০৩:১৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান, নাকি আবারও ক্ষমতায়?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০১:৩৭:৫৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
  • / ১৫৫৩ বার পড়া হয়েছে
এস. এ টিভি সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনকে ঘিরে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ৭ অক্টোবরের হামলা, গাজা ও লেবাননে যুদ্ধ, ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং সরকারের বিভিন্ন নীতি নিয়ে বিতর্কের মধ্যে এবারের নির্বাচন তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে জনমত জরিপে সমর্থন কমার ইঙ্গিত থাকলেও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক বিদায় নিশ্চিত করে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা।

টাইমস অব ইসরায়েলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে শুধু তাঁর জনপ্রিয়তার ওপর নয়, বরং ডানপন্থি রাজনীতির প্রভাব, জোটসঙ্গীদের সমর্থন এবং বিরোধী দলগুলোর কার্যকারিতার ওপরও।

জনসমর্থনে চাপ, সরকার গঠনে অনিশ্চয়তা

নির্বাচনের আগে প্রকাশিত জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির আসন কমার পূর্বাভাস পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক প্রধান গাদি আইজেনকট। ফলে নির্বাচন-পরবর্তী সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

একটি জরিপে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আইজেনকটকে সমর্থন জানিয়েছেন ৪৫ শতাংশ উত্তরদাতা। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন ৩৩ শতাংশ। জরিপের পূর্বাভাস অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ২১টি আসন পেতে পারে। বর্তমানে বিদায়ী পার্লামেন্ট নেসেটে দলটির আসনসংখ্যা ৩২। আইজেনকটের ইয়াশার পার্টির জন্য ২৪টি আসনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

তবে জনমত জরিপের ফলাফলই শেষ কথা নয়। ইসরায়েলের সংসদীয় ব্যবস্থায় সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড় করতে পারা গুরুত্বপূর্ণ। তাই আসনসংখ্যা কমলেও নেতানিয়াহুর সামনে ক্ষমতায় থাকার সুযোগ থাকতে পারে।

যে তিন গোষ্ঠীর সমর্থনে টিকে আছেন নেতানিয়াহু

ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক এবং হিব্রু ইউনিভার্সিটি অব জেরুজালেমের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গিডিওন রাহাতের মতে, তিনটি গোষ্ঠীর সমর্থন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করেছে। এগুলো হলো কট্টর অর্থোডক্স ইহুদি, কট্টর ডানপন্থি এবং তাঁর ব্যক্তিগত সমর্থকগোষ্ঠী।

কট্টর অর্থোডক্স ইহুদিদের একটি বড় দাবি হলো বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ থেকে অব্যাহতি বজায় রাখা। অন্যদিকে কট্টর ডানপন্থিদের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ এবং ওই অঞ্চলে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা। নেতানিয়াহুর সরকারের বিভিন্ন নীতির সঙ্গে এসব গোষ্ঠীর প্রত্যাশার মিল রয়েছে।

রাহাতের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নেতানিয়াহু এমন একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমর্থনবলয় গড়ে তুলেছেন, যার অনুসারীদের অনেকে মনে করেন, ইসরায়েল পরিচালনার জন্য তিনিই সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি। ফলে তাঁর প্রতি সমর্থনের ক্ষেত্রে সামরিক সাফল্য বা ব্যর্থতার পাশাপাশি পরিচয়, আদর্শ এবং রাজনৈতিক আনুগত্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

নেতানিয়াহুর কিছু সমর্থক ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগও তোলেন। তাঁদের ধারণা, এই কাঠামোর একটি অংশ নেতানিয়াহুর বিরোধিতা করে। ফলে ৭ অক্টোবরের হামলার মতো বড় নিরাপত্তা ব্যর্থতার দায়ও তাঁকে এককভাবে দেওয়া উচিত নয় বলে তাঁরা মনে করেন।

রাজনৈতিক কৌশল ও ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি

তেল আবিবের কাছাকাছি বার-ইলান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জোনাথন রাইনহোল্ডের মতে, নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক সাফল্যের পেছনে রয়েছে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করার কৌশল এবং নিজের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি গড়ে তোলার দক্ষতা।

