১ নভেম্বর থেকে ঢাকায় ‘এক রুট, এক কোম্পানি’: বাস মিলবে যেসব রুটে
- আপডেট সময় : ১২:৪০:০৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৫৬ বার পড়া হয়েছে
দীর্ঘদিনের নৈরাজ্য, অসুস্থ প্রতিযোগিতা, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা এবং লক্কড়ঝক্কড় বাসের দৌরাত্ম্য দূর করে অবশেষে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী ১ নভেম্বর থেকে পরীক্ষামূলকভাবে রাজধানীর ছয়টি সাধারণ রুটে ‘এক রুট, এক কোম্পানি’ নীতিতে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাস পরিষেবা চালু হতে যাচ্ছে।
সম্প্রতি ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘বাস রুট রেশনালাইজেশন’ বিষয়ক কমিটির সভা এবং পরবর্তীতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের সমন্বয় বৈঠকে এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ঢাকার গণপরিবহনে দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা অনেকাংশে দূর হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিকল্পনার পেছনের প্রেক্ষাপট ও লক্ষ্য
রাজধানীর প্রধান সড়কে একই গন্তব্যের জন্য বিভিন্ন পরিবহন কোম্পানির বাসগুলো একে অপরকে পেছনে ফেলার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকে। এর ফলে যেমন প্রতিনিয়ত ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে, তেমনই সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। যাত্রীদের নিরাপত্তাহীনতা এবং বাসে ওঠার চরম ভোগান্তি লাঘব করতেই সরকার এই ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল বা ‘বাস রুট রেশনালাইজেশন’ বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে।
নতুন নিয়মে একই রুটে একাধিক কোম্পানির বাসের অবাধ চলাচল বন্ধ হবে। এর পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট রুটে কেবল একটি বা নির্দিষ্ট কয়েকটি কোম্পানির সমন্বয়ে গঠিত একটিমাত্র কর্পোরেট কাঠামোর অধীন বাসগুলো শৃঙ্খলা মেনে নির্ধারিত স্টপেজে থামবে এবং নির্দিষ্ট নিয়মে পরিচালিত হবে।
যেসব সাধারণ ৬টি রুটে ১ নভেম্বর থেকে চালু হচ্ছে নতুন নিয়ম
প্রাথমিক পর্যায়ে চিহ্নিত ৩২টি প্রধান রুটের মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম ধাপে এই ৬টি সাধারণ রুটে বাস চলাচল শুরু হবে:
গাজীপুর চৌরাস্তা – ঢাকেশ্বরী মন্দির রুট
-
-
চলাচলের পথ: শিববাড়ী থেকে শুরু হয়ে টঙ্গী, বিমানবন্দর, মহাখালী, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও নিউমার্কেট হয়ে ঢাকেশ্বরী মন্দির পর্যন্ত।
-
পরিচালনাকারী কোম্পানি: ‘ভি.আই.পি পরিবহন’ (ভিআইপি পরিবহন ও বিকাশ পরিবহনের সমন্বয়ে গঠিত)।
-
মোট বাসের সংখ্যা: ২৫৩টি।
-
মিরপুর – কেরানীগঞ্জ রুট
-
চলাচলের পথ: চিড়িয়াখানা থেকে মিরপুর-১, কল্যাণপুর, কলাবাগান, শাহবাগ, জিরো পয়েন্ট ও বাবুবাজার হয়ে কেরানীগঞ্জ।
-
পরিচালনাকারী কোম্পানি: ‘চিড়িয়াখানা সিটি বাস’ (দিশারী পরিবহন, তানজিল পরিবহন ও মেট্রো লিংকের সমন্বয়ে গঠিত)।
-
মোট বাসের সংখ্যা: ১৩৩টি।
ঘাটারচর – ডেমরা রুট
-
চলাচলের পথ: মোহাম্মদপুর থেকে শুরু করে জিগাতলা, মৎস্য ভবন, রাজমনি, মৌচাক, রামপুরা ও বনশ্রী হয়ে ডেমরা।
-
পরিচালনাকারী কোম্পানি: ‘রমজান আলী এন্টারপ্রাইজ’।
-
মোট বাসের সংখ্যা: ৭০টি।
ঘাটারচর – কাঁচপুর রুট
-
চলাচলের পথ: মোহাম্মদপুর, জিগাতলা, শাহবাগ, পল্টন, যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভার, মাতুয়াইল ও সাইনবোর্ড।
-
পরিচালনাকারী কোম্পানি: ‘ফোর স্টার বাস লাইন’ (রজনীগন্ধ্যা পরিবহন, মালঞ্চ পরিবহন, সময় পরিবহন ও মিডলাইন পরিবহনের সমন্বয়ে গঠিত)।
-
মোট বাসের সংখ্যা: ১৫০টি।
ঘাটারচর – ধউর রুট
-
চলাচলের পথ: মোহাম্মদপুর থেকে আসাদগেট, টেকনিক্যাল, মিরপুর-১, মিরপুর-১০, কালশী, বিমানবন্দর ও আব্দুল্লাহপুর হয়ে ধউর।
-
পরিচালনাকারী কোম্পানি: ‘পিএনপি সিটি সার্ভিস’ (পরিস্থান পরিবহন ও প্রজাপতি পরিবহনের সমন্বয়ে গঠিত)।
-
মোট বাসের সংখ্যা: ১৯০টি।
