বোরো-রবি মৌসুমে সংকটের শঙ্কা
বেসরকারি খাতে নন-ইউরিয়া সার আমদানি নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা
- আপডেট সময় : ০৩:৩৯:১৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৫৪১ বার পড়া হয়েছে
বেসরকারি খাতে নন-ইউরিয়া সার আমদানি নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। উন্মুক্ত দরপত্রের প্রচলিত নিয়ম ভেঙে সর্বনিম্ন দরদাতাদের কার্যাদেশ না দিয়ে উল্টো নতুন করে ‘প্রাইজ অফার’ বা মূল্য প্রস্তাব দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
আমদানিকারকদের অভিযোগ, গত ১৮ আগস্ট দরপত্র জমা দেওয়ার পর দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ করে গত ২ সেপ্টেম্বর বিধি-বহির্ভূতভাবে এই নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে থমকে গেছে লেটার অব ক্রেডিট বা এলসি খোলার প্রক্রিয়া। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত সিদ্ধান্ত না হলে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতায় এই বিশাল পরিমাণ সার সরবরাহ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের কৃষি উৎপাদনে।
অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান কৃষি মন্ত্রীর পিএস খোরশেদ আলমসহ বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর মন্ত্রণালয়ের বিদায়ী বা পূর্ববর্তী প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা বর্তমান সরকারকে সার সংকটে ফেলতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কালক্ষেপণ করার ফলে বেসরকারি সার আমদানির এই গুরুত্বপূর্ণ চেইনটি স্থবির হয়ে পড়েছে এবং মাঠপর্যায়ে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
জানা গেছে, কৃষি উৎপাদন সচল রাখতে বেসরকারি খাতে নন-ইউরিয়া সার আমদানির উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। সেই লক্ষ্যে গত ৩ আগস্ট ডিএপি ৬ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন, এমওপি ৪ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন এবং টিএসপি ২ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন সার আমদানির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে কৃষি মন্ত্রনালয়।

বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল, একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান প্রত্যেক প্রকার সারের জন্য একটি মাত্র প্রস্তাব দাখিল করতে পারবে। প্রস্তাবে দেশভিত্তিক সারের মূল্য উল্লেখ করতে হবে এবং একটি প্রস্তাবে একই উৎপাদনকারী দেশের বিপরীতে একাধিক দর উল্লেখ থাকলে প্রস্তাব বাতিল মর্মে গণ্য হবে।
বিজ্ঞপ্তির এই কঠোর শর্ত মেনে গত ১৮ আগস্ট দরপত্র জমা দেয় দেশের ৪৭টি শীর্ষস্থানীয় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান।নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, টিএসপি সার সরবরাহের জন্য দরপত্রে অংশগ্রহণ করে ১০টি প্রতিষ্ঠান। তবে দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী একাধিক দেশের নাম থাকায় বাতিল হয়ে যাওয়ার কথা ছিল ৬টি প্রতিষ্ঠানের। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—মেসার্স ফাইয়াজ ট্রেডিং কর্পোরেশন, দেশ ট্রেডিং কর্পোরেশন, এনআরকে হোল্ডিং, বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ও নোয়াপাড়া ট্রেডার্স।
অন্যদিকে, ডিএপি সার সরবরাহের জন্য অংশগ্রহণকারী ২২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শর্ত ভঙ্গের কারণে বাতিল হওয়ার কথা ছিল ১৪টি প্রতিষ্ঠান। এগুলো হলো—এনআরকে হোল্ডিং, মেসার্স দেশ ট্রেডিং কর্পোরেশন, বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, মুগ্ধ ট্রেডার্স, বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল লি., মেসার্স আকন এন্টারপ্রাইজ, সান শাইনিং লিমিটেড, ও. এফ এন্টারপ্রাইজ, মৌনতা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, মেসার্স ফারিহা ট্রেডিং, মেসার্স ফাইয়াজ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, নোয়াপাড়া ট্রেডার্স ও মেসার্স ফাইয়াজ ট্রেডিং কর্পোরেশন।
এছাড়া এমওপি সার সরবরাহের জন্য আবেদন করা ১৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একাধিক দেশের নাম থাকায় বাতিলযোগ্য ছিল ৫টি প্রতিষ্ঠান; যার মধ্যে রয়েছে বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল লি., এনআরকে হোল্ডিং, বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, মেসার্স দেশ ট্রেডিং কর্পোরেশন ও মুগ্ধ ট্রেডার্স।
অভিযোগ উঠেছে, দরপত্রের কঠোর শর্ত অনুযায়ী বহু প্রতিষ্ঠানের আবেদন বাতিল হওয়ার কথা থাকলেও এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী শর্ত পূরণকারী সর্বনিম্ন দরদাতা চূড়ান্ত হওয়ার পরও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত কার্যাদেশ। গত ২ সেপ্টেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মোঃ মাকসুদুর রহমান স্বাক্ষরিত এক নোটিশে নতুন করে প্রাইজ অফার চাওয়া হয়েছে, যা উন্মুক্ত দরপত্র নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং আমলাতান্ত্রিক সময়ক্ষেপণ মাত্র।
সাধারণ আমদানিকারকদের দাবি, এই প্রাইজ অফার বা নেগোসিয়েশনের মূল উদ্দেশ্য একটি বিশেষ পক্ষকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়া। ব্যবসায়ীদের সুনির্দিষ্ট আঙুল বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) সভাপতি মোশাররফ হোসেনের দিকে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কৃষি সচিব মোঃ সেলিম খাঁন এবং মোশাররফ হোসেন—দুজনেরই বাড়ি মুন্সিগঞ্জে হওয়ায় পর্দার আড়ালে এক গোপন সমঝোতা চলছে। ২০২২ সালের আটকে থাকা মোশাররফ হোসেনের প্রায় ২০০ কোটি টাকার বকেয়া বিল উত্তোলনের পথ তৈরি করতেই এই বিশেষ প্রাইজ অফার কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা।
দরপত্রে অংশগ্রহণকারী একজন শীর্ষস্থানীয় আমদানিকারক এই প্রতিবেদককে বলেন, “ওপেন টেন্ডারে আমরা আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণ করে সর্বনিম্ন রেট দিয়েছি। এখন আবার নতুন করে প্রাইজ অফার চাওয়া মানে পুরো প্রক্রিয়াকে ঝুলিয়ে দেওয়া। কার্যাদেশ না পাওয়ায় আমরা এলসি খুলতে পারছি না। আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম ও জাহাজের ভাড়া প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এভাবে দেরি হলে আমরা আর এই দামে সার আনতে পারব না।
“নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেকজন ব্যবসায়ী বলেন, “আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম ও জাহাজ ভাড়া প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থের এই অনৈতিক সমঝোতার কারণে পুরো আমদানি প্রক্রিয়া যদি আর মাত্র কয়েকদিনও দীর্ঘায়িত হয়, তবে ডলার ও লজিস্টিকস সংকটে থমকে যাবে সরবরাহ। আর সঠিক সময়ে সার না পেলে আসন্ন বোরো ও রবি মৌসুমে বিপাকে পড়বেন দেশের কোটি কৃষক।”বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ১৩ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন সার আমদানির এই বিশাল প্রক্রিয়া দ্রুত চূড়ান্ত না হলে বৈশ্বিক বাজারের ওঠানামায় থমকে যাবে সরবরাহ ব্যবস্থা। যার চড়া মূল্য চোকাতে হবে মাঠপর্যায়ের কৃষকদের এবং ব্যাহত হতে পারে দেশের আসন্ন বোরো-রবি মৌসুমের সামগ্রিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা।




















