বিআরটি প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি, অবকাঠামো ভাঙার বিরোধিতা
- আপডেট সময় : ০৪:১৬:৩৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৫৭ বার পড়া হয়েছে
গাজীপুরে বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প বাতিল এবং নির্মিত অবকাঠামো ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে ঢাকাস্থ গাজীপুর সাংবাদিক ফোরাম। প্রকল্পের অনিয়ম, দুর্নীতি ও পরিকল্পনাগত ত্রুটি থাকলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন সংগঠনটির নেতারা।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব দাবি জানানো হয়। বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ চলার পর প্রকল্পটি বাতিল করে বিদ্যমান অবকাঠামো ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এর যৌক্তিকতা ও সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন করা জরুরি।
তাদের মতে, গাজীপুর ও উত্তরা এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ বিবেচনায় নিয়ে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যাতে নতুন করে যানজট ও জনভোগান্তি না বাড়ে।
প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন
গোলটেবিল বৈঠকে বিএনপি নেতা ও গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক ডা. এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু বলেন, বিআরটি প্রকল্পটি অপরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছিল। যথাযথ পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হলে প্রকল্পটি মানুষের উপকারে আসতে পারত।
অন্যদিকে, গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আইয়ুবী বলেন, বিআরটি প্রকল্পের পরিবর্তে গাজীপুরের মানুষকে কী ধরনের পরিবহনসুবিধা দেওয়া হবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে প্রকল্প বাতিলের পাশাপাশি বিকল্প ব্যবস্থা কী হবে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
বক্তারা মনে করেন, প্রকল্পের দুর্বলতা থাকলে তা সংশোধন করে জনস্বার্থে ব্যবহারের সুযোগও বিবেচনা করা উচিত। নির্মিত অবকাঠামো ভেঙে নতুন করে মহাসড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্তের আগে অর্থনৈতিক, কারিগরি ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা দরকার।
১৪ বছরের দুর্ভোগের পর নতুন অনিশ্চয়তা
এর আগে গত মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে ঢাকাস্থ গাজীপুর সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি ফয়সাল আলম ও সাধারণ সম্পাদক রাশেদুল হক প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানান। একই সঙ্গে সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ জনসমক্ষে প্রকাশ এবং প্রকল্পে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়ে থাকলে তদন্তের আহ্বান জানান তারা।
বিবৃতিতে বলা হয়, বিআরটি প্রকল্পের নির্মাণকাজের কারণে গাজীপুর ও উত্তরা এলাকার মানুষ দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে যানজট ও যাতায়াতের দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রকল্পটি বাতিল করে নির্মিত অবকাঠামো ভেঙে ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত তাদের নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।
ফোরামের আশঙ্কা, বিদ্যমান অবকাঠামো অপসারণ করে নতুন করে সড়ক নির্মাণ করা হলে গাজীপুর ও উত্তরা এলাকায় যানজট এবং জনদুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে। পাশাপাশি গাজীপুরসহ দেশের ১৮ জেলার মানুষের যাতায়াতের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।
সংগঠনটির নেতারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রকল্প বাতিল ও অবকাঠামো ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত স্বচ্ছ মূল্যায়নের ভিত্তিতে পুনর্বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে দ্রুত, সাশ্রয়ী ও কার্যকর পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকার প্রকল্প বাতিল
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের বিআরটি শাখা থেকে গত সোমবার (১৯ অক্টোবর) জারি করা এক চিঠিতে প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। এতে বলা হয়, দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে নির্মাণকাজ চলার পর ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বিআরটি প্রকল্পের পরিবর্তে সড়কটিকে ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তর করা হবে। এ জন্য প্রকল্পের আওতায় নির্মিত স্টেশন ও লেন বিভাজক অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
উপসচিব তাসলিমা আহমেদ পলি স্বাক্ষরিত চিঠি অনুযায়ী, গত রোববার (১৮ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘গ্রেটার ঢাকা সাসটেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট (বিআরটি, গাজীপুর-এয়ারপোর্ট)’-এর ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে প্রকল্পটি বাতিল করে বিকল্প সড়কব্যবস্থা গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তিন দফা সংশোধনে ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি
বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিআরটি প্রকল্পটি ২০১২ সালে গ্রহণ করা হয়। সড়কের মাঝখানে পৃথক লেনে বিশেষ বাস চালুর পরিকল্পনা নিয়ে ২০১৬ সালের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা (এএফডি) এবং গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটির (জিইএফ) অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, সেতু বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
শুরুতে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা। তবে তিন দফা সংশোধনের পর ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকায়। গত ১৪ বছরে প্রকল্পটিতে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা ব্যয় হলেও পরিকল্পনা অনুযায়ী বিশেষ বাস চালু করা সম্ভব হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ ও বিরোধিতা
এর আগে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হকের নেতৃত্বাধীন একটি বিশেষজ্ঞ দল প্রকল্পটির কারিগরি দিক পর্যালোচনা করে। তাদের প্রতিবেদনে পরিকল্পনা ও নকশার ত্রুটি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার বিষয়টি উঠে আসে। দলটি প্রকল্পটি বাতিল করে বিদ্যমান অবকাঠামো উন্নত মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশ করেছিল।
তবে প্রকল্পের কাজ প্রায় ৯৭ শতাংশ সম্পন্ন হওয়ার পর তা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে ‘গাজীপুর ঐতিহ্য ও উন্নয়ন’ নামের আরেকটি সংগঠন।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ, বিপুল সরকারি ব্যয় এবং নির্মিত অবকাঠামোর ভবিষ্যৎ ব্যবহারের প্রশ্নে বিআরটি প্রকল্পটি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে স্বচ্ছ মূল্যায়ন, সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব এবং বিকল্প পরিবহনব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করা জরুরি।





