তবে তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারের বিভিন্ন নীতি নিয়ে গত চার বছরে অসন্তোষ বেড়েছে। বিচারব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগকে অনেক ইসরায়েলি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার ভারসাম্যের জন্য উদ্বেগজনক বলে মনে করেছেন। এ নিয়ে দেশটিতে ব্যাপক প্রতিবাদও হয়েছে।

এ ছাড়া সেনাবাহিনীতে জনবলের সংকট থাকা সত্ত্বেও কট্টর অর্থোডক্স ইহুদিদের সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের প্রশ্নে সরকার সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি। অন্যদিকে কট্টর ডানপন্থি মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোত্রিচের প্রভাব বৃদ্ধি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

রাইনহোল্ডের আশঙ্কা, নেতানিয়াহু আবারও প্রধানমন্ত্রী হলে এসব বিরোধ আরও গভীর হতে পারে। তাঁর মতে, বর্তমান রাজনৈতিক প্রবণতা অব্যাহত থাকলে কিছু নীতিগত বিরোধ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর স্থায়ী বৈশিষ্ট্যে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

অতীতেও একাধিকবার ক্ষমতা হারিয়েছেন

নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবনে উত্থান-পতন নতুন নয়। ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত প্রথমবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি। পরে নির্বাচনে পরাজিত হয়ে ক্ষমতা ছাড়েন।

২০১৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে দেশটিতে রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে চার দফা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০২১ সালে নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের উদ্যোগে গঠিত জোটের কাছে ক্ষমতা হারান নেতানিয়াহু। পরবর্তী সময়ে আবারও সরকার গঠন করে ক্ষমতায় ফেরেন তিনি।

এবার তাঁর সামনে রয়েছে দুর্নীতির মামলার বিচারপ্রক্রিয়া, যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে সমালোচনা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিচ্ছিন্নতার আশঙ্কা এবং অভ্যন্তরীণ নীতিগত বিরোধ। সমালোচকদের অভিযোগ, সাধারণ মানুষের স্বার্থের তুলনায় জোটসঙ্গীদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক লক্ষ্যকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে তাঁর সরকার।

আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার আশঙ্কা নিয়েও সম্প্রতি আলোচনা করেছেন নেতানিয়াহু। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প ক্রিপ্টো অর্থনীতি গড়ে তোলার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

ট্রাম্পের সমর্থনেও ভোটের সিদ্ধান্ত বদলায়নি অনেকের

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন পেয়েছেন নেতানিয়াহু। তবে এই সমর্থন ভোটারদের সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

গত ১৮ অক্টোবর ট্রাম্পের সমর্থন ঘোষণার পরদিন ইসরায়েলের চ্যানেল ১২ নিউজের এক জরিপে দেখা যায়, ৬৪ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, এই ঘোষণা তাঁদের ভোটের সিদ্ধান্তে কোনো প্রভাব ফেলবে না। ১৭ শতাংশ বলেছেন, এতে নেতানিয়াহুকে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা কমেছে। অন্যদিকে প্রায় ১২ শতাংশ জানিয়েছেন, ট্রাম্পের সমর্থন লিকুদ পার্টিকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত আরও দৃঢ় করেছে।

জরিপের এই ফলাফল ইঙ্গিত দেয়, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণে বিদেশি নেতার সমর্থনের পাশাপাশি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ।

বিরোধী দলগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ

তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের বারাক লিডারশিপ সেন্টারের প্রধান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক উদি সোমারের মতে, নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ শুধু তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করছে না। বিরোধী দলগুলো কতটা কার্যকরভাবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে পারছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

সোমারের মতে, ৭ অক্টোবরের হামলার আগে ও পরে নেতানিয়াহুর সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও বিরোধী দলগুলো সেই অসন্তোষকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেনি।

একসময় নেসেটে ২৪টি আসন নিয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম দলের নেতৃত্ব দেওয়া ইয়ার লাপিদের রাজনৈতিক প্রভাবও কমেছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। সোমারের মূল্যায়নে, বিরোধী দলগুলোর সাংগঠনিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক বিভাজন নেতানিয়াহুর জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে।

কী হতে পারে নির্বাচনের পর?

