কম্বোডিয়ায় বসে অনলাইন প্রতারণা
- আপডেট সময় : ০৫:০৫:০৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৫৪৫ বার পড়া হয়েছে
কম্বোডিয়ায় বসে বাংলাদেশিদের টার্গেট করে অনলাইনে বিনিয়োগের নামে প্রতারণা করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে একটি চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর) জানিয়েছে, চক্রটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া পরিচয়ে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে পরে অনলাইন ব্যবসায় বিনিয়োগের কথা বলে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিত।
এই প্রতারণার শিকার রাজধানীর দারুস সালামের এক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ৩৪ লাখ ৫৪ হাজার ২৮৬ টাকা হারিয়েছেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
যেভাবে টার্গেট করা হতো
পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, চক্রের সদস্যরা প্রথমে সুন্দরী নারীদের ছবি ব্যবহার করে ফেসবুকে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলতেন। এরপর নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে বন্ধুত্বের অনুরোধ পাঠানো হতো। বন্ধুত্ব হওয়ার পর কয়েক দিন ধরে নির্দিষ্ট স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী কথাবার্তা চালিয়ে তাদের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর সংগ্রহ করা হতো।
পরে ফোন, মেসেজ ও ভিডিও কলের মাধ্যমে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে অনলাইন ব্যবসায় বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হতো। শুরুতে ছোট পরিসরে কাজ বা বিনিয়োগের মাধ্যমে আস্থা তৈরি করা হলেও টাকা ফেরত চাওয়ার পর শুরু হতো নতুন নতুন শর্ত।
৩৪ লাখ টাকা যেভাবে হাতিয়ে নেওয়া হয়
ভুক্তভোগী এন সায়েম উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে টেলিগ্রামের মাধ্যমে চক্রটির সদস্যদের পরিচয় হয়। তারা নিজেদের একটি অনলাইন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেন। বিভিন্ন দেশের বিমানের টিকিট কম দামে কিনে বেশি দামে বিক্রির কথা বলে তাকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হয়।
২০২৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর থেকে তিনি টাকা দেওয়া শুরু করেন। প্রথমে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে ৮ লাখ ৬৯ হাজার ৬৫১ টাকা পাঠান। বিনিময়ে লাভসহ ১১ লাখ ৬৯ হাজার ২৫০ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়।
পরে টাকা তুলতে গেলে তাকে জানানো হয়, দুই লাখ টাকার বেশি উত্তোলনের জন্য আগে বিনিয়োগের ৫০ শতাংশ নিরাপত্তা জামানত দিতে হবে। এই শর্তে তিনি আরও ৫ লাখ ৮৪ হাজার ৬২৫ টাকা দেন।
এরপরও টাকা ফেরত না দিয়ে নতুন শর্ত দেওয়া হয়। এবার ‘ভিআইপি চ্যানেল’ খুলতে আরও ৮ লাখ টাকা দিতে বলা হয়। টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় ভুক্তভোগী সেই অর্থও দেন।
পরে তাকে জানানো হয়, লাভসহ তার অ্যাকাউন্টে ২৫ লাখ ৫৩ হাজার ৮৭৫ টাকা জমা হবে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ক্লিয়ারেন্সের’ জন্য আরও ১২ লাখ টাকা প্রয়োজন বলে জানানো হয়। পরে দর-কষাকষির পর ৯ লাখ টাকায় বিষয়টি সমাধানের কথা বলা হয়।
তিন দিনের মধ্যে টাকা না দিলে আগের সব বিনিয়োগ ‘ফ্রিজ’ হয়ে যাবে বলে তাকে ভয় দেখানো হয়। এরপর তিনি আরও ৭ লাখ এবং পরে ৫ লাখ টাকা বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও বিকাশ নম্বরে পাঠান। সব মিলিয়ে তার কাছ থেকে ৩৪ লাখ ৫৪ হাজার ২৮৬ টাকা নেওয়া হয়।
গ্রেপ্তার তিনজন
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—মো. মেহেদী হাসান ওরফে সোহাগ (২৭), আবুল হাসান ওরফে নাঈম (২৪) এবং সুমাইয়া খাতুন ওরফে শান্তা (২৪)।
