বাড়ি থেকে মোবাইল-স্বর্ণালংকার নিয়ে নিখোঁজ, কুমিল্লার ৪ স্কুলছাত্রী উদ্ধার
- আপডেট সময় : ০৫:১৫:১১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৪০ বার পড়া হয়েছে
কুমিল্লায় বাড়ি থেকে মোবাইল ফোন ও স্বর্ণালংকার নিয়ে নিখোঁজ হওয়া চার স্কুলছাত্রীকে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট এলাকা থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিখোঁজ হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও কোতোয়ালি থানা পুলিশের যৌথ অভিযানে তাদের উদ্ধার করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, টিকটক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কাল্পনিক জীবনযাপনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তারা বাড়ি ছেড়েছিল।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) দুপুরে কুমিল্লার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান।
স্কুলে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয় ছাত্রীরা
পুলিশ জানায়, গত ১২ অক্টোবর সকালে কুমিল্লা নগরীর একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির তিন ছাত্রী স্কুলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়। তবে নির্ধারিত সময়ে তারা বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়নি। পরে বিষয়টি স্কুল কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের নজরে আসে।
এরপর পরিবারের সদস্যরা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এ ঘটনায় থানায় পৃথক চারটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। নিখোঁজের খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ তাদের উদ্ধারে অভিযান শুরু করে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে বেতার বার্তা পাঠানো হয়, যাতে দ্রুত তাদের অবস্থান শনাক্ত করা যায়।
সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে উদ্ধার
পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, চার স্কুলছাত্রীর নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়ার পর পুলিশ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেয়। সম্প্রতি বাড়ি থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর হত্যার শিকার স্কুলছাত্রী তাজমিনের ঘটনার কারণে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
তিনি জানান, জেলা গোয়েন্দা পুলিশ ও কোতোয়ালি থানা পুলিশ যৌথভাবে সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে। পরে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট থানা পুলিশের সহযোগিতায় সোমবার গভীর রাতে চুনারুঘাট এলাকা থেকে চার ছাত্রীকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধারের পর মঙ্গলবার তাদের কুমিল্লায় নিয়ে আসা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে বাড়ি ছাড়ার পেছনের বিভিন্ন কারণ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায় বলে জানায় পুলিশ।
টিকটক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়
পুলিশ সুপারের ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে ছাত্রীরা জানিয়েছে, পড়াশোনার প্রতি তাদের তেমন আগ্রহ ছিল না। তারা নিয়মিত মোবাইল ফোন ব্যবহার করত এবং বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগাযোগ রাখত। পাশাপাশি টিকটকে ভিডিও আপলোড করত।
এসব মাধ্যমের সূত্র ধরে তাদের সঙ্গে কয়েকজন ছেলের পরিচয় ও সখ্য গড়ে ওঠে। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আবু হুজাইফা, মারজান, হৃদয়, জিসান, সুজন, মিনহাজ, মোফাজ্জল ও শোয়েব নামের আটজনের সঙ্গে তিন ছাত্রীর পৃথকভাবে যোগাযোগ ছিল। তবে ওই ছেলেদের প্রকৃত ঠিকানা সম্পর্কে ছাত্রীরা নিশ্চিত ছিল না বলে জানায় পুলিশ।
পুলিশের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা কাল্পনিক জীবনযাপনে প্রভাবিত হয়ে ছাত্রীরা স্বাধীনভাবে জীবনযাপন, নিজেরা উপার্জন এবং পরিচিত ছেলেদের সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করে। এ উদ্দেশ্যে তারা বাড়ি থেকে মোবাইল ফোন ও স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে বের হয়।
তবে তাদের বাড়ি ছাড়ার পেছনে অন্য কারও প্ররোচনা বা পরিকল্পিত কোনো ভূমিকা ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মোবাইল ফোন বিক্রি করে ঢাকায় যায়
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ হওয়ার দিন সকালে এক ছাত্রী কুমিল্লার বাহার মোবাইল মার্কেটে পরিবারের একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন চার হাজার টাকায় বিক্রি করে। ওই টাকা ও সঙ্গে নেওয়া স্বর্ণালংকার নিয়ে তারা প্রথমে ঢাকায় যায়।
তবে ঢাকায় গিয়ে পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে তারা অন্য জায়গায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে এক ছাত্রীর দাদার বাড়ি চুনারুঘাট এলাকায় যাওয়ার পরিকল্পনা করে তারা। কিন্তু সেখানে পৌঁছেও বাড়ির সঠিক ঠিকানা নিশ্চিত করতে পারেনি।
এ অবস্থায় অটোরিকশায় ঘোরাফেরার সময় পুলিশ তাদের অবস্থান শনাক্ত করে উদ্ধার করে।
বিক্রি করা ফোন ও স্বর্ণালংকার জব্দ
উদ্ধার হওয়া ছাত্রীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কুমিল্লা নগরীর টাউন হল সুপার মার্কেটের একটি দোকানে অভিযান চালায় জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। সেখান থেকে এক ছাত্রীর বিক্রি করা মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে ছাত্রীদের সঙ্গে থাকা স্বর্ণালংকারও জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং ছাত্রীদের বাড়ি ছাড়ার পেছনে কারও ইন্ধন ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান অভিভাবকদের সন্তানদের বিষয়ে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান। বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি বলেন, সময়মতো নিখোঁজের খবর পাওয়ায় চার শিশুকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এ সময় সাম্প্রতিক সময়ে নিখোঁজ হওয়ার পর হত্যার শিকার তাজমিনের ঘটনার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। পুলিশ সুপারের মতে, সময়মতো খবর পাওয়া গেলে ওই শিশুকেও জীবিত উদ্ধারের সুযোগ থাকতে পারত।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত আট ছেলের কেউ ছাত্রীদের বাড়ি ছাড়তে প্ররোচিত করেছিল কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার বলেন, এখনো ওই ছেলেদের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে।
সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) পংকজ বড়ুয়া, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. লুৎফর রহমান, জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ শামসুল আলম শাহসহ পুলিশের অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে উদ্ধার হওয়া চার ছাত্রীকে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় রাখা হয়েছে। থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আলমগীর হোসেন জানান, আদালতের অনুমতি নিয়ে তাদের অভিভাবকদের জিম্মায় দেওয়ার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আদালতে নেওয়া হচ্ছে।
