নির্বাচনের আগে প্রকাশিত জরিপগুলোতে নেতানিয়াহু কিংবা বিরোধী জোট—কোনো পক্ষেরই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। ফলে নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর জোট গঠনের আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সম্ভাব্য পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে নেতানিয়াহু ও আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন প্রধান দলগুলোর মধ্যে মধ্যপন্থি সমঝোতার উদ্যোগ অথবা সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে নতুন নির্বাচনের পথে যাওয়া। তবে এসব সম্ভাবনার কোনটি বাস্তবে রূপ নেবে, তা নির্ভর করবে নির্বাচনের ফল এবং দলগুলোর পারস্পরিক সমঝোতার ওপর।

রাজনীতি থেকে অবসরের পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন নেতানিয়াহু। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, তাঁর সমর্থকগোষ্ঠী এবং জোট রাজনীতির সমীকরণ তাঁকে আবারও ক্ষমতায় থাকার সুযোগ দিতে পারে। অন্যদিকে যুদ্ধ পরিচালনা, নিরাপত্তা ব্যর্থতা, বিচারব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক এবং জনসমর্থনের পরিবর্তন তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের পাশাপাশি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, নিরাপত্তানীতি এবং ভবিষ্যৎ সরকার গঠনের সমীকরণেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তবে নির্বাচনের ফল ও পরবর্তী জোট আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁর রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি কিংবা ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন—কোনোটিই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

এস. এ টিভি সমন্ধে

SATV (South Asian Television) is a privately owned ‘infotainment’ television channel in Bangladesh. It is the first ever station in Bangladesh using both HD and 3G Technology. The channel is owned by SA Group, one of the largest transportation and real estate groups of the country. SATV is the first channel to bring ‘Idol’ franchise in Bangladesh through Bangladeshi Idol.

যোগাযোগ

বাড়ী ৪৭, রাস্তা ১১৬,
গুলশান-১, ঢাকা-১২১২,
বাংলাদেশ।
ফোন: +৮৮ ০২ ৯৮৯৪৫০০
ফ্যাক্স: +৮৮ ০২ ৯৮৯৫২৩৪
ই-মেইল: info@satv.tv
ওয়েবসাইট: www.satv.tv

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৩। বাড়ী ৪৭, রাস্তা ১১৬, গুলশান-১, ঢাকা-১২১২, বাংলাদেশ। ফোন: +৮৮ ০২ ৯৮৯৪৫০০, ফ্যাক্স: +৮৮ ০২ ৯৮৯৫২৩৪

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান, নাকি আবারও ক্ষমতায়?

আপডেট সময় : ০১:৩৭:৫৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনকে ঘিরে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ৭ অক্টোবরের হামলা, গাজা ও লেবাননে যুদ্ধ, ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং সরকারের বিভিন্ন নীতি নিয়ে বিতর্কের মধ্যে এবারের নির্বাচন তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে জনমত জরিপে সমর্থন কমার ইঙ্গিত থাকলেও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক বিদায় নিশ্চিত করে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা।

টাইমস অব ইসরায়েলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে শুধু তাঁর জনপ্রিয়তার ওপর নয়, বরং ডানপন্থি রাজনীতির প্রভাব, জোটসঙ্গীদের সমর্থন এবং বিরোধী দলগুলোর কার্যকারিতার ওপরও।

জনসমর্থনে চাপ, সরকার গঠনে অনিশ্চয়তা

নির্বাচনের আগে প্রকাশিত জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির আসন কমার পূর্বাভাস পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক প্রধান গাদি আইজেনকট। ফলে নির্বাচন-পরবর্তী সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

একটি জরিপে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আইজেনকটকে সমর্থন জানিয়েছেন ৪৫ শতাংশ উত্তরদাতা। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন ৩৩ শতাংশ। জরিপের পূর্বাভাস অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ২১টি আসন পেতে পারে। বর্তমানে বিদায়ী পার্লামেন্ট নেসেটে দলটির আসনসংখ্যা ৩২। আইজেনকটের ইয়াশার পার্টির জন্য ২৪টি আসনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