খুলনার হরিণটানা, খালিশপুর ও আড়ংঘাটা থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর) কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান।
কম্বোডিয়া থেকে চক্র পরিচালনার তথ্য
পিবিআই জানায়, তদন্তে কম্বোডিয়ায় অবস্থানরত মেহেদী হাসান সোহাগের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। সুমাইয়া খাতুনের সঙ্গে তার পরিচয় ও সম্পর্কের সূত্র ধরে সুমাইয়ার নামে একাধিক ব্যাংক হিসাব খোলা হয়।
তদন্তে সুমাইয়ার নামে থাকা একটি ডাচ-বাংলা ব্যাংক হিসাবে ২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত ১৭ লাখ ১৪ হাজার ৫৫০ টাকা জমার তথ্য পাওয়া গেছে। পরে ওই অর্থ মেহেদী হাসানের নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়।
এ ছাড়া ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত একই হিসাবে আরও ২৬ লাখ ৬৬ হাজার ৯০০ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব অর্থের একটি অংশ মেহেদীর নির্দেশিত বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
প্রতারণার কৌশল নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
পিবিআইয়ের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে মেহেদী হাসান চক্রটির প্রতারণার কৌশল সম্পর্কে তথ্য দিয়েছেন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কম্বোডিয়ায় এ ধরনের একাধিক প্রতারক দল রয়েছে। এসব দলে বাংলাদেশি এজেন্টও কাজ করেন।
চক্রের সদস্যরা প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া পরিচয়ে যোগাযোগ করতেন। পরে হোয়াটসঅ্যাপে নিয়ে গিয়ে ফোন ও ভিডিও কলের মাধ্যমে সম্পর্ক তৈরি করা হতো। এরপর অনলাইন ব্যবসায় বিনিয়োগের নামে টাকা নেওয়া হতো।
ভুক্তভোগী টাকা ফেরত চাইলে একের পর এক নতুন শর্ত, নিরাপত্তা জামানত, ভিআইপি চ্যানেল বা বিভিন্ন ধরনের ফি দেওয়ার কথা বলা হতো। এভাবেই পর্যায়ক্রমে আরও অর্থ আদায় করা ছিল চক্রটির অন্যতম কৌশল।
জব্দ করা হয়েছে বিভিন্ন আলামত
তদন্তের সময় প্রতারণায় ব্যবহৃত টেলিগ্রাম গ্রুপের তথ্য, ভুয়া সদস্যদের তথ্য, ব্যাংক লেনদেনের বিবরণী, কথোপকথনের তথ্য, ছবি ও ভিডিওসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করেছে পিবিআই।
এ ছাড়া কম্বোডিয়ায় অবস্থানকারী মেহেদী হাসানের পাসপোর্টের কপিও তদন্তকারীরা পেয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
আবুল হাসান নাঈমের হেফাজত থেকে সুমাইয়া খাতুনের নামে থাকা আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংকের তিনটি এটিএম কার্ড জব্দ করা হয়েছে।
আরও সদস্যকে শনাক্তের চেষ্টা
পিবিআই জানিয়েছে, এ ঘটনায় প্রথমে সিআর মামলা করা হয়। পরে তদন্তে বিকাশ ও বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে অর্থ লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। সন্দেহভাজনদের অবস্থান শনাক্তের পর ১৬ সেপ্টেম্বর দারুস সালাম থানায় ৪০৬/৪২০/৩৪ ধারায় মামলা করা হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর মামলাটি স্বউদ্যোগে তদন্তের জন্য নেয় পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর)।
গ্রেপ্তার তিন আসামিকে আদালতে হাজির করা হলে তাদের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়। পরে তারা আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে পিবিআই জানিয়েছে।
তাদের জবানবন্দি ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চক্রটির সঙ্গে আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। একই সঙ্গে আত্মসাৎ করা অর্থের বিষয়ে আরও তথ্য সংগ্রহ করে তদন্ত অব্যাহত রেখেছে পিবিআই।

