টঙ্গী – ঢাকেশ্বরী রুট
-
চলাচলের পথ: কলেজগেট থেকে আব্দুল্লাহপুর, বিমানবন্দর, এক্সপ্রেসওয়ে, ফার্মগেট, আসাদগেট, সায়েন্স ল্যাব ও আজিমপুর হয়ে ঢাকেশ্বরী।
-
পরিচালনাকারী কোম্পানি: ‘ঢাকা চাকা’।
-
মোট বাসের সংখ্যা: ২০টি।
-
-
-
-
-
-
আসছে ৩টি নতুন সার্কুলার বাস রুট
সাধারণ রুটের পাশাপাশি রাজধানীর ভেতরের অভ্যন্তরীণ যাতায়াত আরও সহজ ও আরামদায়ক করতে তিনটি সার্কুলার রুট অনুমোদন করা হয়েছে। তবে এই রুটগুলোতে নতুন বাস নামানোর পরিকল্পনা থাকায় সেবা চালু হতে আরও প্রায় দুই মাস সময় লাগবে।
-
ফার্মগেট – পলাশী সার্কুলার: পান্থপথ সিগন্যাল, সেন্ট্রাল রোড, সায়েন্স ল্যাব, নিউমার্কেট ও আজিমপুর হয়ে চলাচল করবে। এতে ‘ঢাকা চাকা’ কোম্পানির ২০টি বাস থাকবে।
-
মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড – পলাশী সার্কুলার: আসাদগেট, ধানমন্ডি-২৭, কলাবাগান, সায়েন্স ল্যাব, নিউমার্কেট, পলাশী, জিগাতলা ও শংকর ঘুরে পুনরায় মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে ফিরবে। এতেও ‘ঢাকা চাকা’ কোম্পানির ২০টি বাস থাকবে।
-
কদম চত্বর – পঞ্চবটি সার্কুলার: জমজম টাওয়ার, হাউজ বিল্ডিং, সুইচ গেট, কামারপাড়া, খালপাড়, মেট্রোরেল ডিপো, নর্থ স্টেশন ও সেন্ট্রাল স্টেশন হয়ে পঞ্চবটিতে পৌঁছাবে। এ রুটে ‘উত্তরা চাকা’ কোম্পানির ২০টি বাস চলাচল করবে।
সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আনুষঙ্গিক ও কঠোর পদক্ষেপ
ডিটিসিএ সূত্রে জানা গেছে, শুধুমাত্র রুট বণ্টন বা কোম্পানি গঠন করলেই এই মহৎ উদ্যোগ সফল করা সম্ভব নয়। এর জন্য মাঠ পর্যায়ে বেশ কিছু সহযোগী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে:
-
অবৈধ যান ও দখল উচ্ছেদ: ডিএমপি এবং দুই সিটি করপোরেশনকে ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদ, নির্দিষ্ট বাসস্টপেজ ও টিকিট কাউন্টার নির্মাণ এবং অনুমোদনহীন ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অবৈধ যানবাহন প্রধান সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
-
মোবাইল কোর্ট পরিচালনা: ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল আলম জানান, ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পুলিশ ও মালিক-শ্রমিক সংগঠনের যৌথ অভিযান ইতিমধ্যে ইতিবাচক ফল এনে দিয়েছে। তবে আইন অমান্যকারী চালক ও পরিবহন মালিকদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে নিয়মিত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মন্তব্য ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা
-
রাজনৈতিক ও মালিক পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি: পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের প্রধান সমন্বয়কারী ও সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস আশা প্রকাশ করেছেন যে, সব অংশীজনের সহযোগিতায় এই ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল সফল হবে। তার মতে, একটি রুটে কেবল নির্দিষ্ট কোম্পানির বাস চললে অসুস্থ প্রতিযোগিতা চিরতরে বন্ধ হবে এবং আগামী ছয় মাসের মধ্যে ঢাকার রাজপথে এর দৃশ্যমান ও সুদূর প্রসারী পরিবর্তন দেখা যাবে।
-
বিশেষজ্ঞদের মতামত: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সহকারী অধ্যাপক এবং যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ মনে করেন, ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতি অত্যন্ত সময়োপযোগী পদক্ষেপ। তবে যানজট সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে কেবল বাস রুট নির্ধারণ করলেই চলবে না; এর পাশাপাশি নির্ধারিত রুটে অন্য কোম্পানির বাসের অননুমোদিত প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ধীরগতির যান চলাচল সীমিত করতে হবে এবং ট্রাফিক সিগন্যালে বাসগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মতো আধুনিক ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম গড়ে তুলতে হবে।




