তবে জনমত জরিপের ফলাফলই শেষ কথা নয়। ইসরায়েলের সংসদীয় ব্যবস্থায় সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড় করতে পারা গুরুত্বপূর্ণ। তাই আসনসংখ্যা কমলেও নেতানিয়াহুর সামনে ক্ষমতায় থাকার সুযোগ থাকতে পারে।

যে তিন গোষ্ঠীর সমর্থনে টিকে আছেন নেতানিয়াহু

ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক এবং হিব্রু ইউনিভার্সিটি অব জেরুজালেমের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গিডিওন রাহাতের মতে, তিনটি গোষ্ঠীর সমর্থন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করেছে। এগুলো হলো কট্টর অর্থোডক্স ইহুদি, কট্টর ডানপন্থি এবং তাঁর ব্যক্তিগত সমর্থকগোষ্ঠী।

কট্টর অর্থোডক্স ইহুদিদের একটি বড় দাবি হলো বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ থেকে অব্যাহতি বজায় রাখা। অন্যদিকে কট্টর ডানপন্থিদের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ এবং ওই অঞ্চলে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা। নেতানিয়াহুর সরকারের বিভিন্ন নীতির সঙ্গে এসব গোষ্ঠীর প্রত্যাশার মিল রয়েছে।

রাহাতের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নেতানিয়াহু এমন একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমর্থনবলয় গড়ে তুলেছেন, যার অনুসারীদের অনেকে মনে করেন, ইসরায়েল পরিচালনার জন্য তিনিই সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি। ফলে তাঁর প্রতি সমর্থনের ক্ষেত্রে সামরিক সাফল্য বা ব্যর্থতার পাশাপাশি পরিচয়, আদর্শ এবং রাজনৈতিক আনুগত্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

নেতানিয়াহুর কিছু সমর্থক ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগও তোলেন। তাঁদের ধারণা, এই কাঠামোর একটি অংশ নেতানিয়াহুর বিরোধিতা করে। ফলে ৭ অক্টোবরের হামলার মতো বড় নিরাপত্তা ব্যর্থতার দায়ও তাঁকে এককভাবে দেওয়া উচিত নয় বলে তাঁরা মনে করেন।

রাজনৈতিক কৌশল ও ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি

তেল আবিবের কাছাকাছি বার-ইলান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জোনাথন রাইনহোল্ডের মতে, নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক সাফল্যের পেছনে রয়েছে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করার কৌশল এবং নিজের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি গড়ে তোলার দক্ষতা।

তবে তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারের বিভিন্ন নীতি নিয়ে গত চার বছরে অসন্তোষ বেড়েছে। বিচারব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগকে অনেক ইসরায়েলি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার ভারসাম্যের জন্য উদ্বেগজনক বলে মনে করেছেন। এ নিয়ে দেশটিতে ব্যাপক প্রতিবাদও হয়েছে।

এ ছাড়া সেনাবাহিনীতে জনবলের সংকট থাকা সত্ত্বেও কট্টর অর্থোডক্স ইহুদিদের সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের প্রশ্নে সরকার সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি। অন্যদিকে কট্টর ডানপন্থি মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোত্রিচের প্রভাব বৃদ্ধি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

রাইনহোল্ডের আশঙ্কা, নেতানিয়াহু আবারও প্রধানমন্ত্রী হলে এসব বিরোধ আরও গভীর হতে পারে। তাঁর মতে, বর্তমান রাজনৈতিক প্রবণতা অব্যাহত থাকলে কিছু নীতিগত বিরোধ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর স্থায়ী বৈশিষ্ট্যে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

অতীতেও একাধিকবার ক্ষমতা হারিয়েছেন

নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবনে উত্থান-পতন নতুন নয়। ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত প্রথমবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি। পরে নির্বাচনে পরাজিত হয়ে ক্ষমতা ছাড়েন।

২০১৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে দেশটিতে রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে চার দফা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০২১ সালে নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের উদ্যোগে গঠিত জোটের কাছে ক্ষমতা হারান নেতানিয়াহু। পরবর্তী সময়ে আবারও সরকার গঠন করে ক্ষমতায় ফেরেন তিনি।

