নড়াইলে ৪১ বছর ধরে একই আঙিনায় মসজিদ-মন্দির
- আপডেট সময় : ০৩:১০:২৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৩৯ বার পড়া হয়েছে
নড়াইল পৌরসভার মহিষখোলা এলাকায় একই আঙিনায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে মসজিদ ও মন্দির। এক পাশে পুরাতন রেজিস্ট্রি অফিস জামে মসজিদে আদায় করা হয় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। অন্য পাশে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ ফুট দূরে মহিষখোলা সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরে চলে পূজা-অর্চনা। দীর্ঘ ৪১ বছর ধরে এভাবেই পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালন করে আসছেন দুই সম্প্রদায়ের মানুষ।
নামাজের সময় মন্দিরের গান-বাজনা বন্ধ রাখা হয়। নামাজ শেষ হলে আবার শুরু হয় পূজার আয়োজন। ধর্মীয় সহাবস্থান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার এই চিত্র নড়াইলের মহিষখোলাকে সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্তে পরিণত করেছে।
একই আঙিনায় নামাজ ও পূজা
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চিত্রা নদের কূলঘেঁষা পাকা সড়কের পাশে অবস্থিত মহিষখোলা গ্রাম। সড়ক ধরে এগোলে চোখে পড়ে একটি বড় আঙিনা। এর এক পাশে মসজিদ, অন্য পাশে মন্দির। কাছেই রয়েছে সান বাঁধানো নদীর ঘাট। সেখানে কেউ অজু করেন, আবার কেউ পূজার সামগ্রী পরিষ্কার করেন।
নামাজের সময় মসজিদ থেকে ভেসে আসে আজানের সুমধুর ধ্বনি। মুসল্লিরা মসজিদে এসে জামাতে নামাজ আদায় করেন। অন্যদিকে মন্দিরে চলে দেবী দুর্গার আরাধনা। তবে নামাজের সময় হলে মন্দিরের বাদ্যযন্ত্র ও গান-বাজনা বন্ধ রাখা হয়। নামাজ শেষ হওয়ার পর আবার শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা।
মসজিদে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা হয়। অন্যদিকে মন্দিরে সকাল-সন্ধ্যা চলে নিয়মিত পূজা-অর্চনা। একই আঙিনায় দুই ধর্মের মানুষের এমন সহাবস্থান স্থানীয়দের কাছে দীর্ঘদিনের স্বাভাবিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ জীবনযাপনের অংশ।
পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার বন্ধন
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বছরের পর বছর ধরে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালন করে আসছেন। এ নিয়ে কখনো বড় ধরনের কোনো সমস্যা তৈরি হয়নি। বরং একে অপরের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে সবাই সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে চলেন।
শুধু দুর্গাপূজার সময় নয়, বছরের অন্যান্য সময়ও মসজিদ ও মন্দিরকে ঘিরে এই সম্প্রীতির চিত্র দেখা যায়। ব্যতিক্রমী এই পরিবেশ দেখতে দূরদূরান্ত থেকেও দর্শনার্থীরা মহিষখোলায় আসেন। তাঁরা মসজিদ ও মন্দির ঘুরে দেখেন এবং দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের কথা জেনে মুগ্ধ হন।
মন্দিরে পূজা দিতে আসা হিলা ভক্ত নামের এক পূজারি বলেন, ‘একই আঙিনায় মন্দির ও মসজিদ রয়েছে, এ কথা শুনেই পরিবার নিয়ে এখানে এসেছি। ঘুরে দেখলাম, সবাই এখানে যার যার ধর্ম পালন করছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখানে কোনো হিংসা-প্রতিহিংসা নেই। সবাই খুশিমনে একে অপরকে সাহায্য করছেন। মুসল্লিরা নামাজ শেষ করে এসে মন্দির কমিটির সঙ্গে কথা বলেন, পূজার বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজখবর নেন। এসব দেখে খুব ভালো লাগে। নড়াইলের এই সম্প্রীতি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ুক, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’
ধর্মীয় সম্প্রীতির বার্তা
মসজিদের খতিব হাফেজ এনামুল হক বলেন, ‘আমরা আমাদের ধর্ম পালন করি, তাঁরা তাঁদের ধর্ম পালন করেন। এতে কোনো সমস্যা হয় না। ইসলাম অন্যের ধর্মকে অসম্মান করতে শেখায় না; বরং সব ধর্মের প্রতি সম্মান দেখাতে শেখায়।’
মসজিদ কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট মতিয়ার রহমান বলেন, ‘নামাজের সময় মন্দির কমিটি সব বাদ্যযন্ত্র বন্ধ রাখে। আমাদের নামাজ শেষ হলে তাঁরা পূজা-অর্চনা করেন এবং বাদ্যযন্ত্র বাজান। পূর্বপুরুষদের সময় থেকেই আমাদের গ্রামে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্মীয় সম্প্রীতি রয়েছে। ভবিষ্যতেও এই সম্প্রীতি বজায় থাকবে বলে আশা করি।’
মহিষখোলা সার্বজনীন পূজা মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক শুভংকর সরকার (টুপাল) বলেন, ‘দীর্ঘ ৪১ বছর ধরে আমাদের মহিষখোলা সার্বজনীন পূজা মন্দিরের পাশেই পুরাতন রেজিস্ট্রি অফিস জামে মসজিদ রয়েছে। আমরা দুই ধর্মের মানুষ অসাম্প্রদায়িকভাবে সব ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করে আসছি। আমরা একে অপরকে সহযোগিতা করি।’
তিনি বলেন, ‘নামাজের সময়সূচি আমাদের মন্দিরে রাখা আছে। নামাজের সময় হলেই মন্দিরের সব গান-বাজনা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এভাবেই আমরা পরস্পরের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে চলছি।’
নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী
নড়াইলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. রকিবুল হাসান বলেন, পূজামণ্ডপগুলোতে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি সাদা পোশাকে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও নিরাপত্তা কার্যক্রমে নিয়োজিত রয়েছেন।
মহিষখোলার একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দিরের দীর্ঘদিনের সহাবস্থান প্রমাণ করে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সহযোগিতার মধ্য দিয়ে ভিন্ন ধর্মের মানুষও শান্তিপূর্ণভাবে পাশাপাশি বসবাস করতে পারেন। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই সম্প্রীতির বন্ধন অটুট থাকবে এবং দেশের অন্যান্য এলাকাতেও এমন সৌহার্দ্যের দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে পড়বে।






















