ইরানের অর্থনীতি ২৫ শতাংশের বেশি সংকুচিত হবে: মার্কিন অর্থমন্ত্রী
- আপডেট সময় : ০১:৩১:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৩৯ বার পড়া হয়েছে
ইরানের অর্থনীতি আগামী ২০২৭ সালের মার্চের মধ্যে ২৫ শতাংশেরও বেশি সংকুচিত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। তাঁর দাবি, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে ইরানের বৈদেশিক মুদ্রার সংকট তীব্র হচ্ছে। পাশাপাশি দেশটির তেল উৎপাদন কমতে শুরু করেছে। আসন্ন শীত মৌসুমে জ্বালানির বড় ধরনের ঘাটতিও দেখা দিতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে ইরানের সাধারণ মানুষকে আগেভাগেই পেট্রল ও ঘর গরম রাখার জ্বালানি মজুত করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে ইরান সরকারকে কর না দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) ইরান ইন্টারন্যাশনালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন স্কট বেসেন্ট। তিনি জানান, ওয়াশিংটনের ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর আওতায় আগামী আট সপ্তাহে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানো হবে।
এক বছরে অর্থনীতি ২৫ শতাংশের বেশি সংকোচনের পূর্বাভাস
সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট বলেন, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরের মধ্যে ইরানের অর্থনীতি ২৫ শতাংশের বেশি সংকুচিত হতে পারে। তাঁর দাবি, এই সংকোচনের মাত্রা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ইরানের অর্থনৈতিক সংকোচনকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রীর মতে, ওয়াশিংটনের চলমান অর্থনৈতিক অভিযান ইরানের নেতৃত্বকে চাপে ফেলার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। তবে নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপের প্রভাব দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও পড়তে পারে।
বেসেন্টের অভিযোগ, ইরান সরকার আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় ডলারসংকটে পড়েছে। খাদ্য ও ওষুধ আমদানির জন্য মানবিক সহায়তার পথ খোলা থাকলেও এসব পণ্য কেনার মতো পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা সরকারের হাতে নেই বলে দাবি করেন তিনি।
জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা, পেট্রল মজুতের পরামর্শ
ইরানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি আসন্ন শীত মৌসুমে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বেসেন্ট। তাঁর আশঙ্কা, দেশটিতে ঘর গরম রাখার জ্বালানির বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে।
এ কারণে ইরানের নাগরিকদের এখন থেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। পেট্রলের ক্ষেত্রেও গাড়ির ট্যাংক পূর্ণ রাখার কথা বলেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী।
তিনি আরও দাবি করেন, ইরান সরকার অর্থ ছাপিয়ে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে সরকারি কর্মীদের বেতন পরিশোধে সমস্যা হচ্ছে এবং সামাজিক সুবিধা কমানোর প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।
তবে এসব বিষয়ে ইরান সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া কোনো বক্তব্য এখানে উল্লেখ করা হয়নি।
ইরানের তেল রপ্তানিতে চাপ বাড়ছে
ইরানের অর্থনীতিতে চাপ তৈরির পেছনে তেল রপ্তানি কমে যাওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন বেসেন্ট। তাঁর দাবি, দেশটির তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে এবং উৎপাদনও নিম্নমুখী হতে শুরু করেছে।
তিনি বলেন, তেল আবিষ্কারের পর সম্ভবত এই প্রথম ইরানের সমুদ্রে রপ্তানির অপেক্ষায় কোনো তেল নেই। খার্গ দ্বীপে তেল বোঝাইয়ের কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ইরানের তেল রপ্তানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ। ফলে সেখানে তেল বোঝাইয়ের কার্যক্রম বন্ধ থাকলে দেশটির তেল বিক্রি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
বেসেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, মার্কিন নৌ অবরোধ এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎসগুলোকে লক্ষ্য করে সম্প্রসারিত নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
ইরানের নেতৃত্বে মতবিরোধ বাড়ার দাবি
অর্থনৈতিক চাপের কারণে ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যেও মতবিরোধ বাড়ছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী। তাঁর মতে, দেশটির রাজনীতিবিদ, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি) এবং সর্বোচ্চ নেতার মধ্যে মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
আইআরজিসির কয়েকজন কমান্ডার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা থেকে বিচ্ছিন্ন বলে অভিযোগ করেন বেসেন্ট। তাঁর দাবি, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কতটা খারাপ হয়েছে, সে সম্পর্কে তাঁদের যথেষ্ট ধারণা নেই।
তবে এসব বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই বা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
আলোচনায় প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অনড় অবস্থান
ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন বেসেন্ট। তবে তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন বন্ধ করার দাবিও জানান।
এদিকে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে। রোববার কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা তেহরান সফর করেন। পরে সোমবার সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও উত্তেজনা প্রশমন এবং আলোচনার পথ পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে তৎপরতা চালান।
তবে অর্থনৈতিক চাপের মুখেও নিজেদের মূল দাবিগুলো থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়নি তেহরান। ইরানি কর্মকর্তাদের অবস্থান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের শর্ত পূরণ করতে হবে। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার।
সব মিলিয়ে নিষেধাজ্ঞা, তেল রপ্তানিতে বাধা এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকট ইরানের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে বলে দাবি করছে ওয়াশিংটন। তবে ২০২৭ সালের মার্চের মধ্যে দেশটির অর্থনীতি ২৫ শতাংশের বেশি সংকুচিত হবে কি না, তা নির্ভর করবে আগামী মাসগুলোতে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং কূটনৈতিক আলোচনার অগ্রগতির ওপর।
