এবার তাঁর সামনে রয়েছে দুর্নীতির মামলার বিচারপ্রক্রিয়া, যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে সমালোচনা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিচ্ছিন্নতার আশঙ্কা এবং অভ্যন্তরীণ নীতিগত বিরোধ। সমালোচকদের অভিযোগ, সাধারণ মানুষের স্বার্থের তুলনায় জোটসঙ্গীদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক লক্ষ্যকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে তাঁর সরকার।

আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার আশঙ্কা নিয়েও সম্প্রতি আলোচনা করেছেন নেতানিয়াহু। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প ক্রিপ্টো অর্থনীতি গড়ে তোলার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

ট্রাম্পের সমর্থনেও ভোটের সিদ্ধান্ত বদলায়নি অনেকের

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন পেয়েছেন নেতানিয়াহু। তবে এই সমর্থন ভোটারদের সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

গত ১৮ অক্টোবর ট্রাম্পের সমর্থন ঘোষণার পরদিন ইসরায়েলের চ্যানেল ১২ নিউজের এক জরিপে দেখা যায়, ৬৪ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, এই ঘোষণা তাঁদের ভোটের সিদ্ধান্তে কোনো প্রভাব ফেলবে না। ১৭ শতাংশ বলেছেন, এতে নেতানিয়াহুকে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা কমেছে। অন্যদিকে প্রায় ১২ শতাংশ জানিয়েছেন, ট্রাম্পের সমর্থন লিকুদ পার্টিকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত আরও দৃঢ় করেছে।

জরিপের এই ফলাফল ইঙ্গিত দেয়, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণে বিদেশি নেতার সমর্থনের পাশাপাশি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ।

বিরোধী দলগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ

তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের বারাক লিডারশিপ সেন্টারের প্রধান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক উদি সোমারের মতে, নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ শুধু তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করছে না। বিরোধী দলগুলো কতটা কার্যকরভাবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে পারছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

সোমারের মতে, ৭ অক্টোবরের হামলার আগে ও পরে নেতানিয়াহুর সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও বিরোধী দলগুলো সেই অসন্তোষকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেনি।

একসময় নেসেটে ২৪টি আসন নিয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম দলের নেতৃত্ব দেওয়া ইয়ার লাপিদের রাজনৈতিক প্রভাবও কমেছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। সোমারের মূল্যায়নে, বিরোধী দলগুলোর সাংগঠনিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক বিভাজন নেতানিয়াহুর জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে।

কী হতে পারে নির্বাচনের পর?

নির্বাচনের আগে প্রকাশিত জরিপগুলোতে নেতানিয়াহু কিংবা বিরোধী জোট—কোনো পক্ষেরই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। ফলে নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর জোট গঠনের আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সম্ভাব্য পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে নেতানিয়াহু ও আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন প্রধান দলগুলোর মধ্যে মধ্যপন্থি সমঝোতার উদ্যোগ অথবা সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে নতুন নির্বাচনের পথে যাওয়া। তবে এসব সম্ভাবনার কোনটি বাস্তবে রূপ নেবে, তা নির্ভর করবে নির্বাচনের ফল এবং দলগুলোর পারস্পরিক সমঝোতার ওপর।

রাজনীতি থেকে অবসরের পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন নেতানিয়াহু। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, তাঁর সমর্থকগোষ্ঠী এবং জোট রাজনীতির সমীকরণ তাঁকে আবারও ক্ষমতায় থাকার সুযোগ দিতে পারে। অন্যদিকে যুদ্ধ পরিচালনা, নিরাপত্তা ব্যর্থতা, বিচারব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক এবং জনসমর্থনের পরিবর্তন তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের পাশাপাশি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, নিরাপত্তানীতি এবং ভবিষ্যৎ সরকার গঠনের সমীকরণেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তবে নির্বাচনের ফল ও পরবর্তী জোট আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁর রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি কিংবা ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন—কোনোটিই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।