ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ সাবেক মিস সুইজারল্যান্ডের
- আপডেট সময় : ০১:২৬:৩১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৬১ বার পড়া হয়েছে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ তুলেছেন সাবেক মডেল ও মিস সুইজারল্যান্ড বিয়াত্রিস কিউল। তাঁর দাবি, ১৯৯৩ সালের নভেম্বরে নিউইয়র্কের প্লাজা হোটেলে ট্রাম্প তাঁকে ধর্ষণ করেছিলেন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে হোয়াইট হাউস। ঘটনাটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে ট্রাম্পের পক্ষ।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সোমবার (২৬ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট সদস্যদের প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এ অভিযোগ উঠে আসে। প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে জেফরি এপস্টেইনের অপরাধ এবং ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর কথিত সম্পর্কসংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে।
১৯৯৩ সালের ঘটনা নিয়ে নতুন অভিযোগ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে বিয়াত্রিস কিউল ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলেছিলেন। এবার ডেমোক্র্যাট কমিটির কর্মীদের সঙ্গে কয়েক সপ্তাহ ধরে সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেছেন, ওই সময় ট্রাম্প তাঁকে ধর্ষণও করেছিলেন।
কিউলের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় তাঁর বয়স ছিল ২৪ বছর। নিউইয়র্কের প্লাজা হোটেলে একটি সুন্দরী প্রতিযোগিতার সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। সে সময় হোটেলটির মালিক ছিলেন ট্রাম্প।
কিউলের অভিযোগ, ট্রাম্প তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে ভিসার ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পাশাপাশি নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে (এনওয়াইইউ) ভর্তির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথাও বলেছিলেন। প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ট্রাম্প তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন, ‘আমি তোমার দেখভাল করব।’
এপস্টেইনের সঙ্গেও পরিচয় হয় কিউলের
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের সঙ্গে কথোপকথন শেষ হওয়ার পরপরই কিউলের কাছে আসেন জেফরি এপস্টেইন। তিনি নিজেকে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পরিচয় দেন। একই সঙ্গে মার-আ-লাগোতে একটি পার্টিতে অংশ নেওয়ার জন্য কিউলকে আমন্ত্রণ জানান।
এপস্টেইন তাঁকে বলেছিলেন, তাঁরা ট্রাম্পের সঙ্গে অনেক পার্টির আয়োজন করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এপস্টেইনের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। তবে ট্রাম্পের দাবি, এপস্টেইনের অপরাধ সম্পর্কে সন্দেহ তৈরি হওয়ার অনেক আগেই তাঁদের বন্ধুত্বের অবসান হয়েছিল। ট্রাম্প তাঁকে ‘বিকৃত রুচির লোক’ বলে বর্ণনা করেছেন এবং দাবি করেছেন, তাঁকে মার-আ-লাগো ক্লাব থেকে বের করে দিয়েছিলেন।
প্লাজা হোটেলে ধর্ষণের অভিযোগ
ডেমোক্র্যাটদের প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, পরবর্তী সময়ে ট্রাম্পের একজন প্রতিনিধি কিউলকে প্লাজা হোটেলের ওপরের তলায় ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করার আমন্ত্রণ জানান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানে যাওয়ার পর ট্রাম্প পেছন থেকে কিউলকে ধরে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন বলে তিনি অভিযোগ করেছেন। তাঁর দাবি, ঘটনার সময় তাঁর পোশাক ছিঁড়ে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে রক্তপাত ও কালশিটে দাগ দেখা দেয়।
কিউল কথিত ঘটনাটিকে ‘নৃশংস’ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, ঘটনার পর ট্রাম্প তাঁকে বিছানার কিনারায় বসান এবং ভিসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি আবারও দেন। পাশাপাশি ঘটনাটি গোপন রাখার প্রতিশ্রুতি দিতে বলেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে স্পষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি। ট্রাম্পের পক্ষ থেকে অভিযোগগুলো অস্বীকার করা হয়েছে।
