছানোর পরের বছরও বৈশ্বিক তাপমাত্রায় এর প্রভাব স্পষ্ট হতে পারে।
এই প্রক্রিয়ার কারণে ২০২৭ সালেও তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড তৈরির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে ২০২৬ ও ২০২৭ সালের তাপমাত্রা শেষ পর্যন্ত কোন পর্যায়ে পৌঁছাবে, তা নির্ভর করবে এল নিনোর তীব্রতা, সমুদ্রের তাপমাত্রা এবং অন্যান্য জলবায়ুগত পরিস্থিতির ওপর।
এর আগে সর্বশেষ এল নিনো পর্বের প্রভাবে ২০২৪ সাল বিশ্বের ইতিহাসে উষ্ণতম বছর হয়েছিল। ওই বছর কয়েক মাস ধরে বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রাক্-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি ছিল।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রধান কারণ গ্রিনহাউস গ্যাস
এল নিনো বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণায়নের প্রধান কারণ মানুষের কর্মকাণ্ড থেকে নির্গত গ্রিনহাউস গ্যাস। কয়লা, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ বিভিন্ন গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বাড়ছে।
২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে বিশ্বের দেশগুলো বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রাক্-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের অনেক নিচে রাখা এবং তা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখতে প্রচেষ্টা চালানোর অঙ্গীকার করে।
তবে জাতিসংঘ গত সেপ্টেম্বরে সতর্ক করেছে, দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির এই সীমা কয়েক বছরের মধ্যেই অতিক্রম করা হতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, উষ্ণতা বৃদ্ধির ঝুঁকি কমাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার থেকে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ দ্রুত কমানো জরুরি। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, বন সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা হলো, এল নিনো সাময়িকভাবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে পৃথিবী কতটা উষ্ণ হবে, তা নির্ভর করবে মূলত মানবসৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কতটা কমানো সম্ভব হচ্ছে তার ওপর।





















