দেশে বাল্যবিবাহ ৫১ শতাংশ, অকল্পনীয়: সমাজকল্যাণমন্ত্রী
- আপডেট সময় : ০২:১৭:৩১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৫৩৯ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার ৫১ শতাংশ উল্লেখ করে সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেছেন, সভ্য সমাজে বাল্যবিবাহের এমন চিত্র অকল্পনীয়। এ সমস্যা সমাধানে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, সামাজিক সচেতনতা, মনোসামাজিক উদ্যোগ ও কমিউনিটির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
রোববার (১১ অক্টোবর) সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের অ্যালামনাই ফ্লোরে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বাংলাদেশ ক্লিনিক্যাল সমাজকর্মী সমিতি (সিএসডব্লিউএবি) আয়োজিত জাতীয় সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর প্রভাব
সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ প্রকাশ্যে বাল্যবিবাহের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন। অল্প বয়সে বিয়ের কারণে মা ও অনাগত সন্তানের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। তাই বিয়ের বিরোধিতা নয়, বরং উপযুক্ত বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করার বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে। পাশাপাশি পুষ্টির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক অন্যায়ের পক্ষে একধরনের জেদ কাজ করে। এই মানসিকতা থেকে সমাজকে বেরিয়ে আসতে হবে। তবে শুধু আইন দিয়ে মানুষের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। এ জন্য সমাজকর্মীদের পাশাপাশি মনোসামাজিক উদ্যোগও প্রয়োজন।
সামাজিক সমস্যা সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান
মন্ত্রী বলেন, মানসিক ও স্নায়ুবিক বিকাশজনিত সমস্যার পাশাপাশি মানুষের আচরণ ও সিদ্ধান্তে সামাজিক পরিবেশের প্রভাবও বুঝতে হবে। পরিবেশ মানুষকে কোনো আচরণের দিকে আকৃষ্ট করতে পারে, আবার তা থেকে দূরেও রাখতে পারে। এসব প্রভাব মোকাবিলায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাশাপাশি মনোসামাজিক পদ্ধতির গুরুত্ব রয়েছে।
সামাজিক সমস্যা সমাধানে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে মিছিল, স্লোগান কিংবা নির্যাতনকে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়। এসব উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা পর্যালোচনা করতে হবে। সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে কারণ অনুসন্ধানের তাগিদ
সম্প্রতি কুমিল্লায় শিশুদের নিয়ে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেন, এসব ঘটনা বিশ্লেষণ করলে সমাজের বিভিন্ন সমস্যার চিত্র সামনে আসে। ঘটনার আগে শিশুটি কোথায় ছিল, তার পারিবারিক পরিস্থিতি কেমন ছিল এবং কীভাবে ঘটনাটি ঘটেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
তিনি বলেন, কোনো ঘটনার পর শিশুকে উদ্ধার, নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া জরুরি। তবে একই সঙ্গে ঘটনার পেছনের কারণ, সংশ্লিষ্ট পরিবারের অবস্থা এবং পরবর্তী পরিস্থিতিও বিশ্লেষণ করতে হবে। তা না হলে একই ধরনের ঘটনা পুনরায় ঘটার আশঙ্কা থেকে যায়।
মন্ত্রী আরও বলেন, শুধু কারাগার, হাসপাতাল কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংখ্যা বাড়িয়ে সব সামাজিক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কঠিন হয়ে পড়বে।
কমিউনিটির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব
সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে সামাজিক সমস্যার সমাধানে বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে। কোনো ঘটনা ঘটার পর সাময়িক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পরিস্থিতি ও তাদের দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়ন করা উচিত।
নিজের ২০ থেকে ২৫ বছরের পেশাগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, চিকিৎসা ও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে বিভিন্ন এলাকার সামাজিক সমস্যা কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে সমাজের সব শ্রেণি ও পেশার মানুষের অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, শিশু নির্যাতন প্রতিরোধসহ বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগকে শুধু সচেতনতামূলক কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। কমিউনিটির মানুষকে সম্পৃক্ত করা গেলে উদ্যোগগুলো দীর্ঘস্থায়ী ও কার্যকর করার সুযোগ বাড়বে।
সমাজকর্ম ও সমাজকল্যাণ খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান
সমাজকল্যাণ বিভাগের প্রশাসনিক কাঠামোর কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, উপজেলা থেকে জেলা ও কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত সমাজকল্যাণ কর্মকর্তাদের বিভিন্ন পদ রয়েছে। তবে সামাজিক সমস্যার গভীরতা ও ব্যাপ্তি বিবেচনায় সমাজকর্ম এবং সমাজকল্যাণ খাতকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, বাল্যবিবাহ, শিশু নির্যাতন ও অন্যান্য সামাজিক সমস্যা মোকাবিলায় আইন প্রয়োগ, চিকিৎসা, সামাজিক সচেতনতা, দক্ষ সমাজকর্মী এবং কমিউনিটির অংশগ্রহণকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগাতে হবে। এসব উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা গেলে সামাজিক সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।




















