পশ্চিমা নির্ভরতা কমাতে যুদ্ধ-শুল্কের মধ্যেই ব্রিকসের নতুন হিসাব
- আপডেট সময় : ০৪:২২:১৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৫৪১ বার পড়া হয়েছে
যুদ্ধ, বাণিজ্য শুল্ক, জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তনের মধ্যে ভারতের নয়াদিল্লিতে শুরু হয়েছে ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) শুরু হওয়া দুই দিনের এই সম্মেলন এবার বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ, ব্রিকস প্রতিষ্ঠার ২০ বছর পূর্ণ হয়েছে।
সম্মেলনে চীন, রাশিয়া ও ইরানের শীর্ষ নেতারা অংশ নিয়েছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্মেলনে সভাপতিত্ব করছেন। মিশর, ইথিওপিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার নেতারাও এতে যোগ দিয়েছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিনিধিত্ব করছেন আবুধাবির যুবরাজ। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভার পরিবর্তে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাউরো ভিয়েরা সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন।
যুদ্ধ ও মার্কিন শুল্ক নিয়ে আলোচনা
এবারের সম্মেলনে ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বড় বিষয় হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা শুল্ক নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।
যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ও পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে সদস্য দেশগুলোর অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতিও ব্রিকসের কয়েকটি দেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নররা শুল্ক এবং বাণিজ্য বাধার বিরোধিতা করেছেন। পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্যের পরিকল্পনা
সম্মেলনে আন্তর্জাতিক লেনদেনে পশ্চিমা নির্ভরতা কমানোর বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য, দ্রুত অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা এবং বিকল্প আর্থিক অবকাঠামো তৈরির বিষয় রয়েছে।
এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা, সরবরাহব্যবস্থা ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়েও আলোচনা হবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্রিকসের প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
তবে জোটটির ভেতরেও মতপার্থক্য রয়েছে। ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত একই জোটের সদস্য হলেও ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান এক নয়।
গত বছর ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানিয়ে ব্রিকস যৌথ ঘোষণা দিয়েছিল। তবে চলতি বছরের মে মাসে ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে এ বিষয়ে কোনো যৌথ ঘোষণা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
সদস্য বাড়ায় বাড়ছে চ্যালেঞ্জ
ব্রিকসের সম্প্রসারণও জোটটির জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। ২০২৪ সাল থেকে মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইন্দোনেশিয়া জোটে যুক্ত হয়েছে।
অংশীদার দেশগুলোসহ ব্রিকস এখন বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্ব করে। ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় ৪০ শতাংশও এই জোটের আওতায় রয়েছে।
তবে সদস্য সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিন্ন অবস্থান তৈরি করা কঠিন হচ্ছে। বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ আলাদা হওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ঐকমত্যে পৌঁছানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
ভারত-চীন সম্পর্কেও নতুন বার্তা
এবারের সম্মেলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ভারত ও চীনের সম্পর্কের উন্নতির চেষ্টা। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং সাত বছর পর ভারতে গেছেন।
২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। ব্রিকস সম্মেলন সেই প্রক্রিয়াকে আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।
ছোট দেশগুলোর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ
ব্রিকস নিয়ে বিশ্লেষণে জিন্দাল গ্লোবাল ল স্কুলের অধ্যাপক ও সহকারী ডিন ভেসেলিন পোপোভস্কি এবং নয়ডার অ্যামিটি ল স্কুলের শিক্ষক পাওয়ান কুমার মনে করেন, জোটটির শক্তি শুধু কোনো একক ঘোষণায় নয়।
তাদের মতে, অর্থায়ন, অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা এবং কূটনৈতিক প্রভাব তৈরির ধারাবাহিক প্রক্রিয়াই ব্রিকসের বড় শক্তি। এর মাধ্যমে ছোট দেশগুলো ধীরে ধীরে কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে।
আল জাজিরার নয়াদিল্লি প্রতিবেদক উম-ই-কুলসুম শরিফের মতে, ভারতকে একই সঙ্গে বাণিজ্য, অর্থায়ন, প্রযুক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা, সরবরাহব্যবস্থা ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামলাতে হচ্ছে।
ব্রিকসের ২০ বছর পূর্তিতে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—নতুন সদস্যদের নিয়ে জোটটি বিশ্ব দক্ষিণের দেশগুলোকে কতটা শক্তিশালী করতে পারে।






