২০২৪ সালে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছিলেন কিউল
২০২৪ সালের অক্টোবরে ডেইলি মেইলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কিউল বলেছিলেন, ১৯৯৩ সালে প্লাজা হোটেলে ট্রাম্প তাঁকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে চুমু দিয়েছিলেন এবং তাঁর পোশাক ওপরে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। এ ছাড়া শরীরের বিভিন্ন স্থানে স্পর্শ করার অভিযোগও তুলেছিলেন তিনি।
সেই সময় কিউল দাবি করেছিলেন, ঘটনাটি এর চেয়ে বেশি দূর গড়ায়নি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন এবং ট্রাম্পকে আগে কথা বলার কথা বলেছিলেন। এরপর ট্রাম্প শান্ত হয়ে যান বলে দাবি করেছিলেন তিনি।
ডেইলি মেইলের আগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিউলের দীর্ঘদিনের এক বন্ধু দাবি করেছিলেন, তিনি প্রায় ২০ বছর আগেই বন্ধুর কাছে ট্রাম্পের কথিত অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন আচরণের কথা বলেছিলেন। বন্ধুটির ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কিউলের বর্ণনায় পরিবর্তন আসেনি।
অভিযোগ অস্বীকার হোয়াইট হাউসের
কিউলের অভিযোগের পর ২০২৪ সালে ট্রাম্পের তৎকালীন প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট অভিযোগগুলোকে মিথ্যা বলে বর্ণনা করেছিলেন। এবারও হোয়াইট হাউস অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ট্রাম্পের একজন মুখপাত্র বলেছেন, এপস্টেইন-সংক্রান্ত বিষয়ে ট্রাম্পকে সম্পূর্ণভাবে দায়মুক্ত করা হয়েছে। তাঁর দাবি, ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের রাজনৈতিক সাফল্য থেকে মার্কিন নাগরিকদের মনোযোগ সরানোর চেষ্টা করছেন।
মুখপাত্রের ভাষ্য, প্রতিবেদনটি ডেমোক্র্যাটদের একটি মরিয়া রাজনৈতিক প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়।
আরও চার নারীর অভিযোগের উল্লেখ
ডেমোক্র্যাটদের প্রকাশিত প্রতিবেদনে কিউল ছাড়াও আরও চার নারীর বক্তব্যের সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়েছে। তাঁদের কয়েকজন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ট্রাম্প, এপস্টেইন ও তাঁদের সহযোগীরা প্লাজা হোটেলে আয়োজিত সুন্দরী প্রতিযোগিতাকে তরুণী ও কিশোরীদের লক্ষ্যবস্তু করার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করতেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট প্রমাণ ও বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য জেমি রাসকিন বলেন, পাঁচ নারী সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে এপস্টেইনের সঙ্গে থাকা অবস্থায় বা তাঁর উপস্থিতিতে ট্রাম্প তাঁদের ধর্ষণ কিংবা যৌন নিপীড়ন করেছেন। অন্য নারীরাও দাবি করেছেন, এপস্টেইন বা গিসলেন ম্যাক্সওয়েল তাঁদের ট্রাম্পের কাছে পাচারের চেষ্টা করেছিলেন।
রাসকিন আরও অভিযোগ করেন, প্রেসিডেন্টকে রক্ষা করতে ট্রাম্পের বিচার বিভাগ এসব অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে মনে হচ্ছে। তবে এটি তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য ও অভিযোগ; এর মাধ্যমে অভিযোগগুলোর বিচারিক সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয় না।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নতুন রাজনৈতিক চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে। এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশ ও এ বিষয়ে ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রভাবে মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির বিষয়গুলোও রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।
যদিও মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প নিজে প্রার্থী নন, তবু তাঁর প্রশাসন ও রাজনৈতিক অবস্থান নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নতুন এই অভিযোগগুলো মার্কিন রাজনীতিতে বিতর্ক আরও বাড়াতে পারে।
তবে অভিযোগ ওঠা এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য, প্রমাণ এবং আইনি প্রক্রিয়ার ফলাফলই চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।






















